বিশ্বের পরাশক্তি বলতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকেই বোঝায়। অর্থনৈতিক এবং সামরিকসহ সব দিক থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান উপরে। যদিও চীন দিনে দিনে যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে যাওয়ার পথে রয়েছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন। তবে শেষ পর্যন্ত চীনের সেই চেষ্টা কতটুকু সফল হবে তা নিয়ে এখনো নানা আলোচনা-সমালোচনা আছে। বিগত কয়েকটি যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের যেমন বিপুল পরিমাণ আর্থিক ব্যয় হয়েছে তেমনি হারাতে হয়েছে দেশটির অনেক সৈন্যকে। বিশ্বে বিবেকবান মানুষের কাছ থেকে বদনামও কম পেতে হয়নি। ফলে সেই পরাশক্তি এখন বন্ধুত্বের পররাষ্ট্রনীতিকেই গুরুত্ব দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র প্রেসিডেন্টের সাম্প্রতিক এক বক্তব্যে সেটারই প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। তিনি বিগত কয়েকটি যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের জড়ানোকে ‘বড় ধরনের ভুল’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। তবে তাই বলে কোনোভাবেই বিশ্বের নেতৃত্ব কারো হাতে তুলে দেবে না যুক্তরাষ্ট্র। সেটার প্রমাণ প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সাম্প্রতিক পূর্ব ইউরোপ সফর এবং তার আগে ১০০ কোটি মার্কিন ডলারের একটি সহায়তা ঘোষণা।
ইরাক, আফগানিস্তান যুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে কড়া মাশুল দিতে হয়েছে। লিবিয়ার ক্ষেত্রেও ব্যয় বেড়েছে দেশটির। গত বছর হার্ভাড ইউনিভার্সিটির কেনেডি স্কুল অব গভর্নমেন্টের এক সমীক্ষায় দেখা যায়, ইরাক এবং আফগানিস্তান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে ৬ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয় করতে হয়েছে। ইরাকের ক্ষেত্রে ব্যয় হয়েছে প্রায় দুই ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার। গত বছর করা ব্রাউন ইউনিভার্সিটির ওয়াটসন ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাডিজের এক সমীক্ষায় উল্লেখ করা হয়, ইরাক যুদ্ধে ইরাকে ১ লাখ ৩৪ হাজার বেসামরিক নাগরিক মারা গেছে। আর জঙ্গি, সাংবাদিক এবং স্বেচ্ছাসেবকসহ মৃতের এই সংখ্যা ১ লাখ ৭৬ হাজার থেকে ১ লাখ ৮৯ হাজার হতে পারে। ইরাক এবং আফগানিস্তান যুদ্ধ যে ভুল ছিল সেটা সম্প্রতি এক বক্তব্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা স্বীকার করেছেন। যদিও কোনো যুদ্ধে নাম উল্লেখ করেননি। গত বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট পয়েন্ট মিলিটারি একাডেমিতে প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করা নতুন সেনাসদস্যদের উদ্দেশে দেয়া এক বক্তব্যে ওবামা বলেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আগে-পিছে চিন্তা না করে দ্রুত কিছু ব্যয়বহুল যুদ্ধে যাওয়া হয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট যুদ্ধ নিয়ে ভুল স্বীকার করলেও কোনোমতেই বিশ্ব নেতৃত্ব যুক্তরাষ্ট্রের বাইরের কারো হাতে না দেয়ার প্রত্যয়ও ব্যক্ত করেছেন। মিলিটারি একাডেমির ওই বক্তৃতায় ওবামা বলেন, বিশ্ব নেতৃত্ব যুক্তরাষ্ট্রের হাতেই থাকা উচিত। তবে সেটা যেন অন্ধের মতো যুদ্ধের মাধ্যমে না হয়। সেটা হতে হবে বন্ধুত্বের মাধ্যমে। তিনি বলেন, বিশ্ব নেতৃত্ব যুক্তরাষ্ট্র দেবে কিনা সেটা মোক্ষম বিষয় নয়। মূল বিষয় হলো- কিভাবে এই নেতৃত্ব দেবে। আর এক্ষেত্রে সামরিক বাহিনীই একমাত্র হাতিয়ার নয়। তিনি এক্ষেত্রে বন্ধত্বপূর্ণ সম্পর্ককেই গুরুত্ব দেন।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিগত কয়েক বছরের কর্মকাণ্ডে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের নজিরও পাওয়া গেছে। সিরিয়া এবং ইরান ইস্যুতে দেশটি আলোচনার মাধ্যমেই সমাধানের দিকে গেছেন। বিশেষ করে সিরিয়া যুদ্ধ এড়ানো গেছে। ইরানের পরমাণু ইস্যু নিয়ে এখনো আলোচনা চলছে। সম্প্রতি বিশ্বে আলোচিত ইউক্রেন ইস্যুকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। রাশিয়া যাতে কোনোভাবেই পূর্ব ইউরোপ তথা পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোতে নিজেদের শক্তি বৃদ্ধি করতে না পারে সেজন্য প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছেন ওবামা। তিনি গত মঙ্গলবার ইউরোপ সফরের আগে ইউরোপের নিরাপত্তায় ১শ কোটি মার্কিন ডলারের একটি নতুন তহবিলের ঘোষণা দিয়েছেন। ইউরোপে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি বাড়াতে এ তহবিল ব্যয় করা হবে। ওই অঞ্চলে সামরিক রসদের মজুদ গড়ে তোলা এবং পোল্যান্ডে আরো ব্যাপক পরিসরে সামরিক মহড়া চালানো। ওবামা পূর্ব ইউরোপে মার্কিন সেনা আরো বাড়ানোরও প্রতিশ্রুতি দেন। ইউক্রেন নিয়ে রাশিয়ার সঙ্গে উত্তেজনা বাড়তে থাকার সময়ে সামরিক মহড়ার জন্য পোল্যান্ডে গত এপ্রিলে ১৫০ সেনা পাঠায় যুক্তরাষ্ট্র।
ইউরোপে যুক্তরাষ্ট্রের আশা বাস্তবায়ন করা কতটা সম্ভব হবে তা নিয়ে আছে নানা আলোচনা। যুক্তরাষ্ট্র প্রথম থেকেই ইউরোপীয় ইউনিয়নের ঐক্যবদ্ধতার ব্যাপারে সমর্থন দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের মত, ইউরোপ ঐক্যবদ্ধ থাকলেই শক্তিশালী হবে এবং সেটা যুক্তরাষ্ট্রকে আরো শক্তিশালী হবে; কিন্তু ইউরোপ এখনো তাদের ঐক্যবদ্ধতার রূপ প্রকাশ করতে পারেনি। এখনো ইউরোপীয় দেশগুলোতে ইইউ-বিরোধিতা ব্যাপক জোরালো হচ্ছে। আর সম্প্রতি ইইউ নির্বাচনে ইইউ-বিরোধী দলগুলোই জয়লাভ করেছে। ইউরোপীয় দেশগুলোতে যখন সামরিক শক্তি বৃদ্ধির চিন্তা করছে যুক্তরাষ্ট্র, তখন দেশগুলো তাদের সামরিক বাজেট কমিয়ে আনছে। জার্মানিতে নিযুক্ত সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত জন কর্নব্লাম বলেন, ইউরোপে সামরিক শক্তি বৃদ্ধির সমন্বিত পদক্ষেপ খুব সামান্যই লক্ষ্য করা গেছে। তাছাড়া পররাষ্ট্রনীতিতে কোনো সমন্বিত কৌশলও লক্ষ্য করা যায়নি। ব্রিটিশ দার্শনিক জাগমান বাওমান বলেন, ইইউ দেশগুলো বিশ্বায়নের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় খুব সামান্যই এগুতে পারছে। যুক্তরাষ্ট্র যখন ইউরোপে সামরিক শক্তি বৃদ্ধির চেষ্টা করছে তখন দেশগুলো দারিদ্র্যের কথা জানান দিচ্ছে। তাদের কাছ থেকে তেমন কোনো সাড়াও পাওয়া যাচ্ছে না।
ইউরোপের শক্তিশালী রাষ্ট্র জার্মানির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের কিছুটা অবনতিও হয়েছে। জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঞ্জেলা মার্কেলের ফোনে যুক্তরাষ্ট্রের আড়িপাতা দেশ দুইটির ইতিবাচক সম্পর্কে অনেকটা আঘাতই দিয়েছে। বিশেষ করে দেশটির জনগণ যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি বিরূপ মনোভাবই দেখিয়েছে। সম্প্রতি আবার জার্মানির আদালত আড়িপাতার বিষয়টিতে তদন্ত করবে বলে জানিয়েছে। আর আড়িপাতার বিষয়টি শেষ পর্যন্ত সত্যি প্রমাণিত হলে দ্বি-পাক্ষিক সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের স্মরণীয় দিন ডি-ডে উপলক্ষে শুক্রবার ফ্রান্সের নরম্যান্ডির সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেন ইউরোপ-আমেরিকার নেতারা। সেখানে রুশ প্রেসিডেন্টের সাথে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামারও অনানুষ্ঠানিক বৈঠক হয়েছে। দশ-পনেরো মিনিটের ঐ বৈঠকে ওবামা পুতিনকে ইউক্রেন সীমান্তে অস্ত্র ও রসদ সরবরাহ বন্ধ করার কথা বলেন। একই সাথে প্রেসিডেন্ট পোরোশেনকোকে স্বীকৃতি দিতেও অনুরোধ জানান ওবামা।
