নারী পাচার সংক্রান্ত খবর বহু বত্সর ধরিয়া যেন সাধারণ সংবাদে পরিণত হইয়াছে। যাহা নিয়মিত ঘটে, তাহা অমানবিক ও সভ্যতাবিরোধী হইলেও মানুষের মনে রেখাপাত করিবার শক্তি হ্রাস পায়। নারী পাচার পূর্বাপর যেইভাবে চলিয়া আসিতেছে এবং যেইভাবে উদ্বেগজনক হারে নূতন নূতন উপায়ে বৃদ্ধি পাইতেছে, অথচ তাহার বিপরীতে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করিবার তাত্পর্যপূর্ণ পরিকল্পনা খুব সামান্যই দেখা যায়। গত বুধবার ইত্তেফাকে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে জানা যায়, মোটা বেতনের চাকুরীর প্রলোভনে পড়িয়া জামালপুরের বকশীগঞ্জ উপজেলার মেরুরচর গ্রাম হইতে ভারতে পাচার করা হইয়াছে এক গৃহবধূকে। পত্র-পত্রিকায় নারী ও শিশু পাচার সংক্রান্ত সংবাদগুলি বিশ্লেষণ করিলে দেখা যায়, প্রায় সব ক্ষেত্রেই ইহার নেপথ্য কারণ হইল—দারিদ্র্য, বেকারত্ব, নারীর নিম্নমানের পেশা, চাকুরীর সুযোগের অভাব, মাথাপিছু নিম্ন আয়, সম্পদে নারীর অনধিকার, চাকুরির ক্ষেত্রে সমান সুযোগের অভাব ইত্যাদি। বাংলাদেশে বিভিন্ন গবেষণা ও সমীক্ষায় দেখা গিয়াছে, যেই এলাকার নারী-পুরুষরা পাচারের শিকার হয় সেই এলাকার লোকজন অত্যন্ত দরিদ্র, সেখানে ভূমিহীনদের সংখ্যাধিক্য, খাদ্যাভাব এবং চরম বেকারত্ব বিরাজমান। এই পরিস্থিতিতে এইসব এলাকার পিতা-মাতারা নগদ অর্থ দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেয় এমন কাহারো নিকট হইতে পরিবারের নারী ও শিশুদের জন্য বিবাহ বা চাকুরীর প্রস্তাব পাইলে তাহা গ্রহণ করিতে বিলম্ব করে না। অন্যদিকে, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এবং ভোগ্যপণ্য পাইবার লোভে পাচারকারীরা নিজেদের নিপুণভাবে পরিচালনা করিয়া থাকে।
নারী ও শিশু পাচারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক কারণ হইল, পরিবারে নারীর অবহেলিত অবস্থান, যাহা সমাজের প্রচলিত বিভিন্ন মূল্যবোধ, আচার-আচরণ ও সামাজিক রীতি দ্বারা প্রতিষ্ঠিত। আমাদের সমাজে নারীর সামাজিক অবস্থান তাহার বৈবাহিক অবস্থা দ্বারা নির্ধারিত। বিশেষ করিয়া দরিদ্র পরিবারের পিতা-মাতারা মেয়েদের জন্য আইন দ্বারা নির্ধারিত বিবাহের উপযুক্ত বয়স ১৮ বত্সরের পূর্বেই মেয়েদের বিবাহ দেওয়া দায়িত্ব বলিয়া মনে করে। এই মানসিকতায়, যেইসব ছেলে বিয়েতে যৌতুক চাহে না, ‘কন্যাদায়গ্রস্ত’ দরিদ্র পিতা-মাতারা তাহার সহিত খোঁজ-খবর না করিয়াই কম বয়সী মেয়েদের বিবাহ দেয়। নারী পাচারকারী চক্র এখন লেখাপড়া না জানা বস্তিবাসী কিংবা স্বল্পশিক্ষিত পোশাক কর্মীদের তুলনায় অধিক টার্গেট করিতেছে মফস্বলের অষ্টম হইতে দ্বাদশ শ্রেণি পড়ুয়া ছাত্রীদের। পাচারকারীরা কোনো এক ছাত্রীকে টার্গেট করিয়া তাহাদের নিয়োগকৃত তরুণ বা যুবকেরা সেই টার্গেটের সহিত সখ্য গড়িয়া তোলে। ছাত্রীর কথিত প্রেমিক এই সময় তাহার পেছনে মোটা অঙ্কের টাকা খরচ করে। গভীর প্রেমের সম্পর্ক গড়িয়া উঠিলে পূর্ব পরিকল্পনা অনুসারে তাহারা টার্গেটকে বিবাহের প্রলোভন দিয়া বাড়ি হইতে বাহির করিয়া আনে। পরে মেয়েটিকে পাচারকারী মূল চক্রের হাতে তুলিয়া দেওয়া হয়। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী গত ১০ বত্সরে বাংলাদেশ হইতে তিন লাখের বেশি নারী শিশু পাচার হইয়াছে ভারতে। টাইমস অব ইন্ডিয়ার এক প্রতিবেদনে বলা হইয়াছে, ফি বত্সর বাংলাদেশ হইতে প্রায় ৫০ হাজার নারী ও শিশু ভারত, পাকিস্তান ও মধ্যপ্রাচ্যে পাচার হইয়া থাকে। সুতরাং ইহা স্পষ্ট যে, নারী পাচার বন্ধ করিবার জন্য চাই আর্থ-সামাজিক অবস্থার পরিবর্তন, চাই দরিদ্র মানুষের জীবিকার ব্যবস্থা। সরকার রুজি-রোজগারের বন্দোবস্ত না করিলে উপার্জনের অন্য পথ না পাইয়া মেয়েরা ওই ফাঁদে পা দিতে বাধ্য হয়। গরিবদের জীবনধারণের ন্যূনতম ব্যবস্থা করিতে না পারিলে নারী পাচার সম্পূর্ণ বন্ধ করা সম্ভব নহে।
পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গিতে গড়িয়া ওঠা সমাজে নারীকে সর্বৈবভাবে ব্যবহার করার প্রবণতা বহু পুরাতন। বিশ্বায়নের যুগে বিজ্ঞানের সহিত পাল্লা দিয়া মানুষ ক্রমশ উন্নত হইতেছে মানসিকভাবেও। পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির আমূল পরিবর্তন ঘটিয়াছে বিশ্বের উন্নত প্রায় সব দেশেই। কিন্তু যেই সকল দেশ এখনও ডুবিয়া আছে দারিদ্র্যের নর্দমায়, সেইখানে পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা এখনও বহাল তবিয়তে প্রভাব বিস্তার করিতেছে পুরো সমাজকে। নারী সেইখানে পণ্য মাত্র, ভোগের বস্তু মাত্র। তাই পুরুষের বিকৃত মানসিকতার দুষ্টবীজের চাষাবাদের জন্য সবচেয়ে উর্বর ক্ষেত্র হইল ‘দারিদ্র্য’। বাংলাদেশও স্বাভাবিকভাবে সেই চাষাবাদের উর্বর ভূমি। সুতরাং ‘দারিদ্র্য’ দূর করিতে পারিলে বহুলাংশে রোধ করা সম্ভব নারী পাচার। তাহার সহিত চাই পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন।
