বিদেশি বিনিয়োগের জন্য বাংলাদেশ লাভজনক গন্তব্য উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির সম্ভাবনা দেখার জন্য চীনের উদ্যোক্তাদের বাংলাদেশ সফরের আহ্বান জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, বাংলাদেশে চীনের বিনিয়োগ লাভজনক হবে, বিশেষ করে ম্যানুফ্যাকচারিং ও সেবা খাতে অনেক সম্ভাবনা রয়েছে। কুনমিং থেকে ঢাকায় দুই ঘণ্টার ফ্লাইটে আপনারা বাংলাদেশে ব্যবসা-বাণিজ্যের যে সম্ভাবনা রয়েছে তা দেখে আসতে পারেন। গতকাল মঙ্গলবার প্রেসিডেন্টসিয়াল বেইজিং হোটেলে বাংলাদেশ-চীন অর্থনেতিক ও বাণিজ্যিক সহযোগিতা ফোরামে দেয়া ভাষণে তিনি এ কথা বলেন। ‘চায়না কাউন্সিল ফর দ্যা প্রমোশন অব ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড’ (সিসিপিআইটি) এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
এদিকে কর্ণফুলী নদীর তলদেশে টানেল নির্মাণে বাংলাদেশ ও চীন একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর (এমওইউ) করেছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রের বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা বাসস জানিয়েছে, এমওইউ অনুযায়ী চীন সরকার ১শ’ কোটি মার্কিন ডলার ব্যয়ে এই টানেল নির্মাণ করবে। বেইজিংয়ে এই সমঝোতা স্মারকে যোগাযোগ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম এবং চীনের পরিবহন ও যোগাযোগ উপমন্ত্রী চি-কু মাও স্বাক্ষর করেন। এছাড়া বাংলাদেশে একটি গার্মেন্ট পল্ল¬ী স্থাপনে বেইজিংয়ে বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুত ও রফতানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) ও চীনের ওরিয়ন ইন্টারন্যাশনাল হোল্ডিং কোম্পানির সঙ্গে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর হয়েছে। এমওইউ’র আওতায় ওরিয়ন হোল্ডিং কোম্পানি মুন্সিগঞ্জ জেলার গজারিয়ায় একটি গার্মেন্ট পল্ল¬ী নির্মাণ করবে। বিজিএমইএ সভাপতি আতিকুল ইসলাম এবং ওরিয়ন হোল্ডিং কোম্পানির নির্বাহী কর্মকর্তা ট্যাং ঝিয়াওজি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপস্থিতিতে এমওইউ’তে স্বাক্ষর করেন।
চীনা ব্যবসায়ীদের উদ্দেশ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং চীনের বাজারগুলোর মধ্যে একটি চমত্কার জায়গা। বাংলাদেশ একটি আঞ্চলিক অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডোরে (বিসিআইএম-ইসি) দ্রুত অগ্রগতির অপেক্ষায় রয়েছে বাংলাদেশ। বিদেশি বিনিয়োগের জন্য সরকারের দেয়া সুযোগ-সুবিধার বর্ণনা দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, চীনের বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশের উদ্যোক্তাদের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগেও অংশ নিতে পারেন। তারা ফার্মাসিউটিক্যাল, সিরামিকস, পর্যটন, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, সড়ক ও রেল যোগাযোগ, পেট্রোক্যামিকেলস এবং কৃষিভিত্তিক শিল্পে বিনিয়োগ করতে পারেন।
শেখ হাসিনা বলেন, চীনের ব্যাপক অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে বাংলাদেশ অভিভূত। চীন বাংলাদেশে অন্যতম প্রধান উন্নয়ন ও সহযোগিতার অংশীদার। আমাদের অবকাঠামো নির্মাণ প্রচেষ্টায় সমর্থন দিচ্ছে চীন। এছাড়া আমাদের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে সহজ শর্তে ঋণ দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, এসব উদ্যোগ ‘রূপকল্প-২০২১’ বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশকে একটি মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করতে অবদান রাখছে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের সোনার বাংলা বাস্তবায়নে এ রূপকল্প প্রণয়ন করা হয়েছে।
শেখ হাসিনা বলেন, সামপ্রতিক সময়ে বাংলাদেশের প্রতি চীনের সমর্থন ও সহযোগিতা গতি অর্জন করেছে। ২০১৪-১৮ মেয়াদে আমরা বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন খাতে চীনের সহযোগিতা চেয়েছি। আমাদের দেশের বেশ কয়েকটি মেগা প্রকল্পে চীনের অংশগ্রহণ ও সহায়তা কামনা করেছি, যা আমাদের যৌথ বিবৃতিতে উল্লে¬খ রয়েছে। তিনি বলেন, বিদ্যুত্ কেন্দ , রিভার টানেল নির্মাণ এবং একটি চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনসহ আমরা দু’পক্ষ বেশ কয়েকটি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছি। শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন একটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুত্ কেন্দ নির্মাণেও আমরা চীনের কোম্পানিগুলোর সঙ্গে যুক্ত হয়েছি।
দু’দেশের মধ্যে বিশাল বাণিজ্যিক ভারসাম্যহীনতার কথা উল্লে¬খ করে চীন আরো বাংলাদেশি পাট ও পাটজাত পণ্য, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, হিমায়িত মত্স্য, সিরামিকস এবং অন্যান্য পণ্য আমদানি করে এই বাণিজ্যিক ব্যবধান কমিয়ে আনবে বলে প্রধানমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন। শেখ হাসিনা বলেন, এপিটিএ’র আওতায় ২০১০ সালের জুলাই থেকে চীন বাংলাদেশে ৪ হাজার ৭শ’ পণ্যকে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার দিয়ে আসছে। বাংলাদেশে গুরুত্বপূর্ণ বাকি রফতানি পণ্যগুলোও চীনের শুল্ক ও কোটামুক্ত তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হবে বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
তিনি বলেন, ২০১৩-’১৪ অর্থবছরে বাংলাদেশ চীন থেকে প্রায় ৭শ’ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি করেছে। ফলে চীন আমাদের শীর্ষস্থানীয় দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যিক অংশীদার এবং ২০০৭ সাল থেকে বৃহত্তম আমদানির উেস পরিণত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশে চীনের বিনিয়োগও বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০১৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশের ৮টি রফতানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলে চীনের ৪৯টি কোম্পানি ৩০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছে। আরো প্রায় ৩শ’ বিনিয়োগকারী ২ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ ১৬ কোটি মানুষের একটি বিশাল বাজার। এর মধ্যে ৬০ শতাংশ লোকের বয়স ৪০ বছরের নিচে। এই তরুণ জনশক্তি উদ্যমী, মেধাবী এবং চৌকস। তারা সহজেই নতুন বাণিজ্য ও প্রযুক্তি গ্রহণ করতে পারে। সেলুলার টেলিফোন ও আইসিটি প্রযুক্তিসহ তারা একটি গতিশীল শক্তি। আইটি ও টেলিকম খাতে বাংলাদেশের দ্রুত উন্নতির কথা উল্লে¬খ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২৪ শতাংশ মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করছে। আমাদের সরকার গোটা দেশে আইসিটি সেবা সম্প্রসারিত করেছে। তিনি আরো বলেন, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সুবিধার্থে আমরা আমাদের বিদ্যুত্ উত্পাদন ক্ষমতাও বৃদ্ধি করেছি। বর্তমানে আমাদের বিদ্যুতের চাহিদা ৭ হাজার মেগাওয়াট। কিন্তু আমাদের উত্পাদন ক্ষমতা ১১ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে গেছে। প্রধানমন্ত্রী চীনা উদ্যোক্তাদের গত ৫ বছরে বাংলাদেশের সাফল্যের কিছু সূচক সম্পর্কে অবহিত করেন। তিনি বলেন, ২০০৯ থেকে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ ৬ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি বজায় রেখেছে। ৫ কোটি মানুষ নিম্নআয় থেকে মধ্যআয়ে উঠে এসেছে। একই সময় আমাদের রফতানি আয় ১০৭ শতাংশ, রেমিটেন্স ৬২ শতাংশ, বৈদেশিক মুদ্রার মজুত ২১৭ শতাংশ এবং বিদ্যুত্ উত্পাদন ১০৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে বাংলাদেশ এখন অর্থনৈতিক উন্নয়নের মডেল হিসেবে খ্যাতি পেয়েছে।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সিসিপিআইটি’র চেয়ারম্যান জিয়াং জেংউই। চীনের ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ এবং কর্পোরেট বডি, ম্যানুফ্যাকচারিং ও বাণিজ্যিক কোম্পানি, বিনিয়োগ গ্রুপ, নির্মাণ, বিদ্যুত্ উত্পাদন ও প্রকৌশল কোম্পানিগুলোর প্রধানরা এতে উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে বাংলাদেশের ইআরডি সচিব মোহাম্মদ মেজবাহউদ্দিন, বেইজিংয়ে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মুহাম্মদ আজিজুল হক, এফবিসিসিআই সভাপতি কাজী আকরাম উদ্দিন আহমেদ, বিজিএমইএ সভাপতি আতিকুল ইসলাম, চীনের সেনি হেভি ইন্ডাস্ট্রি কোম্পানি লিমিটেডের জেনারেল ম্যানেজার চুই ইয়ংগিয়ান এবং নিংবো ফোর সিজন ইমপোর্ট অ্যান্ড এক্সপোর্ট কোম্পানি লিমিটেডের জেনারেল ম্যানেজার বাও বুইবং বক্তৃতা করেন।
