বাংলা সাহিত্যে ও বাঙালি মননে কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯-১৯৭৬) স্বতন্ত্র মর্যাদায় চিহ্নিত হয়ে আছেন। তিনি একাধারে সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক নবজাগরণের বাণীবাহক। রবীন্দ্রযুগে যে ক’জন কবি রবীন্দ্রবলয়মুক্ত হয়ে স্বকীয় বৈশিষ্ট্যে ভাস্বর হয়ে আছেন কাজী নজরুল ইসলাম তাঁদের মধ্যে অন্যতম। তাঁকে বাংলা সাহিত্যের অন্যতম যুগস্রষ্টা কবি বললেও অত্যুক্তি হবে না। তাঁর আদর্শ, মনন, মেধা, বিদ্রোহী চেতনা সর্বোপরি সৃষ্টিশীলতা সব কালের, সব যুগের, সব দেশের মানুষের জন্য অনুকরণীয়। দারিদ্র্যের কষাঘাতে জর্জরিত থেকেও আজীবন তিনি ছিলেন সৃষ্টিমুখর। তাঁর সৃষ্টিশীলতা যেমন বিচিত্র ও ব্যাপক তেমনি ঘটনাবহুল তাঁর সমগ্র জীবন। মানবতাবাদী, প্রতিবাদী ও কালসচেতন নজরুল দেশ-জাতির মঙ্গল সাধনের জন্য ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে, ধর্মের নামে ভণ্ডামির বিরুদ্ধে, দরিদ্রের ওপর অত্যাচারের বিরুদ্ধে, নারীর প্রতি অবজ্ঞার বিরুদ্ধে এবং সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে কলম ধরেছিলেন। বিদ্রোহ, প্রেম, মানবতা, সাম্যবাদ ও নারীমুক্তির চেতনা ছড়িয়ে আছে তাঁর সাহিত্যের পরতে পরতে। আজ সময় এসেছে তাঁর সৃষ্টিশীল চেতনা আমাদের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার। বাংলাদেশে নজরুল সাহিত্য মূল্যায়ন, গবেষণা ও প্রচারের অভীষ্টে সৃষ্টি হয়েছে ‘নজরুল একাডেমি’ এবং সরকারিভাবে বৃহত্তর পরিসরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ‘নজরুল ইনস্টিটিউট’। এর বাইরেও নানা প্রতিষ্ঠান, বহু গবেষক ও বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় নজরুল সাহিত্যের নানা দিক নিয়ে নিরলস শ্রম স্বীকার করে আসছেন অদ্যাবধি। আমাদের বিশ্বাস—এর মাধ্যমে নজরুল চেতনা স্বদেশ-বিদেশে আরো ছড়িয়ে পড়বে দৃঢ়ভাবে। এপার ও ওপার বাংলায় নজরুলসংগীত সমভাবে জনপ্রিয়। বিদগ্ধজনের কাছে প্রত্যাশা—নজরুলসংগীতের আবহ যেন তাঁরা এ প্রজন্মের কাছে ছড়িয়ে দেন। পাশাপাশি বিশ্বময় নজরুলসংগীতকে কীভাবে ছড়িয়ে দেওয়া যায় অথবা প্রসারিত করা যায় সে ব্যাপারে উদ্যোগ গ্রহণ করেন। সরকারি, বেসরকারি এবং ব্যক্তিগত উদ্যোগে আসুন আমরা নজরুলচর্চা অব্যাহত রাখি। তারুণ্যের কাছে প্রত্যাশা—তারা যেন নজরুলের চেতনাকে মর্মে ও কর্মে ধারণ করে হয়ে ওঠে সৃষ্টিমুখর।
ঢাকা
