হাস্যরসের বড় একটা অংশজুড়ে রয়েছে কার্টুন। একই সাথে কার্টুনের মধ্য দিয়ে আমাদের ইতিহাস, সামাজিক এবং রাজনৈতিক সমাজচিত্র খুব ধারালোভাবে, সুন্দরভাবে উঠে আসে। কার্টুন তাই হয়ে ওঠেছে আমাদের মুক্তচিন্তা প্রকাশের অন্যতম হাতিয়ার। এই শিল্পটি তাই আজ প্রতিষ্ঠা পেয়েছে ভাব প্রকাশের অনন্য মাধ্যম হিসেবে। কার্টুন যারা আঁকেন তারা আমাদের কাছে পরিচিত কার্টুনিস্ট হিসেবে। এই শিল্প মাধ্যমটির প্রতি বর্তমান প্রজন্মের আগ্রহ বেশ লক্ষণীয়। তাই এ প্রজন্মের কয়েকজন মেধাবী কার্টুনিস্টদের নিয়ে আমাদের এবারের আয়োজন। গ্রন্থনা ও সম্পাদনা করেছেন রিয়াদ খন্দকার ও সাজেদুল ইসলাম শুভ্র
মোরশেদ মিশু
মোরশেদ মিশু
ডাকনাম :মিশু
জন্মতারিখ ও স্থান :২৯ জুলাই, ঢাকা
মায়ের নাম :নীলুফা রাজ্জাক
বাবার নাম :মো. আব্দুর রাজ্জাক
প্রথম স্কুল :ইউনিভার্সাল কিন্ডার গার্টেন অ্যান্ড প্রি ক্যাডেট স্কুল
প্রিয় মানুষ :আমার বোন
প্রিয় উক্তি :তেমন কোনো উক্তি নেই
প্রিয় পোশাক :টি-শার্ট, জিন্স
অবসর কাটে যেভাবে :যখন যেটা করতে মন চায়।
সাফল্যের সংজ্ঞা :পরিশ্রম
তার আঁকাআঁকির শুরুটা মেজো ভাইয়ের হাত ধরে। দুভাই একসাথে কমিকস পড়তেন। পড়া শেষে একসাথে বসে কপি করার চেষ্টা করতেন। ছোটবেলায় বড় ভাইয়ের সাহচর্যেই আঁকাআঁকিতে তার হাতেখড়ি। পরবর্তীতে বন্ধু আল নাহিয়ানের সুবাদে ফান ম্যাগাজিন ‘উন্মাদ’-এর আহসান হাবীবের সাথে পরিচয় হয়। কার্টুন আঁকায় আগ্রহ দেখে আহসান হাবীব তাকে উন্মাদে আঁকা শুরু করতে বললেন। মূলত আহসান হাবীবের অনুপ্রেরণাই তাকে এগিয়ে নিয়ে এসেছে আঁকাআঁকির জগতে। তিনি প্রজন্মের মেধাবী কার্টুনিস্ট মোরশেদ মিশু। তার জন্য কার্টুনকে পেশা হিসেবে নেওয়ার মূল ভিত্তি ছিল ‘উন্মাদ’। মিশু বর্তমানে কার্টুনিস্ট হিসেবে কাজ করছেন ‘দি বাংলাদেশ টু’ডে পত্রিকায়। এর আগে বিভিন্ন জাতীয় পত্রিকায় কার্টুন কন্ট্রিবিউট করেছেন। ৯টা জাতীয় এবং ২টা আন্তর্জাতিক কার্টুন প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করেছেন তিনি। লন্ডন এবং বার্লিনে তার আঁকা কার্টুন প্রদর্শিত হয়েছে। পলিটিক্যাল কার্টুন আঁকতে ভালো লাগে তার। যদিও বিষয়টা বেশ চ্যালেঞ্জিং। ক্যারিক্যাচার করাটা উপভোগ করেন তিনি। গত দুই বছর যাবত্ বইমেলাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন প্রকাশনীর এবং লেখকের জন্য বইয়ের প্রচ্ছদও করছেন মিশু। তবে আঁকাআঁকির উপর মিশুর কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই—কখনও দেখে শিখেছেন, কখনও ঠেকে শিখেছেন। নিজের তাগিদে শিখেছেন। যেকোনো সমস্যায় সিনিয়র কার্টুনিস্টদের সহযোগিতা পেয়েছেন সবসময়। মিশু নিজের কাজটিকে বেশ উপভোগ করেন এবং ভালোবাসেন। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে পেশা হিসেবে কার্টুনিস্টের অবস্থান সম্পর্কে মিশু বলেন, ‘বাংলাদেশে প্রফেশনাল কার্টুনিস্টের সংখ্যা খুবই কম, কিন্তু চাহিদা প্রচুর। প্রচুর সুযোগ আছে এই পেশায়। পলিটিক্যাল কার্টুন, এডিটোরিয়াল কার্টুন ছাড়াও আছে স্ট্রিপ কমিক্স, গ্রাফিক্স নভেল নিয়ে কাজ করার সুযোগ। গেম কোম্পানিগুলোতে ক্যারেক্টর ডিজাইনারের চাহিদা ব্যাপক। এবং কোনোটাই ফ্রি নয়। মিশুর বাবা একজন মুক্তিযোদ্ধা। বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলের সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য তিনি। সংসার এবং সন্তানদের দেখাশোনা করার গুরুদায়িত্ব সম্পূর্ণ মায়ের উপর। তিন ভাই, এক বোনের মাঝে মিশু সবার ছোট। বোনের আদর, বড় ভাইয়ের শাসন আর মেজো ভাইয়ের সাথে খেলাধুলা করেই শৈশব পার করেছেন তিনি। কৈশোর পার হচ্ছে কাজ আর বন্ধুদের সাথে আড্ডার মধ্যে দিয়েই। বন্ধুদের বরাবরই পরিবারেরই অংশ মনে করেন মিশু। বন্ধুদের সাথে আড্ডা বিষয়টা তার কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে মিশু পড়াশোনা করছেন ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশ (ইউল্যাব)-এ কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগে। গ্র্যাজুয়েশন শেষ করার আগে তার ইচ্ছা একটা কমিকস সিরিজ বের করার। আর পরবর্তীতে স্বপ্ন পড়াশোনার বিষয় আর কার্টুনের মধ্যে যোগসূত্র সৃষ্টি করার। অ্যানিমেশন নিয়ে কাজ করারও ইচ্ছা আছে তার। এমনই স্বপ্ন নিয়ে সামনের দিকে মিশুর এগিয়ে চলা।
০০০০
আরাফাত করিম
আরাফাত করিম
ডাকনাম :আরাফাত
জন্ম তারিখ ও স্থান :১ জানুয়ারি, রাজবাড়ী
বাবা :আনোয়ার করিম
মা :এসরারুল করিম
প্রথম স্কুল :ফুলকুড়ি শিশু বিদ্যালয়, চুয়াডাঙ্গা
প্রিয় উক্তি :There is a long, long prepration
for a few moments of onnocence
প্রিয় পোশাক :যে পোশাকটা পড়তে ভালো লাগে।
অবসর কাটে যেভাবে :অবসর পেলেই আকাশ-পাতাল ভাবতে বসে যাই।
তার কার্টুন আঁকাআঁকির শুরু অনেক আগে থেকেই। ২০১১-তে টিআইবি কার্টুন কম্পিটিশনে দ্বিতীয় হন তিনি। ২০১২-তে প্রথম হন এবং গত বছর ২০১৩-তেও প্রথম হন। পাশাপাশি চলতে থাকে কার্টুন, ক্যারিকেচার, কিছু ফান ম্যাগাজিনে কভার করা, বেশ কিছু চিল্ড্রেন বুক ইলাস্ট্রেশন। চিল্ড্রেন বুক ইলাস্ট্রেশন করতে তার বেশ ভালো লাগে। বর্তমানে অবসর প্রকাশনীর বেশ কিছু বইয়ের ইলাস্ট্রেশনের কাজ করছেন। এর সাথেই কয়েকজন মিলে ঢাকা কমিকসে আঁকতে শুরু করেন। কমিকস আঁকার অনুপ্রেরণা মূলত আরাফাত পেয়েছেন মেহেদি হকের কাছে থেকে। ঢাকা কমিকস এখন বাজারে বেশ পরিচিত। আরাফাতের একাডেমিক লাইন মানে ফাইন আর্টসের পাশাপাশি এই কার্টুনিস্টের পরিচয়টাও ভালো লাগে।
নিজের স্বাচ্ছন্দ্যবোধের কথা জানাতে গিয়ে আরাফাত বলেন, ‘আমি আসলেই অনেক সাচ্ছন্দ্যবোধ করি এইখানে। কার্টুন এবং কাটুনিস্টের মাঝে থাকলে নিজেকে অনেক রিলিভ মনে হয়। ‘উন্মাদ’ আসলেই একটা মজার জায়গা, যেখানে আমাদের বস আহসান হাবীব সবকিছুর প্রাণকেন্দ্র। ‘উন্মাদ’ অফিসে গেলেই অন্য মেম্বারদের সাথে মজার আড্ডা জমে ওঠে। যেন কোনো ৩ ঘণ্টার কমেডি ফিল্মের মাঝেই রয়েছি।’
নতুনদের কাজের মূল্যায়নে তিনি বলেন, ‘নতুনরা কাজ করছে আর কোয়ালিটির লেভেলটাও অনেক বাড়ছে। তাই এটা অনেক ভালো। আঁকাআঁকি চালিয়ে যাওয়া আর অনেস্টলি কাজ করা। আসলে, অনেস্টলি কাজ করলে খারাপ কাজ ছাড়া সব কাজেই ভালো করা সম্ভব।’ জনমতে কার্টুনের প্রভাবের কথা বলতে গিয়ে আরাফাত বলেন, ‘জনমতে কার্টুনের প্রভাব তো আমরা দেখতেই পাচ্ছি, যেকোনো প্রধান দৈনিকের ফ্রন্ট পেজ থেকে ফেসবুক পর্যন্ত সবখানেই এইটা আছে। কার্টুন নিজেই মানুষের চোখকে তার দিকে টেনে আনে।’
আরাফাতের শৈশব কেটেছে চুয়াডাঙ্গাতে। এসএসসি পর্যন্ত ওখানেই ছিলেন। এইচএসসি দিয়েছেন রাজবাড়ি থেকে। আর এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদে পড়ছেন। বাবা-মা, বোন আর ছোট ভাইকে নিয়েই তার পারিবারিক আবহ।
তার ভবিষ্যত্ স্বপ্ন আঁকাআঁকি চালিয়ে যাওয়া আর ভালো কিছু করা।
০০০০০০০০০০০০
এবিএম সালাহউদ্দিন
এবিএম সালাহউদ্দিন
ডাকনাম :শুভ
জন্ম তারিখ ও স্থান :১ মার্চ, পটুয়াখালী
মায়ের নাম :চন্দন জাহান
বাবার নাম :মো. আব্দুল মজিদ
প্রথম স্কুল :লতিফ মাধ্যমিক বিদ্যালয়, পটুয়াখালী
প্রিয় মানুষ :বাবা
প্রিয় উক্তি :when love and skills work together, expect a masterpiece.
প্রিয় পোশাক :টি-শার্ট, জিন্স
অবসর কাটে যেভাবে :কম্পিউটারে গেম খেলে, গান শুনে।
সাফল্যের সংজ্ঞা :পরিশ্রম ও ভাগ্যের সংমিশ্রণ।
ছবি আঁকব—এটাই কখনও ভাবেননি তিনি। ছেলে ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হবে—এটাই শুনে আসছেন সেই ছোটবেলা থেকে। ছোটবেলায় ‘আলপিন’ (এখন ‘রস আলো’), ‘বিচ্ছু’ ম্যাগাজিনের কার্টুন দেখে দেখে আঁকার চেষ্টা করতেন আর ভাবতেন, ‘ইস আমি যদি এমন ভালো কার্টুন আঁকতে পারতাম!’ ২০০৮ সালে, যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের অঙ্কন ও চিত্রায়ন বিভাগে ভর্তি হন তখনই কার্টুনিস্ট হওয়ার সংকল্প করেন। বিশ্ববিদ্যালয় তার নতুন বন্ধুদের মধ্যে ছিলেন কার্টুনিস্ট মানবেন্দ্র গোলদার। তার সাথে কার্টুন নিয়ে আলোচনা, প্র্যাকটিস চলতে থেকে পুরোদমে। তারপর কিছু বন্ধু মিলে চারুকলার বারান্দায় একটা ছোটখাটো প্রদর্শনীও করেন। এরপর প্র্যাকটিসের পাশাপাশি ‘রস আলো’তে কার্টুন পাঠান। তা পরে ছাপাও হয়। এভাবেই শুরু হয় এবিএম সালাহউদ্দিনের কার্টুন আঁকাআঁকি। পরিচিতজনদের কাছে যিনি শুভ নামেই বেশি পরিচিত। নিজের কাজ সম্পর্কে বলতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘কাজ সম্পর্কে বলতে গেলে যদি শুধু কার্টুন নিয়ে বলি, তাহলে বলতে হবে কার্টুনের অনেক বিভাগের মধ্যে আমার স্ট্রিপ কার্টুন, ক্যারিকাচার করতে বেশি ভালো লাগে। এ কাজগুলো আমি ডিজিটাল পদ্ধতিতে করি। আমি এখন ঢাকা ট্রিবিউনে কর্মরত। এখানে আমি মাঝে মাঝে এডিটোরিয়াল কার্টুনও আঁকি। পাশাপাশি আমি কার্টুন ক্যারেকটার ডিজাইন করি। যেটা আমার খুবই পছন্দের। বর্তমানে আমার একটা কমিকস বুকের কাজ চলছে। ‘শিকারি’ নামের এই কমিক বুকটি ফানুস প্রকাশনী থেকে সামনের মাসেই বের হবে।’ কার্টুনের মাধ্যমে জনমতে কতটা প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করেন? এমন প্রশ্নের উত্তরে শুভ বলেন, ‘নতুনদের জন্য আমার একটাই কথা, অনেক পরিশ্রম করতে হবে। বেশি বেশি কুইক ড্রইং করতে হবে। তাতে কার্টুনের অবয়ব ও এক্সপ্রেশন আঁকতে সুবিধা হবে। দেশি-বিদেশি কার্টুনিস্টদের ব্লগ বা ওয়েবসাইট ঢুঁ মারতে হবে। তাইলে অনেক আপডেটেড থাকা যাবে। আর জনমতে সহজে প্রভাব ফেলার জন্য কার্টুন অনেক বেশি ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে হয়। কারণ খুব সরল ও হিউমার দিয়ে একটা ম্যাসেজ পাস করার জন্য কার্টুনের মতো বড় ভাষা আর হয় না।’ শুভর শৈশব পুরোটাই কেটেছে পটুয়াখালীতে। বাবা বিএডিসি-র কর্মকর্তা ছিলেন, তাই কলেজ রোডের কলোনিতেই কেটেছে তার শৈশব। পটুয়াখালী সরকারি জুবিলি বিদ্যালয় থেকে ২০০৫ সালে এসএসসি পাস করেন তিনি। তারপর ভর্তি হই ঢাকা কলেজে। দুই ভাইয়ের মধ্যে শুভই বড়। মা সরকারি চাকরিজীবী।
শুভর ভবিষ্যত্ স্বপ্ন বিদেশে গিয়ে কার্টুন বিষয়ে পড়াশোনা করার। পাশাপাশি কার্টুন শেখানোর স্কুল গড়ারও ইচ্ছা রয়েছে তার।
