আপাতত সরকার বিরোধী আন্দোলনের চিন্তা-ভাবনা নেই বিএনপির। আন্দোলনের চেয়ে দলটি এখন বেশি জোর দিচ্ছে সরকারের সঙ্গে সংলাপের ওপর। সংলাপ আয়োজনে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে নতুন করে কূটনৈতিক তত্পরতা শুরু করেছেন দলের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা। বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও জাতিসংঘের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন তারা। নরেন্দ মোদীর নেতৃত্বাধীন ভারতের নতুন সরকারের আনুকূল্য পাওয়ারও চেষ্টা করা হচ্ছে। একইসঙ্গে স্থানীয় বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা ও সুশীল বা নাগরিক সমাজের একাংশের সঙ্গে নৈকট্য স্থাপনের প্রক্রিয়া শুরু করেছে বিএনপি।
বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার পক্ষে কূটনৈতিক বিষয় দেখাশোনা করেন দলের এমন দুই নেতার সঙ্গে গতকাল পৃথক আলাপ করে এসব তথ্য জানা গেছে। সূত্রমতে, একটি নির্দলীয় সরকারের অধীনে সরকার যেন মধ্যবর্তী সময়ে একাদশ সংসদ নির্বাচন দিতে রাজি হয়, এখন সেটিকেই লক্ষ্য নিধারণ করে কাজ শুরু করা হয়েছে। তবে এজন্য রাজপথে বড় ধরনের আন্দোলন গড়ে তোলার আগে স্থানীয়ভাবে জনমত সৃষ্টি ও আন্তর্জাতিক ক্ষমতার কেন্দ গুলোর সমর্থন আদায়কে অধিক গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। বাংলাদেশে সব দলের অংশগ্রহণে একটি মধ্যবর্তী নির্বাচনের বিষয়ে জাতিসংঘকে পুনরায় সক্রিয় করার লক্ষ্য নিয়ে যোগাযোগ করছেন দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা। বিশেষ করে জাতিসংঘের মহাসচিব ও একজন সহকারী মহাসচিবের সঙ্গে এরই মধ্যে প্রাথমিক যোগাযোগ করা হয়েছে।
জাতিসংঘের সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির ভাইস-চেয়ারম্যান শমসের মবিন চৌধুরী গতকাল ইত্তেফাককে বলেন ‘এ বিষয়ে যখন জানানোর মতো কিছু হবে তখন আপনাদের (সাংবাদিকদের) জানানো হবে। এই মুহূর্তে এ বিষয়ে আমি কিছু বলতে পারছি না।’ ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে জাতিসংঘের সহকারী মহাসচিব অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকোর উপস্থিতিতে সরকারের সঙ্গে বিএনপির কয়েক দফা যে সংলাপ হয়েছিল, সেটির ফলোআপ কিছু ঘটলে তাও জানানো হবে।’
জানা গেছে, সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টির জন্য ইইউকেও নতুন করে সক্রিয় করতে চায় বিএনপি। এজন্য বিএনপির পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হয় ইইউ’র সঙ্গে। এর প্রেক্ষিতে গত রবিবার রাতে ইইউ’র প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠক করেন খালেদা জিয়া।
ঐ বৈঠকে ইইউ’র পক্ষ থেকে জানতে চাওয়া হয়, বিএনপি সংলাপে বসতে রাজি কিনা। জবাবে খালেদা জিয়া বলেছেন, তার দল সংলাপে রাজি। ঐ বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, সরকার যেন সংলাপের উদ্যোগ নেয়, সেজন্য সরকারকে অনুরোধ করার জন্য ইইউ-কে অনুরোধ জানান খালেদা জিয়া। ইইউ খালেদা জিয়াকে জানিয়েছে, তারা সরকারের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলবেন। জাতিসংঘের সঙ্গে যোগাযোগ ও ইইউ’কে খালেদা জিয়ার অনুরোধের বিষয়ে জানতে চাইলে সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা রিয়াজ রহমান গতকাল ইত্তেফাককে বলেন ‘এসব বিষয়ে আমার কিছু বলা ঠিক হবে না।’
বিএনপি সূত্র জানায়, ভারতের নতুন পররাষ্ট্র মন্ত্রী সুষমা স্বরাজের আসন্ন ঢাকা সফরের দিকেও চোখ রেখেছে বিএনপি। ঢাকা সফরকালে বিএনপি চেয়ারপারসনের সঙ্গে তার বৈঠকের বিষয়টি নিশ্চিত করতে বিভিন্ন মাধ্যমে তত্পরতা চালানো হচ্ছে। সফরকালে ভারতের বিদেশ মন্ত্রী যেন বাংলাদেশের সরকারকে মধ্যবর্তী নির্বাচনের তাগিদ দিয়ে সংলাপের উদ্যোগ নিতে আহ্বান জানান সে বিষয়েও প্রচেষ্টা চালাচ্ছে বিএনপি। একইসঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ মোদী ও নতুন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার সঙ্গে সাক্ষাতের লক্ষ্যে ভারত সফরের চেষ্টাও করছে দলটির একটি প্রতিনিধি দল। ভারত সরকারের কাছ থেকে সাড়া পাওয়া গেলে সুষমা স্বরাজের ঢাকা সফরের আগে-পরেই দিল্লি সফর করতে চায় প্রতিনিধি দলটি।
এদিকে, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ইত্তেফাককে জানিয়েছেন, ৫ জানুয়ারির সংসদ নির্বাচনের আগে ঢাকা সফরকারী জাতিসংঘের রাজনীতি বিষয়ক সহকারী মহাসচিব অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকোর উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগ ও বিএনপির দুই দফা সংলাপের সময় দ্রুত আবার নির্বাচন দেয়া হবে বলে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল। বিএনপি এখন সরকারের সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন দেখতে চায়। প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে দ্রুত একাদশ নির্বাচন দেয়ার লক্ষ্যে সরকারের সংলাপের উদ্যোগ নেয়া উচিত বলে মন্তব্য করেন তিনি। অবশ্য আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে ঐ ধরনের কোনো প্রতিশ্রুতি দেয়ার কথা অস্বীকার করা হয়েছে।
বিএনপির সংলাপ চাওয়ার বিষয়ে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ও প্রেসিডিয়াম সদস্য ওবায়দুল কাদের এরই মধ্যে বলেছেন, সংলাপ তো হতে পারে। কিন্তু বিএনপি যে সরকারকে বারবার ‘অবৈধ’ বলছে, তাহলে সেই ‘অবৈধ’ সরকারের সঙ্গে ‘বৈধ’ সংলাপ কিভাবে হবে! সেজন্য বিএনপির উচিত আগে বিষয়টি খোলাসা করা। এছাড়া কি কি বিষয়ে আলোচনা করতে চায়, সেটিও বিএনপির স্পষ্ট করা উচিত।
