একটি জাতির এগিয়ে যাওয়ার মূল চালিকাশক্তি তার অর্থনীতি। প্রতি বছরে অর্থনীতির দিক-নির্দেশনাই হল বাজেট। গত ৫ জুন বাংলাদেশ জাতীয় সংসদে ২০১৪-২০১৫ অর্থবছরের বাজেট পেশ করা হয়। এ বছর বাজেটে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ধরা হয়েছে সাত দশমিক তিন শতাংশ। আকারের দিক থেকে এত বড় বাজেট আগে কখনোই হয়নি। আসন্ন বাজেটকে ঘিরে সমাজের প্রতিটি স্তরেই ছিল নানা আশা-আকাঙ্ক্ষা, উত্সাহ-উদ্দীপনা। যার কিছু হয়ত পূর্ণ হয়েছে, কিছু অসম্পূর্ণই রয়েছে। আমাদের দেশের অর্ধেক নারী। দেশের এই বিশাল জনশক্তিকে কাজে না লাগিয়ে, অর্থনীতির উন্নয়নে একটি রাষ্ট্রের পক্ষে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। তাই প্রয়োজন নারী বান্ধব বাজেট। ২০১৪-২০১৫ অর্থবছরের বাজেট সম্পর্কে মতামত জানতে আলোচনা হচ্ছিল বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বিআইডিএস-এর সিনিয়র রিসার্চ ফেলো, নাজনীন আহমেদ এবং বাংলাদেশ উইমেন চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সভাপতি সেলিমা আহ্মদের সাথে।
নাজনীন আহমেদ বলেন, গত কয়েক বছর ধরেই নারী উন্নয়নে, নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বাজেটের বেশ পরিমাণ বরাদ্দ রাখা হয়েছে। গত বছরের মত এ বছরও নারী উন্নয়নে বরাদ্দ রয়েছে ১০০ কোটি টাকা। কিন্ত তার ব্যবহার নিশ্চিত নয়। কেননা এসব বরাদ্দ মন্ত্রণালয়ভিত্তিক যেভাবে রয়েছে তার প্রয়োগ অনেক ক্ষেত্রে নেই। নারীদের উন্নয়নের জন্য বরাদ্দ গত বছর ১০০ কোটি হলেও তার প্রায় অর্ধেকই অব্যবহূত রয়ে গেছে। নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বাজেট বরাদ্দ বেশি হলেও যদি তার প্রয়োগ না হয়, তবে তা অর্থহীন। মন্ত্রণালয়ভিত্তিক বাজেটের কতখানি প্রয়োগ হচ্ছে সে ব্যাপারে সঠিক চিত্র প্রস্ফুটিত হয় না। তাই বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কোন্ কোন্ ক্ষেত্রে বরাদ্দ রয়েছে এবং কী পরিমাণ নারীদের জন্য বরাদ্দ রয়েছে তাও পরিষ্কার হতে হবে। নইলে বাজেটের অনেকখানি হয়তো অব্যবহূতই রয়ে যাবে। নারীদের শক্তিকে পূর্ণ রূপে ব্যবহার করতে হলে শুধু তাদের নিরাপত্তা বা বাঁচিয়ে রাখা নিশ্চিত করলেই চলবে না। তাদের উন্নয়নের যথোপযুক্ত পরিবেশ এবং সুযোগ করে দিতে হবে। আমাদের দেশে নারী উন্নয়নে বেশিরভাগ ট্রেনিং প্রোগ্রাম গতানুগতিক বুটিক বা পার্লারভিত্তিক। কিন্তু এর বাইরেও নারীদের জন্য বিশেষ প্রকল্পের প্রয়োজন, যা নির্দিষ্ট এলাকাভিত্তিক সংস্কৃতি, সম্পদভিত্তিক ট্রেনিং দিবে। এছাড়াও নারীদের কম্পিউটার, টেকনোলজিভিত্তিক ট্রেনিং এর নিশ্চয়তা দিতে হবে। নারীদের অনলাইন বাজারে আনতে, বিভিন্ন গ্রামে যে ইনফরমেশন সেন্টারগুলো রয়েছে তাদের এগিয়ে আসতে হবে। যা গ্রামের নারীদের জন্য এক নতুন দ্বার উন্মুক্ত করবে। তাদের উদ্যাক্তা হিসেবে দাঁড়াতে সাহায্য করবে। এছাড়া শুধু বাজেট বাস্তবায়নই নয় তার পাশাপাশি নারী উন্নয়নের জন্য সহায়ক যে নীতিগুলো আছে তারও প্রয়োগ করতে হবে, যেমন কন্যাশিশুর জন্য বিনিয়োগ বৃদ্ধি। যেকোন প্রকল্পের ক্ষেত্রে লক্ষ্য রাখতে হবে তাতে নারী উন্নয়ন নীতির প্রয়োগ হচ্ছে কিনা।
সেলিমা আহমেদ বলেন, গত বছরের মত এ বছরও সরকার নারী উন্নয়নে বরাদ্দ করেছে ১০০ কোটি টাকা। কিন্তু গত বছরের বরাদ্দ বাজেট পুরোপুরিভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হয়নি। তাই এবার আমাদের তার পূর্ণ ব্যবহারের চেষ্টা করতে হবে। নতুন অর্থবছরে বাজেটের আকার দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৫০ হাজার ৫০৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১ লাখ ৮২ হাজার ৯৫৪ কোটি টাকা এবং ঘাটতি ৬৭ হাজার ৫৫২ কোটি টাকা। কিন্তু বাজেটের পরিমাণ বৃদ্ধির চেয়েও জরুরি সে বাজেটের বাস্তবায়ন। তাই আমাদের সে ব্যাপারে সচেষ্ট হতে হবে। এ বছর নারীদের জন্য করমুক্ত আয়ের সীমা ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ২ লাখ ৭৫ হাজার টাকা করা হয়েছে। যা একটি ভাল পদক্ষেপ।
