একা বড় একা!

আপডেট : ০৮ জুন ২০১৪, ২১:৫৮
কথায় বলে, হাতি কাদায় পড়লে চামচিকায়ও লাথি মারে! কারণ এই সময়টাতে প্রতিপক্ষ শক্তিশালী হলেও পাল্টা আঘাতের ভয় ততটা থাকে না। এতে পুরোনো শত্রুতা কিংবা ক্ষোভের ঝাল মিটিয়ে নেয়া যায়। একই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে ভারতের কংগ্রেস দলের সহ-সভাপতি রাহুল গান্ধীর বেলায়। গতমাসে শেষ হওয়া লোকসভা নির্বাচনে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) কাছে কংগ্রেস ধরাশায়ী হবার পর দলের ভেতর সবচে’ বড় টার্গেটে পরিণত হয়েছেন সোনিয়া-পুত্র রাহুল। নরেন্দ্র মোদীকে নির্বাচনযুদ্ধে সামনে এনে ‘আকাশ ছোঁয়া’ বিজয় পেয়েছে বিজেপি। রাহুল গান্ধীকে সামনে রেখে বিজেপির ঠিক উল্টো ফল অর্থাত্ ‘পাতাল ছোঁয়া’ পরাজয় দেখেছে কংগ্রেস! একজন ব্যক্তির একার কারণে একটি দল এমন শোচনীয় পরাজয় বরণ করতে পারে না। কিন্তু কংগ্রেসের অনেকেই তা মানতে রাজি নয়। দলের সিনিয়র নেতাদের অনেকে এই সুযোগে গান্ধী পরিবারের কাছ থেকে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ কেড়ে নিতে জোর চেষ্টা শুরু করেছেন। ভারতীয় মিডিয়ার খবরে জানানো হয়েছে, রাহুলকে ফের নির্বাচন-যুদ্ধের সেনাপতি করলে দল ছাড়ার হুমকি দিয়েছেন অনেকে। এমনকি তাকে আপত্তিকর ভাষায় আক্রমণ করতেও ছাড়ছেন না দলের নেতারা। সবমিলিয়ে ভীষণ কোণঠাসা পরিস্থিতিতে পড়ে গেছে গান্ধী পরিবার, বিশেষ করে রাহুল গান্ধী। তার চালচলনে আগের মতো সেই উত্ফুল্ল ভাব নেই। মনমরা হয়ে থাকেন বেশিরভাগ সময়ে। দলীয় বিদ্রোহ দেশজুড়ে। দিন যত যাচ্ছে, রাহুলের বিরুদ্ধচারীরা যেন ততই সরব হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে সারাক্ষণ যেন নিজেকে একা মনে হয় তার। সমপ্রতি লোকসভা অধিবেশনে রাহুল যোগ দিতে যান। তার মলিন মুখে কষ্টের ছায়া মিডিয়ার নজর এড়ায়নি। বিশ্বের অনেক পত্র-পত্রিকায় গুরুত্বসহকারে প্রকাশ করা হয় ছবিটি। এমন পরিস্থিতিতে ভারতজুড়ে প্রশ্ন উঠেছে, লোকসভায় শোচনীয় হারের ধাক্কায় কংগ্রেসের উপর থেকে গান্ধী পরিবারের নিয়ন্ত্রণ কি কমতে শুরু করেছে? যেভাবে বিভিন্ন নেতা বিবৃতি দিচ্ছেন এবং হাইকমান্ডকে না জানিয়েই রাজ্য নেতারা সিদ্ধান্ত নিতে শুরু করেছেন, তাতে দলের অন্দরেই এই প্রশ্ন উঠছে। ফল প্রকাশের পর প্রায় মাস পার হলেও ‘টিম রাহুল’-এর বিরুদ্ধে সমালোচনা বেড়েছে বৈ কমেনি। সাবেক মন্ত্রী শশী থারুর বলেছেন, ‘দলের নেতাদের নিজের মতামত জানানোর সুযোগ দিতে হবে। এতদিন এই সুযোগ দেয়া হয়নি। এমনকি মন্ত্রী হওয়া সত্ত্বেও আমাকেও অনেক সময় কথা বলতে দেয়া হয়নি।’ অজানা কারণে রাহুল গান্ধীর সমালোচকদের সংখ্যা অনেক বেড়ে গেছে। প্রিয়াঙ্কা গান্ধীকে দলে আরও গুরুদায়িত্ব দেয়ার দাবি উঠেছে বেশ কিছুদিন ধরেই। কিন্তু থারুর সেটাও পছন্দ করেন না। গান্ধী পরিবারের প্রতি বিরক্তি আর লুকিয়ে না রেখে তিনি মিডিয়াকে বলেন, ‘প্রিয়াঙ্কা যে ভূমিকায় অভিনয় করতেই চান না তার জন্য আমরা তাঁকে অস্কার দিয়ে দিচ্ছি।’ থারুর বোঝাতে চাইলেন যে প্রিয়াঙ্কাও যোগ্য নন। পাঞ্জাব ও আসামেও কংগ্রেসের বিরোধ তুঙ্গে উঠেছে। আসামে তরুণ গগৈ পদত্যাগ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সোনিয়া গান্ধী খারিজ করার পরেও গগৈ-বিরোধীরা তত্পরতা কমায়নি। পাঞ্জাবে আবার অমরিন্দর সিং বনাম প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি প্রতাপ সিং বাজওয়া বিরোধও চরমে। লোকসভা নির্বাচনের পর অমরিন্দরের বেশ কিছু সহযোগী নেতা ও বিধায়ক খারাপ ফলের জন্য প্রতাপ সিংয়ের পদত্যাগ দাবি করেছিলেন। প্রতাপ সিং উল্টে তাঁদের বিরুদ্ধে শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগ এনেছেন। অপরদিকে জোট শরিক এনসিপি সমপ্রতি কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃত্বের ঘাড়ে হারের দায় চাপিয়ে দিয়েছেন। কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃত্বের দিকে আঙুল তুললে সেই আঙুল বাঁকা হয়ে ঝুঁকে পড়ছে রাহুল গান্ধীর দিকে। সাবেক মন্ত্রী প্রফুল্ল প্যাটেল বলেছেন, ‘হারের সব দায় কংগ্রেসের। কারণ, ওরা একতরফা সব সিদ্ধান্ত নিয়েছে। শরিক নেতাদের সঙ্গে কথা বলেনি। কংগ্রেস নেতৃত্বের উচিত ছিল শরদ পাওয়ারকে আরও বেশি দায়িত্ব দেয়া’। এরপর তিনি সরাসরি রাহুল গান্ধীর বিরুদ্ধে একনায়কসুলভ আচরণের অভিযোগ তুলে হারের দায় তার উপরে চাপানোর চেষ্টা করেন। তবে কংগ্রেস মুখপাত্র শাকিল আহমেদ অবশ্য রাহুল গান্ধী বাঁচাও অভিযান চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি বলেছেন, ‘রাহুলকে আমরাই পদত্যাগ করতে দিইনি। তিনি তো পদত্যাগ করতে চেয়েছিলেন। রাহুল সবদিক থেকে যোগ্য নেতা।’ এই অবস্থায় কংগ্রেস নেতা মিলিন্দ দেওরার উপরেই রাহুল-অনুগামীদের রাগ গিয়ে পড়েছে। কারণ, দেওরাই প্রথম রাহুলের নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলে অন্যদের সাহস যুগিয়েছেন। যুব কংগ্রেসের সভাপতি রাজীব সাতভ বলেছেন, ‘মিলিন্দ এসব কথা আগে বলেননি কেন? এখন কংগ্রেসের পরাজয়ের পর রাহুল খারাপ সময় পার করছেন, তাই তার ওপর ঝাল মেটানোর চেষ্টা করছেন সবাই।’ এই পরাজয়ের জন্য মা-ছেলে জুটিকে কাঠগড়ায় দাড় করালেন রাজস্থানের এক কংগ্রেস বিধায়ক। সেইসঙ্গে কংগ্রেসের পরিবারতন্ত্র নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। কংগ্রেস বিধায়ক ভনোয়ার লাল শর্মার মতে, দলের অভ্যন্তরে বর্তমানে তৃণমূল স্তর থেকে উঠে আসা নেতাদের সঙ্গে পরিবারতন্ত্রের দৌলতে উঠে আসা নেতাদের সংঘাত দেখা দিয়েছে। দলে এর প্রভাব পড়ছে বলে মনে করেন সদর শহর কেন্দ্রের ওই বিধায়ক। তার মতে, কংগ্রেসে নেতা বাছাইয়ের ক্ষেত্রে কোনো গণতন্ত্র নেই, যা দলের ক্ষতি করছে। তিনি রাহুলকে সার্কাসের জোকার বলেও কটুক্তি করেন। এ কারনে ক্ষুব্ধ হয়ে দল তাকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেয়। এদিকে রাহুলের বিরুদ্ধে দলের মধ্যে কিছুটা হলেও যে ‘বিদ্রোহ’ তৈরি হয়েছে তার আঁচ পাওয়া গেছে দলের কর্মকাণ্ডে। একদশক পর লোকসভায় নেতা নির্বাচনে পরিবর্তনের হাওয়া লাগল। লোকসভায় কংগ্রেসের মূল ধ্বজাধারীর ভূমিকা থেকে সরে দাঁড়িয়েছে গান্ধী পরিবার। নিজে বা রাহুল গান্ধীকে মনোনীত না করে সাবেক রেলমন্ত্রী তথা কর্নাটকের দলিত নেতা মল্লিকার্জুন খাড়গেকে লোকসভার দলীয় নেতা নির্বাচন করেছেন সোনিয়া গান্ধী। দলীয় অনেকের অনুরোধ সত্ত্বেও সোনিয়াও এই দায়িত্ব নিতে চাননি। পুত্রকেও আর বিরক্তিকর পরিস্থিতিতে ফেলতে চাননি। তাই দলিত নেতা খাড়গেকেই বেছে নিলেন কংগ্রেস সভানেত্রী। কংগ্রেস যদি লোকসভায় বিরোধী দলের মর্যাদা পায় তবে খাড়গেই হবেন বিরোধীদলীয় নেতা। রাহুল অনুগামীরা আশা করছেন, আশা পূরণ না হবার বেদনায় বিজেপি সরকারের প্রতি যখন মানুষের ক্ষোভ তৈরি হবে তখন মানুষ আবার কংগ্রেসমুখী হবে। সেই অবস্থায় রাহুল আবার দলের সামনে এলে এবারের নির্বাচনে এমন লজ্জাকর পরাজয়ের কথা দলীয় নেতাকর্মীরা ভুলে যাবে।