বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত ১৫৪ এমপি বৈধ

আপডেট : ১৯ জুন ২০১৪, ২২:১৩
বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার বিধান অবৈধ নয়। নির্বাচনে কোন প্রার্থী না থাকলে একক প্রার্থীর বিজয়ী ঘোষণা করা সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়। এ কারণেই দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১৫৪ সংসদ সদস্যের (এমপি) বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়া নিয়ে কোন প্রশ্ন তোলার সুযোগ নেই। বিচারপতি মির্জা হোসেইন হায়দার ও বিচারপতি মুহাম্মদ খুরশীদ আলম সরকারের ডিভিশন বেঞ্চ বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত ঘোষণা সংক্রান্ত গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের (আরপিও) ১৯ ধারার বৈধতা প্রশ্নে জারি করা রুল খারিজ করে গতকাল বৃহস্পতিবার সংক্ষিপ্ত এ রায় ঘোষণা করেন। রায় ঘোষণার পর এটর্নি জেনারেল এডভোকেট মাহবুবে আলম বলেন, এ রায়ের মাধ্যমে একটি তর্কিত বিষয়ের সমাধান হয়ে গেলো। এ রায়ের মাধ্যমে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা পরোক্ষভাবে বৈধতা পেলেন। রিটকারীর কৌঁসুলি ব্যারিস্টার হাসান এমএস আজিম বলেন, রায়ের সার্টিফাইড কপি পাওয়ার পর আপিল দায়েরের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। গত ৫ জানুয়ারি দশম সংসদ নির্বাচনে যাচাই-বাছাই ও মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের পর ১৫৪ আসনে একক প্রার্থী থাকায় তাদের বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন। আর আরপিও’র ১৯ ধারায় বলা হয়েছে, মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই এবং মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের পর একক প্রার্থী থাকলে তাঁকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত ঘোষণা করা যায়। এই ১৯ ধারার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে দায়েরকৃত রিটের ওপর হাইকোর্ট রুল জারি করে। এ রুল খারিজ করে দিয়ে গতকাল হাইকোর্ট তার রায়ে বলেছে, যদি কোন আইন সংবিধানের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক হয় কেবল তখনই সুপ্রিম কোর্ট ওই আইন বাতিল ঘোষণা করতে পারে। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের ১৯ ধারা সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়। সেহেতু এই বিধান বৈধ। একইসঙ্গে বর্তমান আইনি কাঠামোতে ১৫৪ সংসদ সদস্যের বৈধতা নিয়েও প্রশ্নের কোন অবকাশ নেই। ‘না’ ভোটের বিধান অন্তর্ভুক্তির প্রশ্নে জারিকৃত রুলও খারিজ করে দিয়ে রায়ে আরো বলা হয়, ভারতীয় সংসদ তাদের নির্বাচনী আইনেই ‘ভোট না দেয়ার’ বিধান রেখেছে। আমাদের সেটা রয়েছে পেনাল কোডে। আইনসভা (সংসদ) চাইলে আমাদেরও সেটা নির্বাচনী আইনে যুক্ত করতে পারে। রায়ে বলা হয়, ‘না’ ভোটের বিধান আমাদের জাতীয় সংসদের সামনে এসেছিলো অধ্যাদেশ আকারে। কিন্তু সংসদ সেই অধ্যাদেশ অনুমোদন না করায় তা আইনে পরিণত হয়নি। যেহেতু সংসদ ‘না’ ভোটের বিষয়টি যুক্ত না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সেহেতু আদালত সংসদকে নির্দেশনা দিতে পারে না। ফলে ‘না’ ভোটের বিষয়টি আইনে অন্তর্ভুক্ত করা হবে কিনা তা সংসদের এখতিয়ার। যদি সংবিধানে ‘না’ ভোট থাকা নিয়ে সুস্পষ্ট কোন বিধান থাকত তাহলে আদালত এ বিষয়ে আইন প্রণয়নের জন্য সংসদকে নির্দেশনা দিতে পারত। যেটি বিচার বিভাগ পৃথকীকরণ সংক্রান্ত মাসদার হোসেন মামলার রায়ে সর্বোচ্চ আদালত দিয়েছে। তাই যেহেতু সংবিধানে এ বিষয়ে কিছু বলা নেই সেহেতু ক্ষমতার পৃথকীকরণের কারণে আদালত সংসদকে এ বিষয়ে কোন নির্দেশ দিতে পারে না। বেঞ্চের জ্যেষ্ঠ বিচারক বিচারপতি মির্জা হোসেইন হায়দার রায় ঘোষণা করেন। রায় ঘোষণাকালে এ মামলার অ্যামিকাসকিউরিদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানায় আদালত। রিট আবেদনকারীর রিট আবেদন দায়েরের যোগ্যতা ছিল বলে আদেশে বলা হয়। আদালত রায়ে বলে, সত্ উদ্দেশ্যেই রিট আবেদন দায়ের করা হয়েছে। রায় ঘোষণার পর সরাসরি আপিল দায়েরের জন্য আদালতের কাছে আবেদন জানান ব্যারিস্টার হাসান এমএস আজিম। আবেদনের বিরোধিতা করেন অতিরিক্ত এটর্নি জেনারেল এডভোকেট মুরাদ রেজা। এ পর্যায়ে আদালত এ আবেদনটি খারিজ করে দেয়। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের ১৯ ধারার বৈধতা চ্যালেঞ্জ এবং এই আদেশে ‘না’ ভোটের বিধান অন্তর্ভুক্তির নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে দুটি রিট আবেদন দায়ের করা হয়। জাতীয় পার্টির (জাপা) ভাইস চেয়ারম্যান আব্দুস সালামের করা রিটের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে গত ১৬ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্ট আরপিও ১৯ ধারা কেন সংবিধানপরিপন্থি ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করে। এছাড়া সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. শাহরিয়ার মজিদ ও রোকনউদ্দিন মো. ফারুকের করা রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আরপিওতে ‘না’ ভোটের বিধান অন্তর্ভুক্তির প্রশ্নে প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনতে সরকারকে কেন নির্দেশ দেয়া হবে না এই মর্মে গত ২৪ নভেম্বর আরেকটি রুল জারি করে আদালত। দুটি রুলের ওপর অ্যামিকাসকিউরি ও উভয় পক্ষের আইনজীবীদের শুনানি গ্রহণ করে আদালত। অ্যামিকাসকিউরিদের মধ্যে সিনিয়র আইনজীবী ড. কামাল হোসেন, ব্যারিস্টার রফিক-উল হক, এডভোকেট মাহমুদুল ইসলাম, ব্যারিস্টার রোকনউদ্দিন মাহমুদ ও ব্যারিস্টার আজমালুল হোসেন কিউসি আদালতে তাদের মত ব্যক্ত করেন। এছাড়া এটর্নি জেনারেল এডভোকেট মাহবুবে আলম ও অতিরিক্ত এটর্নি জেনারেল এডভোকেট মুরাদ রেজা, সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার, রিটকারীর কৌঁসুলি ব্যারিস্টার হাসান এমএস আজিম ও রেদোয়ান আহমেদ রানজীব আবেদনের ওপর শুনানি করেন। নির্বাচন দরকার ছিল:এটর্নি জেনারেল এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, হাইকোর্টের রায়ের পর ১৫৪ জনের নির্বাচন নিয়ে কোনো রকম প্রশ্ন তোলার আর কোনো অবকাশ আছে বলে আমি মনে করি না। রিটকারীর বক্তব্য ছিলো, আরপিও’র ধারা ১৯’র পরিপ্রেক্ষিতে ১৫৪ জন এমপি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন তাই এই বিধান বাতিল করে দেয়া দরকার। যেহেতু রিট খারিজ হয়েছে সেহেতু আমরা বলতে পারি, ১৫৪ জনের নির্বাচন পরোক্ষভাবে আদালতের কাছে বৈধতা পেল। তিনি বলেন, ১৯৩টি রাষ্ট্র জাতিসংঘের সদস্য। তার মধ্যে রিটকারীরা ১২-১৩টি রাষ্ট্রের কথা উল্লেখ করেছেন, যেখানে হ্যাঁ-না ভোট আছে। যেখানে ৯০ শতাংশ রাষ্ট্রে না ভোটের বিধান নেই সেখানে আমাদের দেশে এটা সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয়। এটা যারা বলছেন, তারা নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে চাচ্ছেন। তারা বুঝতে পারছেন না, সময়মতো নির্বাচন না হলে আমাদের সংবিধানের ধারাবাহিকতা ব্যাহত হত। এটা ব্যাহতের সুযোগ নিয়ে অনির্বাচিত লোকরা ক্ষমতায় আসার পাঁয়তারা হয়ত করতে পারত। তিনি বলেন, সাংবিধানিক শূন্যতার সৃষ্টি যেন না হয়, সেজন্য ৫ জানুয়ারির নির্বাচন করা ছিল ‘আবশ্যিক’।