দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলে কৃষকদের মাঝে আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি এবং জ্ঞান সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক ও সরকারের অর্থায়নে ‘বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলে ক্ষুদ্র চাষীদের জন্য কৃষি সহায়ক প্রকল্প’-এর অধীনে উদ্যোগটি বাস্তবায়িত হচ্ছে। প্রকল্পের অধীনে কৃষকদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষতার উন্নয়নের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। বাংলাদেশে এ ধরনের উদ্যোগ এ প্রথম। এ পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে সরকারের দেয়া সুবিধা সরাসরি চাষীরা গ্রহণ করতে পারবে।
উপজেলা পর্যায়ে দলভিত্তিক বা পৃথক চাষী দল গঠনের মাধ্যমে ৫ বছর সময়সীমার মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। গোপালগঞ্জ, মাদারীপুর, বরিশাল, পটুয়াখালী, ঝালকাঠী, বরগুনা, ভোলা, পিরোজপুর ও বাগেরহাট- এ নয় জেলার ৫৮টি উপজেলায় চাষী দল গঠনের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে সরকার।
গত বছরের ৩০ জুলাই একনেকে প্রকল্পটি অনুমোদিত হয়। চাষী দল গঠনের মূল উদ্দেশ্য হল দলভুক্ত চাষীদের সক্রিয় অংশগ্রহণে প্রকল্প এলাকায় ধান বা দানা জাতীয় ফসল, সবজি ও ফল উত্পাদনের সমস্যা চিহ্নিত করে উত্পাদন বৃদ্ধির সম্ভাবনা যাচাই এবং সেই আলোকে দলভুক্ত চাষীদের মাধ্যমে উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা। এর ফলে চাষীরা চাহিদাভিত্তিক সম্প্রসারণ সেবা গ্রহণ করে এলাকাভিত্তিক কৃষি উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে।
প্রকল্পের খসড়া অনুযায়ী, কৃষি মন্ত্রণালয় অনুমোদিত চাষী দল গঠনের নির্দেশিকার আলোকে প্রকল্প ব্যবস্থাপনা ইউনিট এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের জেলা অফিসের তত্ত্বাবধানে ৫ হাজার চাষী দল গঠন করতে হবে। গ্রামীণ চাষীদের সাথে সভা বা আলোচনা করেই মূলত দল গঠন করা হবে। সব মিলিয়ে তিন ধরনের দল গঠন করা হবে। এগুলো হলো- ধান বা দানা ফসল চাষী দল, সবজি চাষী দল ও ফল চাষী দল। প্রতিটি চাষী দলের মোট সদস্য সংখ্যা হবে ৩০ জন। দলভুক্ত চাষীকে অবশ্যই নির্দিষ্ট গ্রামে বসবাসকারী ও স্থায়ী বাসিন্দা এবং ১৮ থেকে ৬০ বছর বয়সী হতে হবে। ভূমিহীন, প্রান্তিক এবং ক্ষুদ্র চাষীদের নিয়ে দল গঠন করা হবে। প্রতি দলে ৩০ শতাংশ মহিলা সদস্য থাকবে। একটি গ্রামে একই ধরনের একটির বেশি দল গঠন করা যাবে না। প্রতিটি কৃষক পরিবার থেকে শুধু একজন পুরুষ বা নারী দলভুক্ত হতে পারবে।
প্রকল্পভুক্ত ৫৮টি উপজেলায় মোট ৫ হাজারটি চাষী দলের মধ্যে ধান বা দানা ফসল চাষী দল ৩ হাজারটি, সবজি চাষীদল এক হাজার ৫০০টি এবং ফল চাষী দল ৫০০টি গঠন করতে হবে। সমমনা ও একই ধরনের ফসল চাষ করে এমন আগ্রহী সমজাতীয় কৃষক ও কৃষানীদের নিয়ে এ দল গঠন করা হবে। দলগুলো এমনভাবে নির্বাচন করতে হবে যেন তা সংশ্লিষ্ট গ্রাম বা এলাকার প্রতিনিধিত্ব করে। উপজেলাগুলোতে বিভিন্ন ধরনের চাষী দলের সংখ্যা নির্ধারণ করবেন সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক ও সংশ্লিষ্ট জেলার উপ-পরিচালকরা।
পাঁচ ধাপে চাষীদল
পাঁচ ধাপ অনুসরণ করে চাষী দল গঠন করা হবে। প্রথম ধাপে দল গঠনের জন্য সংশ্লিষ্ট উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা সংশ্লিষ্ট গ্রামের কৃষি বিষয়ক তথ্য, ইউনিয়ন পরিষদে সংরক্ষিত কোন নির্দিষ্ট গ্রামের কৃষক ও কৃষি বিষয়ক তথ্যাবলী, সংশ্লিষ্ট সরকারি-বেসরকারি অফিস থেকে প্রাপ্ত তথ্য, গ্রামের চাষীদের সাথে সম্পর্ক স্থাপন, গ্রাম পরিভ্রমণ এবং অভিজ্ঞ চাষীদের সাথে আলোচনা করে গ্রামের কৃষি বিষয়ক তথ্য সংগ্রহ করবেন। ঐ কর্মকর্তাকে সংশ্লিষ্ট গ্রামের প্রধান ফসল ও শস্য বিন্যাস, কৃষি পরিবারের সংখ্যা, গ্রামের সেচ ব্যবস্থা ও সেচ নালার প্রয়োজনীয়তা, ফসল উত্পাদনের সমস্যাগুলো চিহ্নিত এবং ভূমিহীন, প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র শ্রেণীর চাষীদের চিহ্নিত করে তালিকা ও প্রতিবেদন তৈরি করতে হবে।
দ্বিতীয় ধাপে নির্বাচিত গ্রাম বা পাড়ায় কৃষক সভার আয়োজন করে কৃষি কর্মকর্তা, গ্রামের গণ্যমান্য প্রতিনিধি এবং জনপ্রতিনিধি উপস্থিত থাকবেন। চাষীদলের নির্বাচিত সদস্যদের নাম স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি বা জনপ্রতিনিধির মাধ্যমে ঘোষণা দিতে হবে।
তৃতীয় ধাপে নবগঠিত চাষী দলের কৃষক-কৃষানীদের চাষী দলে অন্তর্ভুক্তি থাকার বিষয়টি সুনির্দিষ্ট করার লক্ষ্যে ৩০ জন কৃষক-কৃষানীর প্রত্যেককেই উপজেলা হতে দল গঠন ও সদস্য ভর্তি ফরম বাধ্যতামূলকভাবে পূরণ করতে হবে। চাষী দল গঠন ও সদস্য ভর্তি ফরমসমূহ সংশ্লিষ্ট উপজেলা কৃষি অফিসে সংরক্ষণ করতে হবে।
চতুর্থ ধাপে নবগঠিত চাষীদলের কর্মকাণ্ড সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য সাত সদস্যের ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠন করা হবে। এ কমিটির মেয়াদ হবে দুই বছর এবং মাসে কমপক্ষে একবার সভায় বসবে।
পঞ্চম ধাপে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাদের সুপারিশের ভিত্তিতে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট উপ-পরিচালক দল গঠনের চূড়ান্ত অনুমোদন করবেন।
যে উদ্দেশ্য বাস্তবায়িত হবে
চাষীদল গঠনে কৃষি ব্যবস্থায় ইতিবাচক পরিবর্তনের আশা করছেন কৃষি কর্মকর্তারা। এরমধ্যে রয়েছে-এলাকাভিত্তিক আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি ব্যবহার, শস্য নিবিড়তা ও শস্য বহুমুখীকরণের মাধ্যমে কৃষি উত্পাদন ও উত্পাদনশীলতা বাড়বে। বসতবাড়ির আশপাশের পতিত জমিতে ফল ও সবজি বাগান স্থাপনের মাধ্যমে ক্ষুদ্র চাষী পরিবারের আয় বৃদ্ধি পাবে। অপুষ্টি দূর হবে। পরিবেশ বান্ধব কৃষি প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে এবং জৈব ও অজৈব সারের সমন্বিত ব্যবহারের মাধ্যমে মাটির উর্বরতা শক্তি বৃদ্ধি পাবে। ফসল উত্পাদনে উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার, ফসল প্রক্রিয়াকরণ ও বাজারজাত করণে দরিদ্র কৃষকদের সক্ষমতা বাড়বে।
