বাবা বলেন খোকা বাবু। মায়ের মুখে খোকা। যেন সে চিরকালের খোকা। খোকার প্রতি তাঁদের আদর-স্নেহের যেমন শেষ নেই। অন্যদিকে বাবা-মায়ের ওপর তারা অসীম শ্রদ্ধা ও ভক্তির এক ফোঁটাও যেন ঘটতি নেই। বরং খোকা এমন কিছু দুরন্ত কাজ করে বসে যা বাবা-মায়ের মুখটাকে উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর করে তোলে। তাই বলে এই খোকা কিন্তু প্রকৃতির মতো নীরব নয়। মাঝে মাঝে ঝর্নার মতো চঞ্চল হয়ে ওঠে। তখন তার দুরন্তপনার যেন শেষ থাকে না। বাড়ির কাছেই বিল। বর্ষায় থই থই করে পানি। খোকা ঝাঁপিয়ে পড়ে পানিতে। ধেয়ে চলে যায় বিলের ঠিক মাঝখানে আবার ধেয়ে আসে পাড়ে। এই এক অপূর্ব খেলায় যেন মেতে থাকে। একসময় চোখজোড়া লাল হয়ে ওঠে। শরীরটাও নেতিয়ে আসে। ঠিক তখনই ঘরে ফিরে যায়। তার দুরন্তপনার আরো যে কত হাজারো কাহিনী। তবে তার একটি চৌকন ফুটবল টিম আছে। টিমটিতে বাইরের কোনো ছেলে নেই। প্রত্যেকটি ছেলেই তার বন্ধু। ওরাও ঠিক তার মতোই দুরন্ত ও ডানপিটে। সহজেই হেরে যাওয়ার পাত্র নয়। ওরা যখন মাঠে খেলতে নামে জীবনবাজি রেখেই খেলতে চেষ্টা করে। এবারও খুব কম খেলাতেই পরাজিত হয়েছে তারা। টিমটির আলাদা একটা বৈশিষ্ট্য আছে। যা অন্যসব টিমে খুঁজে পাওয়া যায় না। যেমন গ্রাম থেকে কাছে বা দূরে কোথাও খেলা অনুষ্ঠিত হলে তাতে অংশগ্রহণ করবেই। কোনো টিমকেই বিনা প্রতিযোগিতায় ছেড়ে দেবে না। তাদের খেলার নৈপুণ্যতায় অনেক দর্শকই মুগ্ধ। তাই টিমটির যখন কোথাও খেলা থাকে তখন দর্শকের পরিমাণ অনেক অনেক গুণ বেড়ে যায়। দর্শকসারিতে তিল ধারণের ঠাঁই থাকে না। গাদাগাদি হয়ে দাঁড়িয়ে খেলা দেখে নির্বাক চোখে।
খোকাকে নিয়ে মায়ের দুশ্চিন্তার যেন শেষ নেই। খেলার প্রতি তার ঝোঁক অত্যন্ত বেশি। খেলতে মানা নেই কিন্তু খেলতে গিয়ে যদি এক্সিডেন্ট করে বসে। হাত না ভেঙে যায়। তখন তো মহাসর্বনাশ হয়ে যাবে। মানে জীবনটা সেখানেই থেমে যাবে। ব্যাপারটা নিয়ে তিনি খুবই উদ্বিগ্ন থাকেন।
বাবা গোপালগঞ্জে চাকরি করেন। দিন পনেরো পর পর বাড়িতে আসেন। তিনি খুবই হাসিখুশি একজন মানুষ। গ্রামের লোকজনের সঙ্গে মেলামেশাতে তার যেন কোনো জুড়ি নেই। তাই গ্রামের লোকজন উন্মুখ হয়ে থাকেন লুত্ফর রহমান কোনদিন বাড়িতে আসবেন। তার সঙ্গে প্রাণ খুলে মনের কথাগুলো বলবেন।
একদিন মা অভিযোগমিশ্রিত গলায় বললেন, তোমার খোকা বাবুকে নিয়ে তো আর পারছি না।
কেন? ও আবার কি করল?
ফুটবল খেলা নিয়ে খুব বেশি মেতে থাকে। শুনলাম একটা টিমও নাকি গঠন করেছে। এতে পড়াশোনার ক্ষতি হচ্ছে না।
লুত্ফর রহমান হেসে বললেন, পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলার প্রয়োজন আছে। তাতে একদিকে যেমন স্বাস্থ্য ভালো থাকে অন্যদিকে মনটা সতেজ করে।
কথাটা বললাম, আর অমনি হাজারটা যুক্তি দাঁড় করিয়ে দিলে। যখন পরীক্ষায় ফেল মারবে তখনই আমার কথাটা বিশ্বাস করবে। আমার ছেলে কখনো ফেল করতে পারে না। বরং বরাবরের চেয়ে আরো অনেক ভালো করবে। এই বিশ্বাসটা আমার আছে। যাক সামনের পরীক্ষাটার পর ওকে আমার কাছে নিয়ে যাব। গোপালগঞ্জে ভালো একটা ইস্কুলে ভর্তি করিয়ে দেব।
লুত্ফর রহমান চুপচাপ থাকার মতো লোক নন। তিনি কর্মপ্রিয় একজন মানুষ। তাঁর কর্মদক্ষতার ফলে গোপালগঞ্জ অফিসার্স ক্লাবের সেক্রেটারি নিযুক্ত হন এবং শক্তিশালী একটা ফুটবল টিম গঠন করেন। টিমটির পুরো দায়িত্বই তিনি পালন করেন। আর এ ব্যাপারে তার উত্সাহ-উদ্দীপনার কোনো ঘাটতি নেই বরং আরো অদম্য হয়ে ওঠেন। তাঁর এই টিম চলে পুরো সরকারি খরচে। মহকুমার বিভিন্ন এলাকায় যেখানে ভালো খেলোয়াড় ছিল। তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে। নানা সুযোগ-সুবিধার লোভ দেখিয়ে তাঁর টিমে নিয়ে আসত। যেমন সুখ-সুবিধার ব্যাপারে কোনোরকম কৃপণতা ছিল না। তেমনই উদারতারও কোনো ঘাটতি ছিল না তাঁর।
তখন বর্ষাকাল। চারদিকে নদী-নালা, খালবিলে উপচে ওঠা পানি। কেমন করে যেন থৈ থৈ করছে। পুরো অন্যরকম একটা দৃশ্য। এই সময় যানবাহন মানেই নৌকা, ডিঙি, কোষা, কলাগাছের ভেলা। খোকা একদিন নৌকা করে কোথায় জানি গিয়েছিল। সেখান থেকে আসার পথে হঠাত্ করে ঝড় উঠলে নৌকাটি ডুবে যায়। ভাগ্য ভালো খোকা অল্পের জন্য বেঁচে যায় এবং বাড়ি ফিরে আসে। তখন তার শরীরে প্রচণ্ড রকমের জ্বর আসে এবং দু’চোখে কঠিন সমস্যা দেখা দেয়। শরীরটাও আস্তে আস্তে কাহিল হয়ে আসতে থাকে। রোগের অবস্থাটা উপলব্ধি করতে পেরে বাবা তাকে চিকিত্সার জন্য কলকাতায় পাঠিয়ে দেন। সেখানে অনেকদিন থেকে চিকিত্সা করে, সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে তারপর বাড়ি ফিরে আসে। এসেই আবার পড়াশোনা ও ফুটবল খেলায় মেতে ওঠে। তবে এবার গ্রামে নয়। গোপালগঞ্জ শহরে। এসময় এ জেড খান এসডিও হিসাবে গোপালগঞ্জে আসেন। তিনি ফুটবল খেলতে পারতেন না কিন্তু ফুটবলের প্রতি ছিলো তার ভীষণ ভালোবাসা। শুধু তাই নয়। খেলোয়াড়দের পেছনে প্রচুর টাকা খরচ করতে কোনো রকম কার্পণ্য করতেন না।
লুত্ফর রহমান সাহেবের একটি শক্তিশালী ফুটবল টিম আছে। তা জেনে এ জেড খান খুবই খুশি হলেন এবং তাকে ডেকে নিয়ে প্রথমে ধন্যবাদ জানালেন। তারপর বললেন, ফুটবল খেলায় আপনার অনেক অবদান আছে। একটি ফুটবল টিমও আছে আপনার। এটা কোনো সাধারণ কথা নয়। নিঃসন্দেহ দুঃসাহসী একটি কাজ । এ ব্যাপারে আমার একটি উদ্যোগ আছে যা শুধু আপনার পক্ষেই বাস্তবায়ন করা সম্ভব।
লুত্ফর রহমান খুবই খুশি হলেন এবং আশ্বস্ত কণ্ঠে বললেন, আমি আপ্রাণ চেষ্টা করব।
আমি ‘এ জেড খান শিল্ড’ নাম দিয়ে একটি ফুটবল প্রতিযোগিতার আয়োজন করতে চাই। যার পুরো দায়িত্বটাই আপনাকে বহন করতে হবে। আর আর্থিক ব্যাপারটা আমি দেখব। আর দামী একটা শিল্ড দেব। যা নিদাবি হিসাবে গণ্য হবে।
মনে মনে এমন একটা প্রতিযোগিতার কথা অনেকদিন থেকেই ভেবে আসছিলেন লুত্ফর রহমান। যা আজ বাস্তবায়িত হতে যাচ্ছে। তিনি পুরো উদ্যমে কাজ শুরু করে দিলেন। নির্দিষ্ট দিনে নির্দিষ্ট টিমে প্রতিযোগিতা চলছে। খেলাটা যে এতো জমে উঠবে তা কেউ ভাবতেও পারেনি। আর দর্শক সারিতে লোকজনের পরিমাণ এতো বেড়ে যাচ্ছে যে তাদের জায়গা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। এতে আয়োজকদের মনে আনন্দ যেন আর ধরে না। তাতে যেমন খুশি এ জেড খান, তেমনই খুশি লুত্ফর রহমান। তাদের শ্রম যেন সার্থক হতে যাচ্ছে।
ফুটবল খেলাতে মারামারি হওয়াটা খুবই স্বাভাবিক একটা ব্যাপার কিন্তু এতোগুলো খেলা অনুষ্ঠিত হয়ে গেল। একদিনও মারামারির মতো অবস্থা হয়নি। অথচ দর্শক সারিতে সে কি উত্তেজনা। যেন লাফ মেরে তারা মাঠে নেমে যাবে এবং মারামারি শুরু করে দেবে। এর ঠ্যাং ভেঙে দেবে, ওর ঠ্যাং ভেঙে দেবে। এমনই একটা ভীতিকর অবস্থা। তবে তেমন কিছুই ঘটেনি।
ঠিক যুদ্ধের মতো প্রতিযোগিতা। অসংখ্য টিম অসংখ্যবার খেলা। দীর্ঘদিন খেলার পর অনেক টিমকে পরাজিত করে ফাইনালে এসে মুখোমুখি অবস্থান নিয়েছে যে দুটো টিম একটি হল লুত্ফর রহমানের টিম অন্যটি কিশোর খোকার টিম।
দর্শকদের মাঝে কৌতূহলের যেন শেষ নেই। সবার মাঝে অধীর একটা আগ্রহ। কোন টিমটি বিজয়ী হবে। বেশির ভাগ লোকেরই বিশ্বাস খোকার টিমই জয়ী হয়ে এই শিল্ডটি ছিনিয়ে নেবে। লুত্ফর রহমানের টিম ফাইনালে টিকতেই পারবে না। পরাজয় মেনে নিতেই হবে। কারণ মাঠে খেলোয়াড়দের খেলা দেখে জয়-পরাজয়ের ব্যাপারটা দর্শকরা অনুমান করে নিতে পারে। তারপরও ব্যতিক্রম কিছু ঘটে না। তা-ও ঠিক নয়। আর তা নির্ভর করে খেলোয়াড়দের ওপর।
ফাইনাল খেলা শুরু হয়ে গেল। যেন বাঘে বাঘে লড়াই। অন্যদিকে দিকে ব্যাপক দর্শক উপস্থিতি এই খেলার গুরুত্বটাকে হাজারো গুণ বাড়িয়ে দেয়। তুমুল প্রতিযোগিতা হচ্ছে সময় শেষে ড্র হচ্ছে। এইভাবে চারবার ড্র। তখন হেডমাস্টার বাবু এসে বললেন, খোকা তোমার বাবার কাছে হার মানো। আগামীকাল সকালে আবার খেলা।
খোকা বলল, স্যার আমরা সকলেই ক্লান্ত। সকলের পায়ে ব্যথা। দু’চারদিন বিশ্রাম দরকার।
তা আর হবে না বাবা। কালই খেলা অনুষ্ঠিত হবে।
পঞ্চম দিনে এক গোলে পরাজিত হল খোকার দল। পরাজিত হয়েও খোকার দলের এই পরাজয় অনেকেই মেনে নিতে পারেনি। কিন্তু খোকার মনে অনেক আনন্দ। তার দলের কাছে বাবার দল পরাজিত হয়নি। পরাজিত হয়নি ছেলের কাছে বাবা।
