মিনিকেট চালের নামে প্রতারণা

আপডেট : ১২ জুন ২০১৪, ২১:৩১
দক্ষিণ-পশ্চিম ও উত্তরাঞ্চলে মিনিকেট চালের নামে প্রতারণা চলছে। এক শ্রেণীর চাল কল মালিক বি আর-২৯, বি আর-২৮ বা অন্য কোন ধানের চাল অটো রাইস মিলে ছাঁটাই করে সরু বানিয়ে মিনিকেট নামে বাজারে ছাড়ছে। আর ভোক্তাদের পকেট থেকে কোটি কোটি টাকা লুটে নিচ্ছে। বেশ কয়েক বছর ধরে তারা এ অনৈতিক ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশে মিনিকেট নামে কোন ধান নেই। ভারতেও এ নামে কোন ধান নেই। গত শতকের ৮০র দশকের শেষ দিকে ভারতের ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট বোরো মৌসুমে চাষের জন্য সরু জাতের একটি ধানের জাত উদ্ভাবন করে। নাম দেয়া হয় শতাব্দী। এ ধান চাষি পর্যায়ে চাষের জন্য বীজ, সার ও প্রয়োজনীয় কীটনাশক একটি মিনি কিট বক্সে ভরে কৃষকদের সরবরাহ করা হয়। সেই থেকে ভারতে এ ধানের নাম হয় মিনিকেট। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সীমান্তবর্তী যশোরের শার্শা, ঝিকরগাছা ও চৌগাছা, সাতক্ষীরার কলারোয়া, ঝিনাইদহের মহেশপুর, চুয়াডাঙ্গার জীবননগর ও দামুরহুদা উপজেলার চাষিরা সীমান্তের ওপারের চাষিদের কাছ থেকে এ ধানের বীজ সংগ্রহ করে এপারে চাষ শুরু করে। বোরো মৌসুমে আমাদের দেশে তখন কোন সরু ধানের জাত না থাকায় ব্যাপক পরিচিতি পায় কথিত মিনিকেট। ১৯৯১ সালে প্রথম চাষ শুরু হয়। সরু চালের কারণে নিম্ন ও উচ্চ মধ্যবিত্ত ভোক্তাদের নিকট এ চালের ব্যাপক চাহিদা হয়। আস্তে আস্তে এ ধান চাষ দ্রুত প্রসার ঘটতে থাকে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের যশোর আঞ্চলিক অফিস সূত্রে জানা যায়, এ বছর সাতক্ষীরা, যশোর, ঝিনাইদহ, মাগুরা, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর ও কুষ্টিয়া জেলায় ৪৯ হাজার ৪শ ৫৭ হেক্টরে কথিত মিনিকেট ধানের চাষ হয়েছে। রাজশাহী জোনের পাবনা, সিরাজগঞ্জ, নাটোর, বগুড়া, জয়পুরহাট, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও রাজশাহী জেলায় ৭৮ হাজার ৮শ ৪৮ হেক্টরে চাষ হয়েছে। এছাড়াও রংপুর জোনেও কথিত মিনিকেট ধানের চাষ হয়েছে। হেক্টর প্রতি গড়ে ৪ টন ফলন হয় (চালে)। তাতে দেখা যায়, সারাদেশে এ বছরে ৬-৭ লাখ টন কথিত মিনিকেট চাল উত্পাদন হওয়ার কথা; কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে সারা বছর ধরে লাখ লাখ টন মিনিকেট চাল আসে কোন উত্স থেকে। গ্রামের বাজার থেকে শুরু করে উপজেলা, জেলা এমনকি রাজধানীর চালের আড়ত মিনিকেট চালে সয়লাব। দেশের প্রধান মিনিকেট চালের মোকাম হচ্ছে কুষ্টিয়ার খাজানগর। এখানে শুধু মিনিকেট চাল উত্পাদন হয়। এছাড়া ঝিনাইদহের ডাকবাংলা, হাট গোপালপুর, ভাটই, কালীগঞ্জ, কোটচাঁদপুর, যশোরের নওয়াপাড়া, ঝিকরগাছা, চৌগাছা, কুষ্টিয়ার আল্লার দরগা, পাবনার ঈশ্বরদী, নাটোর, নওগাঁ, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ, জয়পুরহাটসহ বিভিন্ন স্থানে কথিত মিনিকেট চাল তৈরি করে বাজারজাত করা হচ্ছে। আবার কোন কোন মিল মালিক সুপার মিনিকেট বলে বাজারে ছাড়ছে। এ ব্যাপারে অনুসন্ধান করে জানা যায়, এক শ্রেণীর মিল মালিক বি আর-২৮, বি-২৯, বিআর-২৩, বি আর-২৪, বি আর-৩০, বি আর-৫০ সহ বিভিন্ন জাতের ধানের চাল মেশিনে পালিশ করে সরু করে। তারপর বস্তায় ভরে মিনিকেটের সিল দিয়ে বাজারে ছাড়ছে। এমনকি হাইব্রিড ধানের চাল সরু করে মিনিকেট বলে বাজারে ছাড়া হচ্ছে। কোনটি আসল আর কোনটি নকল মিনিকেট তা ধরার ক্ষমতা ভোক্তার নেই। মিনিকেট ব্র্যান্ড হলেই হলো। খাজানগর মিল মালিক সমিতির সভাপতি আব্দুল মজিদ বাবলু মিনিকেট চাল ব্যাপক নকল হচ্ছে এ অভিযোগ স্বীকার করে প্রশ্ন রাখেন, এটা ধরবে কে? এখন চাল হলেই মিনিকেট বলে বাজারে ছাড়া হচ্ছে। ক্রেতাও মিনিকেট বলে কিনে ঠকছে। ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ড. জীবন কৃষ্ণ বিশ্বাস জানান, মিনিকেট নামে কোন ধান বাংলাদেশে নেই। এ নামে কোন ধান ভারতেও নেই। ভারতের ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট উদ্ভাবিত বোরো মৌসুমে চাষ যোগ্য একটি জাত মিনিকেট হিসাবে পরিচিতি পায়। চিকন চাল হওয়ায় আমাদের দেশে ভাল মার্কেট পায়। এ সুযোগ নিয়ে এক শ্রেণীর চাল কল মালিক ও ব্যবসায়ী এ অনৈতিক কাজ করছেন।