আপন বোন জিনাত ও তার স্বামীকে হত্যার পরও বিন্দুমাত্র অনুশোচনা নেই রবিন জিয়ার। নিয়মিত গীর্জায় যাতায়াত করেন। নিজস্ব বাড়ি ও ব্যবসা রয়েছে লাহোরে: স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে তিনি আছেন বেশ। ১২ বছর আগে সহোদর সালমান জিয়াকে নিয়ে ওই খুন দু’টি ঘটিয়েছিলেন খুব ঠাণ্ডা মাথায়। বাড়িতে ঢোকার পর যথারীতি হয়েছিল কুশল বিনিময়। শেষ হয়েছিল আপ্যাায়ন পর্বও। কিন্তু রবিনের সঙ্গে ছিল যে কসাইয়ের ছুরি! এর পরের ঘটনা— মেঝেতে বয়ে গিয়েছিল রক্তের স্রোত। বোনের অপরাধ ছিল, নিজের পছন্দে বিয়ে করা। এ পৈশাচিক ঘটনা ঘটানোর কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে রবিন জিয়া বলেছিলেন ‘পরিবারের সম্মান নষ্ট হয়েছিল। সমাজ ও সম্প্রদায়ের কাছে আমরা হয়ে গিয়েছিলাম ঘৃণা ও অবজ্ঞার পাত্র। সেজন্যই ওই পথ বেছে নেয়া ছাড়া আমাদের সামনে কোন উপায় ছিল না। এতে আমি এবং আমার ভাই অনুতপ্ত নই।’
হত্যার দায়ে মাত্র কয়েক মাস জেলে কাটাতে হয়েছিল রবিন ও সালমান জিয়াকে। ‘কিসাস’ এবং ‘দিয়াত’ অধ্যাদেশের মাধ্যমে তাদের মা ক্ষমার বিবৃতি দেয়ার পর দেয়া হয়েছিল মুক্তি। মায়ের যুক্তি ছিল এরকম: মেয়ে তো গেছেই। তাকে আর ফিরে পাওয়া যাবে না। এখন ছেলে দু’টিকেও হারিয়ে কী লাভ।’ কিন্তু মানবাধিকার কর্মীদের দাবি, অনার কিলিংয়ের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের উচিত আইনের শিথিলতা পরিহার করা। পাকিস্তানে অনার কিলিং যেনো বিধান হয়ে দাঁড়িয়েছে; চলে আসছে যুগের পর যুগ ধরে। অনার কিলিং-এর বাংলা হতে পারে মোটামুটি এরকম— সম্মানহানির কারণে হত্যা। পরিবার কিংবা সমাজের কোন সদস্য পরিবার অথবা সম্প্রদায়ের জন্য অসম্মান বয়ে আনলে অন্য সদস্য কর্তৃক হত্যাকেই বলা হয়ে থাকে অনার কিলিং। যেসব কারণে এমন হত্যাকাণ্ড সাধারণত ঘটে, সেগুলো হচ্ছে— অভিভাবকের পছন্দ করা পাত্র-পাত্রীর সঙ্গে বিয়েতে রাজি না হওয়া কিংবা নিজের পছন্দের কাউকে বিয়ে করতে বাড়ি থেকে পালিয়ে যাওয়া, অননুমোদিত আত্মীয়ের সঙ্গে সম্পর্কে জড়ানো, বিয়ে বহির্ভূত যৌন সম্পর্ক, ধর্ষণের শিকার হওয়া, অশালীন পোশাক পরিধান ইত্যাদি। এসব ক্ষেত্রে পুরুষ ও নারী উভয়ই হত্যার শিকার হতে পারে, তবে প্রায় সব অনার কিলিংই ঘটছে নারীদের ক্ষেত্রে। এ দোষে পাকিস্তান শুধু একাই দোষী নয়। পৃথিবীর অনেক দেশে ঘটছে জঘন্য অনার কিলিং, এমনকি ভারতেও। তবে পাকিস্তানে এর তীব্রতা অনেক বেশি এবং সেখানে আইনের ফাঁক-ফোকর দিয়ে পার পেয়ে যাওয়ার হার অনেক বেশি। সহজে কেউ সাক্ষ্যও দিতে চায় না।
পাকিস্তানের মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্যানুসারে, ২০১১ সালে দেশটিতে অনার কিলিং ঘটেছিল ৭২০টি। এরমধ্যে ৬৫০ জন নারী এবং ১১৫ জন পুরুষ। প্রকৃত সংখ্যাটা জানা না গেলেও গত দু’বছর এমন হত্যাকাণ্ড আরো বেশি পরিমাণে যে ঘটেছে তাতে কোন সন্দেহ নেই। ১৯৯৮ থেকে ২০০৪— এসময়ে সংখ্যাটা ছিল চার হাজারেরও বেশি। স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত হাজার হাজার নরনারী এমন বর্বরতার শিকার হয়েছেন। অনেকের মতে সংখ্যাটা লাখেও পৌঁছুতে পারে। অনার কিলিংয়ের সর্বোচ্চ হার পাঞ্জাব ও সিন্ধু প্রদেশে আর সবচে’ কম ঘটে উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ ও বেলুচিস্তানে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এ ধরনের হত্যার অভিযোগ আদালত পর্যন্ত পৌঁছায় না। সম্প্রদায়ের নেতারা তার আগেই সব মিটমাট করে ফেলেন।
গত ২৭ মে লাহোর হাইকোর্টের সামনে ২৫ বছর বয়সী ফারজানা পারভীনকে ইট দিয়ে নির্মমভাবে হত্যার পর মৃতদেহ নিয়ে দুই পরিবারের টানা-হেঁচড়ার খবর স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক মিডিয়া ফলাও করে প্রচার করায় প্রধানমন্ত্রী নেওয়াজ শরীফ এড়িয়ে যেতে পারেননি বিষয়টি। তিনি এটিকে মানবাধিকার লঙ্ঘন উল্লেখ করে তদন্ত কমিটি গঠনের নির্দেশ দেন।
পাকিস্তানের ইংরেজি পত্রিকাগুলোতে সপ্তায় অন্তত দু’তিনটি অনার কিলিংয়ের খবর ছাপা হয়। অবাক করার মতো তথ্য হল, অন্যান্য কারণে নারীদের হত্যার পরও অনার কিলিং বলে চালিয়ে দেয়া হয়। নারী অধিকার কর্মী ও আউরাত ফাউন্ডেশনের আইনজীবী মালিহা জিয়া মনে করেন, শুধু আইন প্রণয়ন করে অনার কিলিং নামক অসভ্য কর্মটি বন্ধ করা যাবে না, সবার আগে প্রয়োজন সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি। নইলে জিনাত ও ফারজানার মতো পরিণতি বরণ করতে হবে আরো অনেক নারীকে।
