চট্টগ্রামে পুলিশের নির্যাতনে মো. রোকনুজ্জামান (৪৫) নামে এক আবাসন ব্যবসায়ীর মৃত্যু হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। নিহতের স্ত্রী শিমু আক্তার অভিযোগ করেন, গত বুধবার রাত ১২টায় নগরীর বাঁকলিয়া থানাধীন সৈয়দ শাহ রোডের এহসান সিটির একটি বাসা থেকে তার স্বামীকে মারতে মারতে নিয়ে যায় পুলিশ। পুলিশ দাবি করে তার স্বামী ধর্ষণ মামলার আসামি। রোকনুজ্জামান পুলিশের কাছে ওয়ারেন্ট দেখতে চান। ওয়ারেন্ট ছাড়া থানায় যেতে অস্বীকৃতি জানালে পুলিশ তার ওপর চড়াও হয়। এসআই আমীর হোসেনের নেতৃত্বে পাঁচলাইশ থানা পুলিশের কয়েকজন সদস্য রোকনুজ্জামানের বুকে ও ঘাড়ের পেছন দিকে উপর্যুপরি আঘাত করে। এ ঘটনায় তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। এরপর অনেকটা অচেতন অবস্থায় তাকে পুলিশের গাড়িতে তোলা হয়। রোকনুজ্জামানকে এভাবে নিয়ে যাওয়ার কারণ জানতে চাইলে পুলিশ পাশের ফ্ল্যাটের বাসিন্দা নাসুকেও গাড়িতে তুলে নেয়। রাত সাড়ে ১২টায় নাসুর এক আত্মীয় চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল থেকে ফোন করে রোকনুজ্জামানের মৃত্যুর খবর দেয়।
তবে পুলিশ এ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, রোকনুজ্জামান ধর্ষণ মামলার আসামি। বুধবার রাতে তাকে এ মামলায় গ্রেফতার করতে গেলে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। এরপর চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেয়ার পর চিকিত্সকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এ ব্যাপারে চট্টগ্রাম মেডিক্যালের কর্তব্যরত চিকিত্সক জানান, ওই ব্যক্তিকে মৃত অবস্থায় হাসপাতালে আনা হয়েছিল।
শিমু আক্তার ইত্তেফাককে বলেন, আমার স্বামীর বিরুদ্ধে থানায় ধর্ষণ মামলা হয়েছে এমন কোনো তথ্য আমাদের জানা ছিল না। আমরা মামলার কাগজপত্র দেখতে চাইলে পুলিশ আমাদের থানায় যেতে বলে। আমরা পুলিশের পা ধরলেও তারা মারা থেকে বিরত থাকেনি। এসময় আমার স্বামী পানি খেতে চায়। কিন্তু পুলিশ তাকে পানি খাওয়ার সময় পর্যন্ত দেয়নি। তাকে হাতকড়া পরিয়ে টেনে হিঁচড়ে গাড়িতে তোলা হয়।
এ বিষয়ে পাঁচলাইশ থানার এসআই আমীর হোসেন ইত্তেফাককে বলেন, মাজেদা বেগম নামে এক মহিলা গত ৫ জুন পাঁচলাইশ থানায় রোকনুজ্জামানের বিরুদ্ধে একটি ধর্ষণ মামলা দায়ের করেন। এ মামলার পর রোকনুজ্জামান পলাতক ছিলেন। বুধবার রাতে তাকে গ্রেফতার করার জন্য বাসায় যাই। এসময় তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লে চট্টগ্রাম মেডিক্যালে নিয়ে যাওয়ার পর চিকিত্সকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। রোকনুজ্জামানকে নির্যাতনের খবর অস্বীকার করে তিনি বলেন, তিনি (রোকনুজ্জামান) অসুস্থ ছিলেন। একজন অসুস্থ মানুষকে কি মারধর করা যায়।
এদিকে, রোকনুজ্জামানের অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনায় শোকের মাতম চলছে তার পরিবারে। গতকাল হাসপাতাল মর্গের সামনে রোকনুজ্জামানের মা আছিয়া বেগমকে (৬০) বুকফাটা আহাজারি করতে দেখা যায়। তিনি বলেন, পুলিশ আমার ছেলেকে মেরে ফেলেছে। আমি পুলিশকে বললাম আমার ছেলে যদি অপরাধ করেই থাকে তাহলে আমি নিজের হাতে তাকে বিচারকের সামনে নিয়ে যাবো। তবু ওকে মেরো না। কিন্তু পুলিশ আমার কথা শোনেনি। আমি আল্লাহর কাছে এর বিচার চাই।
শিমু আক্তার জানান, পুলিশ বলছে মামলার পর থেকে নাকি আমার স্বামী পলাতক। অথচ আমরা মামলার ব্যাপারে কিছুই জানি না। তিনি আরো জানান, তাদের ১০ মাস বয়সী একটি মেয়ে রয়েছে। তিনি আবার অন্তঃসত্ত্বা। শিমু কাঁদতে কাঁদতে বলেন, আমার সন্তানরা এখন কাকে বাবা বলে ডাকবে। এ দু’টি অবোধ শিশু নিয়ে আমি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবো।
এ ব্যাপারে বক্তব্য জানতে পাঁচলাইশ থানার ওসি ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বেশ কয়েকবার ফোন করলেও তারা ফোন রিসিভ করেননি। ময়নাতদন্ত শেষে গতকাল রাতে রোকনুজ্জামানকে কাতালগঞ্জ এলাকায় পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। এ ঘটনায় পাঁচলাইশ থানায় অপমৃত্যু মামলা হয়েছে।
