নাইক্ষ্যংছড়ির পানছড়ি সীমান্তে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর গুলিতেই নিহত হয়েছেন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) কর্পোরাল মিজানুর রহমান (৪৩)। গত ২৮ মে সকালে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর লেফটেন্যান্ট জ মো অং এর নেতৃত্বে বিজিবির টহল দলের উপর ওই হামলা চালানো হয় বলে দেশটির গণমাধ্যমে দাবি করা হয়েছে।
এদিকে বর্তমানে বাংলাদেশ সীমান্তে মিয়ানমারের বর্ডার গার্ড পুলিশের (বিজিপি) পরিবর্তে তাদের সেনাবাহিনী দায়িত্ব পালন করছে। তবে তারা সীমান্তের জিরো পয়েন্ট এলাকার অবস্থান প্রত্যাহার করে কিছুটা পিছু হটেছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আগামীকাল মঙ্গলবার মিয়ানমারের রাজধানী নেপিডোতে বিজিবি-বিজিপির মহাপরিচালক পর্যায়ে বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। বৈঠক ১৩ জুন পর্যন্ত চলবে বলে বিজিবি সূত্রে জানা গেছে।
কক্সবাজার প্রতিনিধি জানান, মিয়ানমারের গণমাধ্যম ‘নারিনজা নিউজ’ তাদের সেনাবাহিনীর বরাত দিয়ে জানিয়েছে, ঐ দিন পানছড়ি সীমান্তের কাঁটাতারের পাশে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর এলআইবি-৩৫২ এর কিছু সদস্য অবস্থান নিয়েছিল। এসময় তারা গুলি করে বিজিবি নয়, একজন আরএসও (রোহিঙ্গা সলিডারিটি অরগানাইজেসন) সদস্যকে হত্যা করে। তার কাছ থেকে একটি এম-২২ অটোমেটিক রাইফেল ও ১২০টি তাজা বুলেট উদ্ধার করে। এছাড়া গুলিবিদ্ধ অবস্থায় একজন পালিয়ে যায়। এ সংবাদের বিষয়ে কক্সবাজার সেক্টরের নাইক্ষ্যংছড়িস্থ ৩১ বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্নেল শফিকুর রহমানের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, মিয়ানমারের অভিযোগ বানোয়াট। ঘটনার দিন বিজিবি সদস্যরা নিয়ম মোতাবেক সাদা ও নীল পতাকা হাতে নিয়েই নো-ম্যান্স ল্যান্ডে যায়। এসময় মিয়ানমার বাহিনী গুলী ছুঁড়লে তারা ‘বিজিবি’, ‘বিডিআর’ বলে বার বার চিত্কারও করে। কিন্তু মিয়ানমার বাহিনী তাদের কথা শুনেনি। বর্তমানে সীমান্তে বর্ডার গার্ড পুলিশের পরিবর্তে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর দায়িত্ব পালন করার কথা স্বীকার করে তিনি বলেন, সীমান্তরক্ষী বা আধা সামরিক বাহিনী ছাড়া সীমান্তে সেনাবাহিনীর দায়িত্ব পালনের কথা নয়। কিন্তু মিয়ানমার বিজিবিকে না জানিয়েই সীমান্তে সৈন্য সমাবেশ করেছে।
মিয়ানমার সীমান্তে সেনা মোতায়েন!
উখিয়া (কক্সবাজার) সংবাদদাতা জানান, মিয়ানমার সীমান্তরক্ষী বাহিনী এখনো পর্যন্ত সীমান্তে ভারী অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে টহল অব্যাহত রেখেছে। এছাড়া দেশটির ফকিরাবাজার, বলিবাজার ও বুচিদং সেনা ক্যাম্পে প্রায় ২০ হাজার সেনা সদস্য অবস্থান নিয়েছে বলে সীমান্তের বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া তথ্যে জানা গেছে। ঐসব ক্যাম্পে শত শত রোহিঙ্গা নাগরিককে আর্মির ব্যবহূত মালামাল বহনসহ যেকোন পরিস্থিতিতে মানব ঢাল হিসেবে ব্যবহার করার জন্য রাখা হয়েছে।
জানা গেছে, মিজানুর রহমানের মৃত্যুর পর গত ৫ জুন মিয়ানমারের মংডু শহরে বিজিপি ও বিজিবি’র উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে বিজিবি’র লুণ্ঠিত অস্ত্র ও গোলাবারুদ ফেরত দিয়েই বিজিপি সীমান্তে শক্তি বৃদ্ধি করতে থাকে। তারা পুরো সীমান্ত এলাকায় বাঙ্কার নির্মাণ করে রণ প্রস্তুতি নিয়েছে বলে জানা গেছে।
মিয়ানমারের ওপার থেকে প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে, রবিবার থেকে সেদেশের সেনা সদস্যরা জিরো পয়েন্ট এলাকা ছেড়ে দূরবর্তী স্থানে অবস্থান নিলেও বিজিপি সীমান্তের অভ্যন্তরে ভারী অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে টহল জোরদার রেখেছে। সীমান্ত এলাকা জুড়ে সান্ধ্য আইন জারি করে রোহিঙ্গা নাগরিকদের চলাচলের উপর কড়াকড়ি আরোপ করেছে। সন্ধ্যার পর বাড়ি থেকে বের না হওয়ার নির্দেশ থাকায় রোহিঙ্গাদের মধ্যে বিরাজ করছে চরম উদ্বেগ-উত্কণ্ঠা।
তবে ১৭ বিজিবি’র অধিনায়ক লে. কর্নেল খন্দকার সাইফুল আলম বলেন, সীমান্ত পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে উঠছে। সীমান্ত এলাকায় বসবাসকারী লোকজনের মাঝে আতঙ্ক একটু কমেছে। এদিকে বিজিবি-বিজিপি মহাপরিচালক পর্যায়ের বৈঠকের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ঢাকাস্থ বিজিবি সদর দপ্তরের গণসংযোগ কর্মকর্তা মহসিন রেজা।
