আমাদের শিক্ষার মানোন্নয়নে কয়েকটি প্রস্তাব

আপডেট : ০৬ জুন ২০১৪, ২১:২২
অবশেষে শিক্ষামন্ত্রণালয় শিক্ষার মানোন্নয়ন বিষয়ে আলোচনার জন্য বিশিষ্ট শিক্ষাবিদগণের মতামত গ্রহণের আয়োজন করতে যাচ্ছে জেনে ভালো লাগলো। এই ভালো উদ্যোগটি আরো আগে নিলে আরো ভালো হতো। যদিও ড. মোহাম্মদ জাফর ইকবাল প্রশ্ন ফাঁসের প্রতিবাদের সাথে সাথে বার বার দাবি করেছিলেন, সকলের মতামত গ্রহণের মাধ্যমে একটি সুষ্ঠু ব্যবস্থা খোঁজে বের করার জন্য। যাহোক, যাদেরকে ডাকা হচ্ছে তারা সফল মানুষ। আমরা আশাকরি এক্ষত্রেও তারা সফল হবেন। প্রায়শই হওয়া প্রয়োজন এমন সভা এবং থাকা উচিত্ নিয়মিত সকলের মতামত আন্তরিক ভাবে বিবেচনার ব্যবস্থা। প্রশ্ন ফাঁস প্রসংগে অনেকের আলোচনা ও সমালোচনা থেকে মনে হচ্ছে তথ্যপ্রযুক্তির উত্কর্ষ সাধনই প্রশ্ন ফাঁসের জন্য দায়ী। হ্যাঁ, আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে ফাঁসকৃত প্রশ্ন অতি দ্রুত সারাদেশে ছড়িয়ে দেয়া সহজ হয়েছে তা সঠিক; কিন্তু একারণে প্রশ্ন ফাঁস হয়েছে বা হচ্ছে তা সঠিক নয়। প্রশ্ন ফাঁসের জন্য দায়ী সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গ। নতুন নতুন পদ্ধতির কথা বলা হচ্ছে। প্রতিরোধমূলক পদ্ধতি অবশ্যই প্রয়োজন। তবে তার আগে প্রয়োজন সেই পদ্ধতি প্রয়োগের জন্য সত্, যোগ্য ও দেশপ্রেমিক আদর্শ মানুষ এবং সেইসাথে প্রয়োজন কঠোর শাস্তির বিধান ও প্রয়োগ। যদি তা করা না হয়, তো বিফলে যাবে নতুন নতুন পদ্ধতির পিছনে রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যয়। আর লাভবান হবে ঐসব পদ্ধতি আবিষ্কার ও বাস্তবায়নের সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ। এখানেও চলবে দলীয়করণ এবং বাণিজ্যিকীকরণ। তাই মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী মহোদয়কে সর্বাগ্রে নিশ্চিত করতে হবে, যুগের উপযোগী আইনের প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন। দল মতের ঊর্ধ্বে উঠে নিশ্চিত করতে হবে, সেই আইন ভংগের কঠোরতম শাস্তি। যেটি ড. মোহাম্মদ জাফর ইকবালসহ সকলেরই প্রধান দাবি। যে হারে বাড়ছে এ+এর সংখ্যা তাতে আর ক’দিন পরেই শুরু হবে এ+ (সর্বোচ্চ মেধাবী) বেকারদের মিছিল। তখন সামলানোর উপায় কী? তখন কোথায় গিয়ে ঠেকবে আমাদের মর্যাদা? ভালোদের ভিড়েই তো হারিয়ে যাচ্ছে ভালোরা! তাছাড়া ৩৩% নম্বর দিয়ে (দান করে) পাস করানোর কী প্রয়োজন এতো এতো অছাত্র? সরকার নিজেইতো কোন চাকরিতে আবেদন করার সুযোগ দেয় না এদেরকে! তা হলে কেনো প্রদান করা হচ্ছে এই মূল্যহীন সরকারি সনদ? শিক্ষার মান বৃদ্ধির পূর্বশর্ত হচ্ছে যোগ্য শিক্ষক। সৃজনশীল প্রশ্ন পদ্ধতি ও মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম প্রবর্তনসহ শিক্ষাক্ষেত্রে যে হারে আধুনিকায়ন করা হয়েছে ও হচ্ছে, তাতে যোগ্য শিক্ষক ব্যতীত সঠিকভাবে শিক্ষাকার্যক্রম পরিচালনা করা মোটেও সম্ভব নয়। তাই শিক্ষকদের আর্থিক সুবিধা বৃদ্ধি করে সর্বাধিক যোগ্যদেরকে উত্সাহিত করতে হবে শিক্ষক হবার জন্য। পাশাপাশি বিদ্যমান শিক্ষকদের ক্লাস গ্রহণ ঠিক রেখে বিদ্যালয়েই করতে হবে ধারাবাহিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা। ক্লাস বাদ দিয়ে প্রশিক্ষণে পাঠানো হলে, প্রশিক্ষণ না এনে কেবল টাকা নিয়ে চলে আসেন এমন শিক্ষকের সংখ্যাই বেশি। কম্পিউটার চালু করতে জানেন না, নিজের নামটিও টাইপ করতে পারেন না, প্রশ্নপত্র তৈরি করতে পারেন না, এমন শিক্ষকের সংখ্যা এখনো শতকরা প্রায় ৮০ ভাগের অধিক। যা সরকারি প্রাথমিক ও বেসরকারি মাধ্যমিক স্তরে প্রায় শত ভাগ। আর্থিক সুবিধা প্রদনের আশ্বাস এবং শাস্তি প্রদানের ভয় দিয়ে, আমি খুব কাছে থেকে লক্ষ্য করেছি, অধিকাংশ শিক্ষকের নতুন পদ্ধতি শিখার ও গ্রহণের কোন আগ্রহই নেই! তাদের দিয়ে কীভাবে সম্ভব হবে মাল্টিমিডিয়া ক্লাস? তাই অতি বয়সের, অযোগ্যতার, ও অনাগ্রহের কারণে যারা অর্জন করতে ব্যর্থ হবে কাঙ্ক্ষিত মান, তাদেরকে গোল্ডেন হ্যান্ডশেক দিয়ে বিদায় করে দিতে হবে দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থে। এককথায় যেকোনমূল্যে সকল স্তরের শিক্ষায় নিশ্চিত করতে হবে শতভাগ যোগ্য শিক্ষক। কর্মমুখি ও বিজ্ঞানমনস্ক শিক্ষার পাশাপাশি প্রতিটি শিক্ষার্থীকে প্রদান করতে হবে দেশ ও জাতির কল্যাণে আত্মনিয়োগের কঠিন শপথ। অথচ আমার জানামতে আমাদের দেশের শিক্ষার্থীদের জন্য সরকারি ভাবে নির্ধারিত কোন শপথ বাক্য নেই। ফলে দেশের লাখো প্রতিষ্ঠানে শপথ পাঠ না হওয়া বা যেমন ইচ্ছে শপথ হওয়াটাই স্বাভাবিক। [এমতাবস্থায় বিশেষ করে যেসকল প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা সদা মারতে ও মরতে প্রস্তুত, তারা কী (সৃজনশীল) শপথ গ্রহণ করে তা গভীর ভাবে ভেবে দেখা প্রয়োজন।] সচেতন ও দায়িত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ মনে করেন, বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ‘যেমন ইচ্ছে তেমন শপথ’ দেশ ও জাতির জন্য মোটেও কল্যাণকর নয়। এতে করে ভিন্ন ভিন্ন মন-মনসিকতা নিয়ে বেড়ে উঠছে নতুন প্রজন্ম। ক্রমে বেড়েই চলছে আমাদের ও আমাদের উত্তরাধিকারদের বিভক্তি। আদর্শ হীন, দায়িত্ব-কর্তব্যহীন, দেশপ্রেমহীন, মানবতাহীন, সচ্চরিত্রহীন হচ্ছে আমাদের অধিকাংশ সন্তান। তাই শিক্ষা জীবনের শুরু থেকেই সকলের জন্য থাকা চাই সুশিক্ষা অর্জনের শপথ। সঠিক ভাবে নিজেকে ও নিজের বিবেককে তৈরি করার শপথ। সত্ ও নীতিবান থাকার শপথ। দুর্নীতি মুক্ত থাকার শপথ। জাতীয়তাবোধ তৈরির শপথ। যেই মজবুত শপথ বুকে নিয়ে সহজেই সম্ভব দেশ, জাতি ও মানুষের সত্যিকার কল্যাণ। নিচের ক্লাসের শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসা-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ শ্রেণী-পেশা-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলের জন্যই বাধ্যতামূলক থাকা চাই একটি সহজবুদ্ধ অর্থবহ নিরপেক্ষ শপথ। যা হবে আমাদের জাতীয় সঙ্গীতের মতই জাতীয় শপথ। লেখা থাকবে স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসা-বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল পাঠ্য বইয়ের শুরুতে। বিভিন্ন দিবসে আমাদের জাতীয় সংগীতের আগে/পরে ছাত্র, শিক্ষক, চাকুরে, সাংসদ, মন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রপতিসহ সর্বস্তরের মানুষ হাত তুলে বার বার গ্রহণ করবেন আমাদের নির্ধারিত জাতীয় শপথ। যাতে বার বার জাগ্রত হয় আমাদের বিবেক, শাণিত হয় আমাদের চেতনা, উজ্জীবিত হয় দেশপ্রেম ও জাতীয়তাবোধ। সঞ্জীবিত হয় প্রতিবাদ-প্রতিরোধের অসীম শক্তি। সেই শপথটি হতে পারে এই রূপ: ‘আমি শপথ করছি যে, সদা সত্য কথা বলবো ও সত্ পথে চলবো। ছোটদের স্নেহ ও বড়দের মান্য করবো। সুশিক্ষা অর্জনে আমরণ আন্তরিক থাকবো। প্রতিষ্ঠান, রাষ্ট্র ও স্বধর্মের সকল বিধি-বিধান মেনে চলবো। আমাদের জাতীয় চেতনা, একতা ও স্বাধীনতা রক্ষায় সর্বদা সক্রিয় থাকবো। হে সর্বশক্তিমান, আমাকে শক্তি দিন, আমি যেন সুনাগরিক হয়ে- প্রতিষ্ঠান, মাতৃভূমি ও মানুষের কল্যাণে আত্ম নিয়োগ করতে পারি। আমিন। লেখক :অধ্যক্ষ, কিশলয় বালিকা বিদ্যালয় ও কলেজ, ঢাকা Email: [email protected]