সোমালিয়ায় জলদস্যুদের কবলে সাড়ে ৩ বছর জিম্মিদশা কাটিয়ে অবশেষে পরিবারের সদস্যদের কাছে ফিরলেন চট্টগ্রামের দুই ও সাতক্ষীরার চার নাবিক।
শামীম হামিদ, চট্টগ্রাম অফিস থেকে জানান,
চট্টগ্রামের মেরিন একাডেমির দুটি পরিবারে গত সাড়ে তিন বছর ধরে আনন্দ ছিল না। সোমালিয়ার জলদস্যুরা এ দুটি পরিবারের সব সুখ কেড়ে নিয়েছিল। মুক্তিপণের জন্য জিম্মি করে রেখেছিল দুই বাড়ির দুই ছেলেকে। তাদের নাম আমিনুল ও জাকির। অবশেষে মুক্তিপণ ছাড়াই তাদের ছেড়ে দেয়া হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার দেশে ফিরেছেন সাত নাবিক। এদের মধ্যে আমিনুল ও জাকিরের বাসা চট্টগ্রামের মেরিন একাডেমিতে। গতকাল শনিবার বেলা ১১টায় ইউনাইটেড এয়ারওয়েজের একটি ফ্লাইটে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে আসেন আমিনুল ও জাকির। এসময় শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অভূতপূর্ব দৃশ্যের অবতারণা হয়। দীর্ঘদিন পর হারিয়ে যাওয়া দুই সদস্যকে ফিরে পেয়ে আবেগে আপ্লুত হয়ে ওঠে দু’টি পরিবার। চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ে আনন্দ অশ্রু।
আমিনুলের বাবা নুরুল ইসলাম মেরিন একাডেমির সুইমিংপুল অ্যাটেনডেন্ট পদে কর্মরত রয়েছেন। তিনি জানালেন, ছেলের জন্য অপেক্ষার প্রহর গুনতে গুনতে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন তিনি। তার বয়স মাত্র ৫২। কিন্তু এই বয়সেই ছেলের চিন্তায় তিনি নানা ধরনের রোগ-ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়েছেন। কোমর সোজা করে দাঁড়াতে কষ্ট হয়। স্বাভাবিকভাবে হাঁটাচলা করতে পারেন না। তবে দীর্ঘদিন পরে হলেও ছেলেকে ফিরে পেয়ে মহান আল্লাহর কাছে শোকর করেন তিনি। কৃতজ্ঞতা জানান সরকারকেও। জানালেন, তার একমাত্র ছেলে আমিনুল ২০১০ সালে মালয়েশিয়ার পতাকাবাহী জাহাজ এমভি আলবেডোতে চাকরি নিয়ে বিদেশে যায়। সে বছর নভেম্বর মাসে আমিরাত থেকে কেনিয়া যাওয়ার পথে ভারত মহাসাগরে সোমালি জলদস্যুদের কবলে পড়ে তাদের জাহাজ।
নুরুল ইসলামের বাড়ি কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলায় হলেও চাকরিসূত্রে তিনি চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলায় মেরিন একাডেমি এলাকাতে বসবাস করেন। একই এলাকায় বসবাস করে জিম্মিদশা থেকে মুক্ত জাকিরের পরিবারও। জাকিরের পিতা গণপূর্ত বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। তবে তার পোস্টিং ছিল মেরিন একাডেমিতে। অবসর গ্রহণের পর তিনি পরিবার নিয়ে এখানেই রয়েছেন। জাকিররা ছয় ভাই। কোনো বোন নেই।
সাতক্ষীরার চার নাবিক বাড়ি ফেরায় আনন্দের জোয়ার
সাতক্ষীরা প্রতিনিধি জানান, সোমালিয়ার জলদস্যুদের কাছ থেকে ছাড়া পাওয়া সাতক্ষীরার চার নাবিক গতকাল শনিবার নিজ নিজ বাড়িতে ফিরেছেন। প্রিয় মানুষটিকে সাড়ে তিন বছর পর কাছে পেয়ে জড়িয়ে ধরেন স্বজনেরা। তাদের মধ্যে একই সঙ্গে দেখা গেছে আনন্দ আর কষ্টের কান্না।
২০১০ সালের ২৬ ডিসেম্বর মালয়েশিয়ার পতাকাবাহী জাহাজ এমভি আলবেডো থেকে এই সাত বাংলাদেশি নাবিককে অপহরণ করা হয়। গতকাল বাড়ি ফিরেছেন সদর উপজেলার ভালুকা চাঁদপুর গ্রামের মৃত শেখ মৌ হোসেনের ছেলে গোলাম মোস্তফা, ঈমান আলী সরদারের ছেলে হাবিবুর রহমান, মৃত সোবহান সরদারের ছেলে নুরুল হক ও আশাশুনির আব্দুর রউফের ছেলে আবুল কাসেম।
গোলাম মোস্তফা বাড়ি ফিরে বলেন, কল্পনা করিনি আবার বাড়িতে ফিরতে পারবো। স্ত্রী-সন্তানদের মুখ দেখতে পাবো।
নাবিক হাবিবুর রহমানের বৃদ্ধ পিতা ঈমান আলী জানান, ছেলের শোকে কিছুদিন আগে তার স্ত্রী মারা গেছেন। ছেলে তার মায়ের মুখখানিও দেখতে পায়নি। হাবিবুর রহমান তার বাবাকে জড়িয়ে ধরে কান্নাকাটি করছেন ও তার মায়ের কবরের কাছে গিয়ে বার বার মূর্ছা যাচ্ছেন। কাঁদতে কাঁদতে বলেন, মা তুমি দেখো তোমার সন্তান সুস্থ শরীরে বাড়ি ফিরে এসেছে।
অপরদিকে, আবুল কাসেমের পিতা আব্দুর রউফ আবেগ আপ্লুত কণ্ঠে বলেন, আল্লাহ তার সন্তানকে তার কাছে ফিরিয়ে দিয়েছেন এর থেকে বেশি কিছু চাওয়ার নেই তাদের। টাকা-পয়সার কোনো দরকার নেই সুস্থ শরীরে ছেলে ফিরে এসেছে এটাই বড় কথা। সরকারকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানান তিনি।
