বাংলাদেশের ক্রিকেট যখন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে শিশুমাত্র, সেই সময় এই দেশের নাম ইতিহাসে লিখিয়েছিলেন তিনি। তিনি ইতিহাসের কনিষ্ঠতম অভিষেক সেঞ্চুরিয়ান, তিনি বাংলাদেশের একসময়ের সবচেয়ে বড় টেস্ট ইনিংসের মালিক, তিনি অস্ট্রেলিয়া-দক্ষিণ আফ্রিকা-ভারত বধের নায়ক, তিনি বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে প্রতিভাধর ক্রিকেটারদের একজন। তবে আফসোসের ব্যাপার, সেইসব পরিচয় আজ মিথ্যে হয়ে গেল। এখন ফিক্সিংয়ের দায়ে ৮ বছরের জন্য নিষিদ্ধ একজন ক্রিকেটারের নাম মোহাম্মদ আশরাফুল।
বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগে (বিপিএল) ফিক্সিংয়ের দায়ে বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক মোহাম্মদ আশরাফুলকে ৮ বছরের জন্য সব ধরনের ক্রিকেট থেকে নিষিদ্ধ করেছেন বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) ডিসিপ্লিনারি কমিটির গঠিত বিশেষ ট্রাইব্যুনাল। সেই সঙ্গে দশ লাখ টাকা জরিমানা করেছে ট্রাইব্যুনাল। তবে আশরাফুল এই শাস্তি তাঁকে কার্যত চার বছরে নামিয়ে আনতে পারেন। ট্রাইব্যুনাল বলেছেন, বিসিবি, এসিসি ও আইসিসির দুর্নীতি ও ফিক্সিং বিরোধী শিক্ষা কার্যক্রমে সময় দিলে এবং নৈতিক জীবন যাপন করলে তার শাস্তি পাঁচ বছরে নেমে আসবে। ইতিমধ্যে এক বছর তিনি অতিবাহিত করেছেন। ফলে আশরাফুল চাইলে আর চার বছর পরই ক্রিকেটে ফিরতে পারেন।
ট্রাইব্যুনাল চেয়ারম্যান খাদেমুল ইসলাম চৌধুরী গতকাল শাস্তি ঘোষণার সময় বলেন, ‘ট্রাইব্যুনালের বিচার কাজ আজ (কাল) শেষ হয়েছে। এই ট্রাইব্যুনালে আমরা দশজন বিবাদীর বিচার করেছি। এর আগে ২৬ ফেব্রুয়ারি রায় দিয়ে ছয়জন নির্দোষ আর চারজনকে দোষী সাব্যস্ত করেছি। আশরাফুলের বিরুদ্ধে চারটি অভিযোগ ছিল। চারটিই ম্যাচ পাতানোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। প্রতিটি অভিযোগে আট বছর তাকে খেলাধুলা থেকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আট বছরের মধ্যে পাঁচ বছর ন্যূনতম হবেই। বাকি অংশটুকু বাতিল হতে পারে। তার শর্ত হল, বিসিবি, আইসিসি বা এসিসি আয়োজিত এডুকেশন বা রিহ্যাবিলিটেশন প্রোগ্রামে অংশগ্রহণ করতে হবে। যে দিন থেকে আশরাফুল সাময়িক নিষিদ্ধ ছিলেন, সেদিন থেকেই এই সাজা হিসাব করা হবে। গত বছরের ১৩ মে থেকে তিনি সাময়িক নিষিদ্ধ ছিলেন। দ্বিতীয় অভিযোগে তাকে অতিরিক্ত ১০ লাখ টাকা জরিমানা দিতে হবে বিসিবিকে। চারটি অভিযোগেই দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন তিনি। প্রতিটি শাস্তি একই দিন থেকে কার্যকর হবে। তাই ৮ বছরের বেশি খাটতে হবে না তার।’
আশরাফুল চিটাগং, বরিশাল, খুলনা ও সিলেট রয়্যালসের চারটি ম্যাচের কারণে অভিযুক্ত। ট্রাইব্যুনাল চারটি ম্যাচকে পাতানো বলছে।
ট্রাইব্যুনাল চেয়ারম্যান বলেন,‘শিহাব চৌধুরীরকে ১০ বছরের জন্য নিষিদ্ধ এবং ২০ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। কৌশল লুকোরুয়াচ্চি ১৮ মাস ও লু ভিনসেন্টকে ৩৬ মাসের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে।’ নির্দোষ হওয়া ব্যক্তিরা ক্ষতিপূরণের আবেদন করেছিলেন ট্রাইব্যুনালে। কিন্তু ট্রাইব্যুনাল তা বাতিল করে দিয়েছে। বিসিবির ১০ সদস্যের ডিসিপ্লিনারি কমিটির কাছে আপিল করতে পারবেন সাজা প্রাপ্তরা।
উল্লেখ্য, ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত বিপিএলের দ্বিতীয় আসরে ম্যাচগুলোর দিকে চোখ রাখার জন্য বিসিবি ও আইসিসির মধ্যে এক চুক্তি হয়। আর সেই চুক্তির ফলে আইসিসির দুর্নীতি দমন ও নিরাপত্তা ইউনিট (আকসু) প্রতিটি ম্যাচ তদন্ত করে ঢাকা গ্ল্যাডিয়েটর্সের কমপক্ষে দুটি ম্যাচ সন্দেহজনক বলে রায় দেয়। এরপর অধিকতর তদন্তে চাঞ্চল্যকর ভাবে বাংলাদেশ জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক মোহাম্মদ আশরাফুলসহ কয়েকজন ক্রিকেটারের নাম বেরিয়ে আসে। এরপর দীর্ঘ গুঞ্জনের পর ২০১৩ সালের সেপ্টেম্বরেই আইসিসি ও বিসিবি সংবাদ সম্মেলন করে ৯ জন খেলোয়াড় ও কর্মকর্তা এই কেলেঙ্কারিতে জড়িত বলে জানায়।
এরপর গত ১৪ অক্টোবর সুপ্রিম কোর্টের সাবেক বিচারপতি ও আইন কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুর রশীদকে ডিসিপ্লিনারি কমিটির প্রধান হিসেবে মনোনীত করে বিসিবি। পরে চেয়ারম্যান নিয়োগ দেন কমিটির বাকি ১০ সদস্যকে। এরপর ১০ নভেম্বর ঐ ডিসিপ্লিনারি কমিটি সাবেক বিচারপতি খাদেমুল ইসলাম চৌধুরীকে প্রধান করে ট্রাইব্যুনাল গঠন করে। ট্রাইব্যুনালের বাকি দুই সদস্য হলেন আজমালুল হোসেন কিউসি এবং সাবেক ক্রিকেটার শাকিল কাশেম।
কয়েক দফা শুনানির পর ২৬ ফেব্রুয়ারি প্রাথমিক রায় ঘোষণা করেন ট্রাইব্যুনাল। রায়ে বলা হয়, সেলিম চৌধুরী, জাতীয় দলের সাবেক ক্রিকেটার মোহাম্মদ রফিক, ঢাকা গ্ল্যাডিয়েটর্সের কর্মকর্তা গৌরব রাওয়াত, জাতীয় ক্রিকেটার মোশাররফ রুবেল ও মাহবুবুল আলম রবিন এবং ইংলিশ ক্রিকেটার ড্যারেন স্টিভেন্সের বিপক্ষে কোন অভিযোগ প্রমাণ হয়নি।
