ফতোয়ার শিকার হয়ে দিনাজপুরের চিরিরবন্দর পল্লীতে এক পরিবার একঘরে রয়েছেন। ৪০ দিন ধরে সমাজচ্যুত পরিবারটি দুর্ভোগ ও কষ্টের মুখে পড়েছে। এমনকি নামাজ পড়তে মসজিদে যাওয়াও বন্ধ করেছে ফতোয়াবাজরা। ২ অবুঝ শিশুকেও অন্য শিশুদের সাথে মিশতে দেয়া হচ্ছে না।
দিনাজপুরের চিরিরবন্দর উপজেলার আব্দুলপুর ইউনিয়নের আন্ধারমুহা গ্রামের পীরপাড়ায় নিষিদ্ধ ঘোষিত ফতোয়ার শিকার হয়েছে পরিবারের ৪ জন। এরা হচ্ছেন শফিকুল ইসলাম (৩৫) ও তার স্ত্রী মোসলেমা বেগম (২৭), আন্ধারমুহা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৪র্থ শ্রেণীর ছাত্র মিতাহুল ইসলাম ও ২য় শ্রেণীর ছাত্রী শরিফা আক্তার। ব্যভিচার, অনৈতিক ও অসামাজিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগের ভিত্তিতে সমাজপতিরা ফতোয়া জারি করেন। ফতোয়ার কারণে ৪০ দিন ধরে পরিবারটি গ্রামে একঘরে হয়ে কষ্ট ও দুর্ভোগে দিনাতিপাত করছে। এক কথায় সমাজচ্যুত করে ৪ জনকে গৃহবন্দি করে রাখা হয়েছে।
গতকাল বুধবার সরেজমিনে এলাকায় গিয়ে জানা যায়, দীর্ঘদিন যাবত শফিকুল ইসলাম বগুড়ায় কাজ করতে যান। গত ৪ মে রবিবার শফিকুল ইসলামের স্ত্রী মোসলেমা তার স্বামীর বন্ধু ঘুঘুরাতলী এলাকার মোজাম্মেলের দোকানে স্বামীর খোঁজখবর নিতে গেলে পার্শ্ববর্তী দোকানের মালিক আব্দুল মজিদ তাদেরকে একটি রুমে তালাবদ্ধ করে রাখেন। পরে মজিদ সবাইকে বলেন এই দুইজন ঘরের ভেতরে অনৈতিক কাজ করছিল এবং তিনি এই কার্যকলাপের ভিডিও করে রেখেছেন। পরে সেখান থেকে তাদেরকে ছেড়ে দেয়া হয়। পরের শুক্রবার জুমার নামাজের পরে পীরপাড়া গ্রামের মসজিদে উক্ত ঘটনার বিচারের জন্য শালিস-বৈঠক ডাকা হয়। বৈঠকে মসজিদের সরদার সলিমুল্লাহ আহমেদ, ইমাম এরশাদুল ইসলাম, হাফিজউদ্দিনসহ গ্রামের বিভিন্ন ব্যক্তিরা উপস্থিত হয়ে ওই পরিবারটির বিরুদ্ধে ফতোয়া জারি করেন। অভিযুক্ত পরিবারের অনুপস্থিতিতেই শালিস বৈঠকে বিচার করে একতরফা ফতোয়া ঘোষণা করা হয়। এলাকার লোকজনের সাথে কথা বললে তারা সবাই মোসলেমা বেগমের দোষ ধরলেও ওই ভিডিওটি দেখেননি বলে জানান। শুধুমাত্র আব্দুল মজিদের নিকট ওই ভিডিও আছে বলেই তারা জানেন।
এ বিষয়ে মসজিদের সরদার সলিমুল্লাহ আহমেদ বলেন, ওই নারী অনৈতিক কার্যকলাপের সাথে জড়িত। তাই ইসলামী আইন অনুযায়ী তাদেরকে একঘরে থাকার সাজা দেয়া হয়েছে। তবে তিনি জানান, ওই ভিডিওটি তিনি দেখেননি। এলাকার সবাই বিষয়টি জানে এবং এই অভিযোগের ভিত্তিতেই তাদেরকে ওই সাজা দেয়া হয়েছে।
এ ব্যাপারে ফতোয়ার শিকার মোসলেমা বেগম বলেন, তার বাড়ির পার্শ্ববর্তী হাফিজউদ্দিনের সাথে তাদের জমিজমা নিয়ে বিবাদ রয়েছে। ঋণ নিয়ে বাড়ি করলেও এখন বাড়ির প্রাচীর উঠাতে দিচ্ছে না। আর কিছুদিন ধরেই এ নিয়ে মতপার্থক্য হওয়ায় আমাদেরকে বিপদে ফেলার জন্য এই মিথ্যা কথা রটানো হয়েছে।
এ ব্যাপারে চিরিরবন্দর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মিজানুর রহমান জানান, ব্যভিচার কিংবা অনৈতিক কার্যকলাপের কারণে ফতোয়া দেয়ার কোন আইন নেই। যতক্ষণ পর্যন্ত স্ত্রীর বিরুদ্ধে স্বামী ব্যভিচারের অভিযোগ না দেবেন ততক্ষণ পর্যন্ত আইনী কোন পদক্ষেপ নেয়া যাবে না। তাছাড়া যদি অনৈতিক কার্যক্রমের কেউ ভিডিও করে রাখে তাহলে সে পরিকল্পিতভাবে এই ঘটনা ঘটিয়েছে বলে প্রমাণিত হয়।
