স্বপ্নচারী এক তরুণের নাম কাজী আরেফীন আহমেদ শশী। সবসময় নতুন কিছু করতে চেয়েছেন তিনি। প্রচলিত, পুরনো কিছুই ভালো লাগে না তার। তিনি চেয়েছেন এমন কিছু কাজ করতে যা তার মনকে আনন্দ দেবে। নিজের ছোট জীবনে এই তরুণ সবসময় প্রাধান্য দিয়েছেন নিজের ভালোলাগা, নিজের স্বপ্নকে। প্রতিভাবান এই তরুণের গল্প লিখেছেন আহসান রনি
ক্লাস টুতে থাকতেই শশীকে ভর্তি করে দেওয়া হয় শিশু একাডেমীতে। সেখানে গান, আবৃতি, অভিনয় শিখতেন। অভিনয়ের প্রতি আগ্রহ থেকে ক্লাস ফোরে লোকনাট্য দলের শিশুকিশোর থিয়েটারে যোগ দেন। থিয়েটার দারুণ ভালো লাগতো, মঞ্চে তাই নিয়মিতই ছিলেন তিনি। থিয়েটারের নিয়মকানুন ও অভিনয়ের অনুশীলন তাকে গড়ে তুলেছে একজন আত্মবিশ্বাসী মানুষ হিসেবে। বিটিভির কয়েকটি ছোটদের অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছেন শিশুশিল্পী হিসেবে। পাশাপাশি বাংলাদেশ বেতারে আবৃত্তি আর টেলিভিশনে শিশুশিল্পী হিসেবে অভিনয় করা শুরু করেন। সুযোগ পেলেন হানিফ সংকেতের একটি প্যাকেজ নাটকে শিশুশিল্পী হিসেবে অভিনয় করার। শশীর কাছে তখনকার দিনে যারা তারকা, তাদের সাথেই অভিনয় করলেন তিনি। হানিফ সংকেতের পরবর্তী নাটকেও তিনি ডাক পান। মান্নান হীরার ‘মস্ত বড় কাণ্ড’-নামক একটি শিশু-কিশোর থ্রিলারে। ২০০০ সালে তিনি ‘পিপলস থিয়েটার’-এর পক্ষ থেকে জার্মানি ও জাপানে যান ইন্টারন্যাশনাল ফেস্টিভ্যালে অংশ নিতে। বিভিন্ন দেশের নানা রকম মানুষ ও সংস্কৃতির সাথে পরিচয় ঘটে তার। জীবনের অভিজ্ঞতা অর্জনের মিশনে যুক্ত হয় নতুন কিছু স্মরণীয় স্মৃতি। ২০০০-এর শেষে যুক্ত হলেন একুশে টিভির অনুষ্ঠান মুক্তখবরে। শিশু সাংবাদিক হিসেবে বিভিন্ন বড় বড় মানুষদের সাথে, ভারী ভারী বিষয়ে আলোচনায় অংশ নিলেন। যেন কোনো ঘোরের মধ্যে কাটতে লাগল এই শিশু সাংবাদিকের জীবন। নানান অভিজ্ঞতা, উপলব্ধি, উত্সাহের যোগফল মিলিয়েই তার স্বপ্ন দেখা শুরু, যা ধীরে ধীরে সম্ভাব্য লক্ষ্যে পরিণত হয়েছে। এরপর নিয়মিতভাবে শিল্পের একাধিক ক্ষেত্রে বিভিন্ন দায়িত্বে সেই লক্ষ্য অর্জনে এখনো কাজ শিখে চলেছেন এই তরুণ। ঢাকাতেই বেড়ে ওঠা শশী মতিঝিল গভ. বয়েজ হাই স্কুল থেকে এসএসসি, বিএএফ শাহীন কলেজ, তেজগাঁও থেকে এইচএসসি ও সবশেষে দেশসেরা বিদ্যাপিঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চারুকলা অনুষদে গ্রাফিক ডিজাইন বিষয়ে অনার্স করেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তার চান্স পাওয়ার অভিজ্ঞতাটা অনেক মজার। পরীক্ষার ঠিক একমাস আগে হঠাত্ করে সিদ্ধান্ত নেন চারুকলাতে পরীক্ষা দেবেন। গ্রাফিক ডিজাইন বিষয়ে পড়তে চান বিধায় পরিবার থেকেও একবার চেষ্টা করার জন্য বলেন। কোচিংয়ের শেষ ব্যাচের শেষ ছাত্র হিসেবে ভর্তি হন তিনি। ঢাবির চারুকলাতে পড়ার নেশাতে ছবি আঁকা অনুশীলন করতে থাকেন এবং পড়াশোনা করতে থাকেন দিন-রাত। আব্বু বলেন, ‘তুই যদি এরকম পড়া আগে পড়তি তাহলে আগের রেজাল্টগুলো আরো ভাল হতো।’ তার সাধনা বৃথা যায়নি। রেজাল্ট শিটে নিজের রোল ও নাম দেখতে পাওয়া তার জীবনের অন্যতম স্মরণীয় ঘটনা মনে করেন তিনি। ঢাবিতে পড়া অবস্থায় তিনি অ্যাসিস্টেন্ট প্রডিউসার হিসেবে কাজ করেন সিসিমপুর অনুষ্ঠানটিতে। আরও কাজ করেছেন বিখ্যাত ‘মেহেরজান’ সিনেমাটিতে। ইশতিয়াক জিকো ও তার তৈরি ‘৭.২০ ডিগ্রিস’ নামক শর্ট ফিল্ম ভেনিস ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে যাওয়া প্রথম বাংলাদেশি চলচ্চিত্র। এছাড়া এই শর্ট ফিল্মটি নানা ফেস্টিভ্যালে অংশ নিয়েছে এবং পুরস্কৃত হয়েছে। তিনি কাজ করেছেন ‘ফরগটেন রুলস’ নামক একটি রিয়েলিটি শো-তেও। ২০১২ সালের দিকে তিনি একটি দীর্ষস্থায়ী পরিকল্পনা করেন। তৈরি করেন একটি টিম। এই টিম প্রথম কাজ শুরু করে টিভিসির মাধ্যমে। এই টিম নিয়েই অনেকগুলো ভালো ভালো কাজ করেছেন এবং করে চলেছেন। ২০১৩-এর শেষের দিকে তিনি যমুনা টিভিতে যোগ দেন। টিভির পর্দা তিনি এমন কিছু গল্প তুলে আনতে চেয়েছেন যা মানুষকে অণুপ্রেরণা দেয়। সেই চিন্তা থেকেই ‘স্টার্ট’ নামে একটি অনুষ্ঠান শুরু করেন তিনি। তিনি চান এখনকার প্রতিটি রিপোর্ট মানুষদের অনুপ্রাণিত করে তুলবে। স্বপ্নালু এই তরুণ চান স্বপ্নবান উদ্যমী তরুণদের একটা নেটয়ার্ক গড়ে তুলতে! ভবিষ্যতের কর্ণধাররা যেন এখন থেকেই একে অপরকে চিনতে পারে, কাজ সম্পর্কে জানতে পারে, অ্যাপ্রিশিয়েট করতে পারে, এদের অসাধারণ অনুপ্রেরণামূলক গল্পগুলো যেনো নতুন উদ্যোক্তা তৈরির ফর্মুলা হিসেবে কাজ করে; এই সোশ্যাল হিরোদের বন্ধুত্ব বা যোগাযোগের স্বয়ংক্রিয় প্লাটফর্মটা গড়ে তোলার লক্ষ্যে কাজ করে যাবেন তিনি। তার স্বপ্ন এমন বাংলা সিনেমা তৈরি করার যেটি হবে তরুণদের মুখপাত্র। বাণিজ্যিক ধারার সিনেমা হলেও তার সিনেমা হবে বাস্তব ঘটনা নিয়ে। যা মানুষকে নতুন করে ভাবতে শেখাবে। ব্যতিক্রমী চিন্তা-ভাবনার অধিকারী এই তরুণ চান তারুণ্যের জয় হোক এবং সকল প্রতিভাবান তরুণরা একত্র হয়ে দেশের কল্যাণে কাজ করুক।
