সেবাই চিকিত্সকদের প্রধান ব্রত হওয়ার কথা থাকলেও আজকের অধিকাংশ চিকিত্সকের মধ্যে এই গুণটির বড়ই অভাব। সে কারণে শহরাঞ্চল কিংবা মফস্বল সবক্ষেত্রেই চিকিত্সাসেবা গ্রহণকারীরা বঞ্চিত হচ্ছে চিকিত্সকদের আন্তরিক সেবা থেকে।
হাতযশ আর যোগ্যতার শ্রেণিভেদে বিভিন্ন চিকিত্সকের ফি বিভিন্ন রকম। চেম্বারে রোগী প্রতি সর্বনিম্ন ফি মফস্বলে ২০০ টাকা। শহরাঞ্চলে ৫০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত। সরকারি হাসপাতালে দায়সারা এবং গুরুত্বহীনভাবে রোগী দেখার অভিযোগ নতুন নয়। আর চেম্বার কিংবা কোয়ার্টারে দেখাতে চাইলে ধারাবাহিকতা অনুসরণ করে নির্দিষ্ট ফি প্রদান সাপেক্ষে চিকিত্সাসেবা গ্রহণ করতে হয়। বাংলাদেশের মানুষের গড় আয় যেখানে দৈনিক ১৮১ টাকা (প্রায়), সেখানে চিকিত্সকের উচ্চ ফি, ওষুধের মূল্য পরিশোধ করে স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া সত্যই দুরূহ। এরপর নব্বইর দশকের প্রথম থেকে শুরু হয়েছে বিভিন্ন ‘টেস্ট’ সংস্কৃতি। ছোটখাটো রোগের উপসর্গেও কোনো কোনো চিকিত্সক অযথা দেন বিভিন্ন ধরনের টেস্ট। রোগ সঠিকভাবে নির্ণয়ের অজুহাতে এই জাতীয় রক্ত, কফ, মূত্র টেস্ট কিংবা এক্সরে করার পেছনে একটা বড় কারণ অবশ্য আছে। তাহলো প্রতিটি টেস্ট বাবদ সংশ্লিষ্ট চিকিত্সক পেয়ে থাকেন শতকরা হিসেবে মাসোহারা। আর এই কারণেই সবকিছু স্বাভাবিক থাকার পরও গর্ভবতী মহিলাদের স্বাভাবিক গর্ভপাতের স্থলে অপারেশন করানোয় চিকিত্সকদের অধিক আগ্রহ। চিকিত্সকদের এই অধিক মুনাফা লোভের বলি হতে হচ্ছে দরিদ্র, হতদরিদ্র এবং মধ্যবিত্তদের। অথচ তাঁদের সব সময় মনে রাখা উচিত ছিল—এটা সেবামূলক পেশা, মুনাফা অর্জনের জায়গা নয়। এই শপথ নিয়েই তাঁরা এই পেশায় এসেছেন।
বছর তিনেক আগের একটা ঘটনা। দীর্ঘপথ হেঁটে এক অশীতিপর দরিদ্র বৃদ্ধ মফস্বলের এক সরকারি হাসপাতালের জনৈক চিকিত্সককে দেখাতে গিয়েছিলেন তাঁর কোয়ার্টারে। রোগীদের দীর্ঘ লাইন শেষ হলে চিকিত্সক ওই বৃদ্ধটির রোগের সমস্যার কথা শুনে তাঁকে একটা ব্যবস্থাপত্র লিখে দিলেন। এতে সর্বোচ্চ তিন মিনিট ব্যয় হলো। চিকিত্সক হাত বাড়িয়ে ফি চাইলে দরিদ্র রোগীটি জানালেন, তিনি অনেক কষ্টে মাত্র ১০০ টি টাকা জোগাড় করেছেন। এটা দিয়েই চিকিত্সকের ভিজিট এবং ওষুধ ক্রয় করতে হবে। ওই চিকিত্সক একথা শুনে ক্ষিপ্ত হয়ে রোগীটির হাত থেকে একশ টাকার নোটটি কেড়ে নিয়ে ধমক দিয়ে বললেন, আমার ভিজিট ৩০০ টাকা। একশ টাকা এখনকার মতো রাখছি। আপনি আর আমার কাছে আসবেন না।
এক শ্রেণির চিকিত্সকের এই মনোভাবের কারণে স্বাস্থ্যসেবার মান সারা দেশেই নিম্নতম পর্যায়ে পৌঁছেছে। অথচ আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকে চিকিত্সা নিয়ে আসা একজন জানিয়েছেন, তাদের মধ্যে অনৈতিক উপায়ে অর্থ উপার্জনের মানসিকতা নেই বললেই চলে। ওখানকার চিকিত্সক এবং সেবিকারা রোগীর প্রতি অতি আন্তরিক এবং রোগীর আরোগ্য লাভের জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করেন। আর হাসপাতালের পরিবেশ অত্যন্ত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন এবং শৃঙ্খলাময়, যা এদেশে নেই। এদেশে নার্সদের কাছ থেকে কাঙ্ক্ষিত সেবা পেতে গেলে বখশিশ দিতে হয় আর চিকিত্সকদের সঙ্গে কথাই বলা যায় না।
ফরিদপুর
