দালালরা ধরাছোঁয়ার বাইরে মানবপাচার থামছে না

আপডেট : ১৬ জুন ২০১৪, ২২:১৪
কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফ উপকূলীয় সাগরপথ দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আদম পাচার কাজে জড়িত রয়েছে রোহিঙ্গাসহ ৭ শতাধিক স্থানীয় ও বহিরাগত দালাল। আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক দলের কতিপয় নেতাকর্মীর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগিতায় প্রতিদিন সাগরপথে মালয়েশিয়ার উদ্দেশে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যাত্রা করছে অসংখ্য লোকজন। পথিমধ্যে অহরহ যাত্রী নিখোঁজ, কারাবন্দি বা দালাল কর্তৃক জিম্মি অবস্থায় শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়ে মানবেতর দিন যাপন করলেও শুধুমাত্র দালালদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেয়ার কারণে মানব পাচার থামছে না বলে মনে করছেন সচেতন মহল। ফলে গ্রামে গ্রামে স্বজনহারা ভুক্তভোগী পরিবার গুলোর আহাজারিতে আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠছে। জানা গেছে, দালাল চক্র দেশের বিভিন্ন এলাকার সহজ সরল লোকজনদের মালয়েশিয়ায় নিয়ে যাওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে উখিয়া উপকূলে জড়ো করে জনপ্রতি ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা আদায় করে রাতের আঁধারে গভীর সাগরে অপেক্ষমাণ ট্রলারে তুলে দেয়। আইন প্রয়োগকারী সংস্থা অভিযানের নামে আইওয়াশ হিসাবে মাঝে-মধ্যে কিছু কিছু মালয়েশিয়াগামীকে আটক করলেও রহস্যজনক কারণে মূল হোতারা থেকে যায় ধরা ছোঁয়ার বাইরে। এছাড়া পুলিশের হাতে আটক হওয়া মালয়েশিয়াগামী যাত্রীদের বিরুদ্ধে মামলা না করে তাদের আত্মীয়-স্বজনদের নিকট মোটা অংকের বিনিময়ে ছেড়ে দেয়ায় এবং চিহ্নিত দালালদের বিরুদ্ধে মামলা না করায় সাগরপথে মানব পাচার অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে। সম্প্রতি এনজিও সংস্থা ইফসা কর্তৃক আয়োজিত রাজাপালং ইউনিয়ন পরিষদ মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত মানব পাচার প্রতিরোধ শীর্ষক এক সেমিনারে বক্তারা বলেছেন, গত তিন বছরে সাগরপথে প্রায় ১০ হাজার লোক দালালের মাধ্যমে মালয়েশিয়ায় পাচার হয়েছে। এ মধ্যে আড়াই শতাধিক লোকের হদিস এখনো পর্যন্ত তাদের স্বজনেরা পায়নি। বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতি ও ইফসার যৌথ উদ্যোগে আন্দামানসহ বিভিন্ন কারাগার থেকে অর্ধশতাধিক আটক মালয়েশিয়াগামী যাত্রীকে ফেরত এনে তাদের পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। কক্সবাজারস্থ ইফসার কর্মকর্তা ফরিদ আলম বলেন, ওই সময় বিভিন্ন আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ৮৬৪ জন যাত্রীকে উদ্ধার করেছে। সেমিনারে রাজাপালং ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর কবির চৌধুরী অভিযোগ করেন, উখিয়া-টেকনাফ উপকূল জুড়ে সাত শতাধিক সদস্য দালাল চক্রের ধরা ছোঁয়ার বাইরে রয়েছে। উপকূলের মনখালী, ছোয়াংখালী, ছেপটখালী ও ইনানী ঘুরে স্থানীয় লোকজনদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, একজন লোককে ট্রলারে তুলে দেয়ার বিনিময়ে দালাল পাচ্ছে নগদ ২০ হাজার টাকা। এ টাকার লোভে দালাল চক্র হন্য হয়ে দাপটের সাথে উপকূলীয় এলাকায় চষে বেড়িয়ে অচেনা-অজানা লোকদের অপহরণ পূর্বক ট্রলারে তুলে দিচ্ছে। এ ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে উপকূলীয় ইউনিয়ন জালিয়াপালং এর সাবেক চেয়ারম্যান ছৈয়দ আলম চৌধুরী জানান, দালালদের কারণে অচেনা লোকজন উপকূলে আসা-যাওয়া করতে পারছে না। এমনকি দালাল চক্র ট্রলারে তুলে দেওয়ার জন্য পর্যটকদের পর্যন্ত হয়রানি করার অভিযোগ রয়েছে। আন্দামান কারাগার থেকে ফিরে আসা ছোয়াংখালী গ্রামের আলতাজ মিয়ার ছেলে নুর মোহাম্মদ জানান, কূল থেকে পানিতে নৌকা ঠেলে দেয়ার কথা বলে এক দালাল গভীর রাতে তাকে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে জোর করে ট্রলারে তুলে দেয়। পথিমধ্যে টাকা দাবি করলে সে অপারগতা প্রকাশ করে। পরে দালাল চক্র তাকেসহ চারজন যাত্রীকে আন্দামান এলাকায় সাগরে ফেলে দেয়। সেখানকার পুলিশ তাদেরকে উদ্ধার করে কারাগারে রেখে দেয়। ওই চার যাত্রীকে বাংলাদেশ দূতাবাস পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় দেশে ফেরত আনতে সক্ষম হয়। অভিযোগ উঠেছে, সম্প্রতি বিভিন্ন আইন প্রয়োগকারী সংস্থা দালাল আটক নিয়ে পকেট বাণিজ্যে নেমে পড়েছে। প্রতিরাতে বিভিন্ন এলাকা থেকে দালাল আটক করলেও তাদের নামে কোন মামলা হচ্ছে না। লোক মুখে শোনা যায়, মোটা অংকের টাকা নিয়ে তাদের ছেড়ে দেয়া হয়। এসব কারণে দালালরা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার হাতে ধরা পড়লেও অনায়াসে পার পেয়ে যায়। ফলে তাদের মানব পাচার বাণিজ্য থামছে না। তবে পাচার বাণিজ্যের কথা অস্বীকার করে টেকনাফ থানার অফিসার ইনচার্জ মোক্তার হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, এ পর্যন্ত থানায় প্রায় চার শতাধিক মামলা হয়েছে। গত বুধবার থেকে এ পর্যন্ত নয়জন দালালকে গ্রেফতার করেছে। উখিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ অংসা থোয়াই চাকমা জানান, তিনি উখিয়া থানায় যোগদান করার পর থেকে নয়জন দালালকে গ্রেফতার করে তাদের বিরুদ্ধে মামলা রুজু করেছেন। বাদ-বাকী দালালদেরও গ্রেফতারে পুলিশি অভিযান অব্যাহত রয়েছে।