কেমন হবে সেই দৃশ্য!

আপডেট : ০৮ জুন ২০১৪, ২১:৫৯
ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর নরেন্দ্র মোদীকে প্রতিবেশী দেশসহ বিশ্বের প্রায় প্রতিটি প্রভাবশালী দেশের সরকার প্রধানরা অভিনন্দন জানিয়েছেন। একই সঙ্গে মোদীকে সেসব দেশ সফরেরও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। এমনকি মোদীকে অভিনন্দন জানিয়ে আমন্ত্রণ করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাও। গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী যে রাষ্ট্রটিতে এক প্রকারের নিষিদ্ধ ছিলো সেই রাষ্ট্রই চাইছে প্রধানমন্ত্রী মোদীকে আলিঙ্গন করতে। আগামী সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে ওয়াশিংটনে বারাক ওবামার সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করবেন নরেন্দ্র মোদী। বৈঠকটি নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের পাশাপাশি হবে না। বরং ওয়াশিংটনে এটি পূর্ণাঙ্গ দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হবে। বলা হচ্ছে, মোদী-ওবামার বৈঠক হবে এ বছরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক ঘটনা। সফরে যাওয়ার বিষয়ে মোদীর সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে দুই দেশের কৌশলগত সম্পর্কের গুরুত্ব ফুটে উঠেছে। যে যুক্তরাষ্ট্র একসময় মোদীর ভিসা প্রত্যাখ্যান করেছিল সেই দেশের রাষ্ট্রপ্রধানের সঙ্গে মোদীর বৈঠকের দৃশ্য কেমন হবে তা দেখার অপেক্ষায় ভারতসহ বিশ্ববাসী। তাদের বৈঠকে দুই দেশের সম্পর্কে কতটা প্রভাব পড়ে, আগ্রহের কেন্দ্রে ঠাঁই পেয়েছে সেটাও। মোদীর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের বৈরিতা শুরু হয়েছিলো সেই ২০০২ সালের গুজরাট দাঙ্গার পর থেকে। ঐ দাঙ্গায় হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়। যাদের বেশিরভাগই ছিলো মুসলিম। ঐ ঘটনার পর ২০০৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার জন্য ভিসার আবেদন করেছিলেন মোদী। কিন্তু তাকে ভিসা দেয়া হয়নি। এর পর থেকে মোদী আর যুক্তরাস্ট্রে ঢুকতে পারেননি। ১৯৯৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রে পাস হওয়া আইন অনুযায়ী ধর্মীয় স্বাধীনতার গুরুতর লঙ্ঘনকারী কোনো নেতা বা কর্মকর্তা যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা পাবে না। যুক্তরাষ্ট্রের ধর্মীয় স্বাধীনতা বিষয়ক এই আইনের কারণে এ যাবত্কালে শুধু মোদীর ভিসা প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। যদিও এই আইনের বিষয়ে অনেকেরই ধারণা নেই। বলা হয়, মুসলিম বিরোধী ঐ দাঙ্গা ঠেকাতে নরেন্দ্র্র মোদী ব্যর্থ হওয়ায় তাকে ভিসা দেয়া হয়নি। কিন্তু এবারের লোকসভার নির্বাচনে ভারতীয় জনতা পার্টি বিজেপি নরেন্দ্র মোদীকে প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী করার পর থেকেই তার সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নে নজর দেয় যুক্তরাষ্ট্র। এমনকি নির্বাচনের দিনই যুক্তরাষ্ট্রের তরফ থেকে জানানো হয়, মোদীকে এ-ওয়ান ভিসা প্রদান করা হবে। সাধারণত রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানরা এই ভিসা পেয়ে থাকেন। ২০০৫ সালে যখন মোদীর ভিসা প্রত্যাখ্যান করা হয়েছিলো তখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ছিলেন জর্জ ডব্লিউ বুশ। কিন্তু এখন বারাক ওবামার প্রশাসন ১২০ কোটি জনসংখ্যার সরকার প্রধানকে নানা কারণেই দূরে ঠেলতে পারছে না। যে কারণে মোদীকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। নরেন্দ্র মোদী বিজেপির প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী মনোনীত হলে যুক্তরাষ্ট্রই তার দিকে সুসম্পর্কের হাত প্রসারিত করে। ভারতে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মোদীর সঙ্গে সাক্ষাত্ করেন। নির্বাচনের আগে এক সাক্ষাত্কারে তিনি বলেন, নির্বাচনের পর নতুন সরকারের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক নতুন ধাপে উন্নীত হবে। ওবামা প্রশাসনের তরফ থেকে মোদীর দিকে বারবার আসা আমন্ত্রণ সেই কথারই ইঙ্গিত দেয়। গত শুক্রবার ভারতের টাইমস অব ইন্ডিয়ার এক মন্তব্যে বলা হয়েছে, ওয়াশিংটনে মোদী-ওবামা দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের মধ্য দিয়ে সম্পর্কের শীতলতা কাটতে পারে। পুনঃস্থাপিত হতে পারে দুই দেশের সম্পর্ক। একইসঙ্গে মোদীর যাওয়ার সিদ্ধান্তকে খুবই বাস্তবসম্মত বলে মন্তব্য করা হয়েছে। বলা হচ্ছে, মোদীর বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মনোভাবের এই ‘ইউ-টার্ন’ এর অর্থ হলো বাণিজ্য এবং বিনিয়োগসহ নানা ক্ষেত্রে তারা এখন জোর দিতে চায়। ঐ মন্তব্যে আরো বলা হয়েছে, কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউপিএ জোট সরকারের সময় দুই দেশের মধ্যে উচ্চ পর্যায়ের পরমাণু চুক্তি ও কৌশলগত অংশীদারিত্ব সংলাপ শুরু হলেও ভারত-যুক্তরাষ্ট্র তাদের সম্পর্কের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে ব্যর্থ হয়েছে। যদিও এর জন্য ভারত কিছুটা দায়ী ছিলো। বিশেষ করে ভারত নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে মার্কিন বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সীমিত করে দিয়েছিলো। অন্যদিকে, বিশ্ব মন্দার কারণে যুক্তরাষ্ট্র ভারতীয় পণ্য রপ্তানিতে সংরক্ষণশীল নীতি গ্রহণ করেছিলো। এছাড়া ভারতের সদ্য বিদায় নেয়া কংগ্রেস জোট সরকারের শেষদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কে টানাপোড়েন দেখা দেয়। যদিও দুইপক্ষ তা সরাসরি কখনোই স্বীকার করেনি। ভারতের কূটনীতিক দেবযানি খোবড়াগারেকে নিয়েই এই অস্বস্তির সৃষ্টি হয়েছিলো। বিশ্লেষকরা বলছেন, নরেন্দ্র মোদী ব্যবসাবান্ধব নেতা হিসেবে পরিচিত। গুজরাটের উন্নয়নকে তিনি ভারতের মডেল হিসেবে উল্লেখ করে নির্বাচনে প্রচারণা চালিয়েছেন। তার অর্থনৈতিক সংস্কারের অঙ্গীকারের কারণে ভারতের বীমা, অবকাঠামো ও প্রতিরক্ষাসহ বিভিন্ন খাতে বিদেশি বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি হবে। এ সুযোগ নেয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের মনোভাব পরিবর্তিত হতে পারে। আবার ভারতের অর্থনীতির পুনর্জীবনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগ ও প্রযুক্তির প্রয়োজন রয়েছে। পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে দুই দেশের একে-অন্যকে আগের যেকোন সময়ের চেয়ে এখন বেশি প্রয়োজন। এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের নীতির জন্য ভারতকে তাদের প্রয়োজন আছে। আবার আফগানিস্তান থেকে যুক্তরাষ্ট্র সেনা সরিয়ে নিচ্ছে। সেনা প্রত্যাহারের পর সেখানে নিরাপত্তা শূন্যতার সৃষ্টি হবে যা ভারতের জন্য উদ্বেগের। এ অবস্থায় এ অঞ্চলের জন্য একটি সমন্বিত নিরাপত্তা পরিকল্পনা প্রণয়নে যুক্তরাষ্ট্র-ভারতকে একসঙ্গে কাজ করা উচিত। ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের নতুন যাত্রার জন্য অর্থনীতি আর নিরাপত্তাই মৌলিক ইস্যু হওয়া উচিত।