উত্তরপত্র মূল্যায়নভাতা

আপডেট : ২০ জুন ২০১৪, ২১:০২
স্বাধীনতা লাভের চার দশক পর বর্তমান সরকার প্রথম কোনো শিক্ষানীতি (২০১০) প্রণয়ন করে তা বাস্তবায়ন শুরু করেছে। কিন্তু দীর্ঘদিনের ঔপনিবেশিক আর সামরিক শাসনের যাঁতাকলে পিষ্ট আমলাতন্ত্রের কারণে এখনো এর সুফল সাধারণের দৃশ্যমান নয়। এখন পর্যন্ত দেশের মেধাবী সন্তানদের শিক্ষকতা পেশায় আসতে আশানুরূপ আকৃষ্ট করা যাচ্ছে না। এ প্রেক্ষাপটে বর্তমান সরকারের বিগত দুবারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে শিক্ষকদের জন্য পৃথক বেতনস্কেলের কথা ছিল। কিন্তু সম্ভবত ঐ একই কারণে তা বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি আজো। তবে আশার কথা—সরকার স্থায়ী পে-কমিশন গঠন করেছেন। পত্র-পত্রিকার ভাষ্যমতে, বর্তমান পে-কমিশন পূর্ণোদ্যমে তাঁদের কার্যক্রম এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। আর তাই বর্তমান পে-কমিশন সমীপে শিক্ষকদের উত্তরপত্র মূল্যায়নভাতার যৌক্তিকতা জানাতে চাই। সংস্কৃত প্রবাদ আছে—স্বদেশে পূজ্যতে রাজন বিদ্বান সর্বত্র। অন্যদিকে, যে দেশে বিদ্বানের কদর নেই সে দেশে বিদ্বান জন্মায় না। অথচ আমাদের দেশে বিদ্বান তৈরির কারিগর শিক্ষকসমাজ অধিকতর অবহেলিত। জাতির অগ্রগতির স্বার্থেই শিক্ষকতা পেশাকে আকর্ষণীয় করতে হবে; যাতে বিদ্বানদের বিচরণক্ষেত্র হয় শিক্ষাঙ্গন। আমাদের দেশের বর্তমান চিত্র ঠিক এর বিপরীত। এখানে শিক্ষকতা পেশায় পদোন্নতির সুযোগ সবচেয়ে কম ; বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সারাজীবন একই পদে থেকে অবসর নিতে হয় (সরকারি কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সামান্য সংখ্যক শিক্ষক ছাড়া)। বাংলাদেশে অনেক পেশায় ঝুঁকিভাতা, ওভারটাইম-এফসি, উত্সাহ বোনাস, লভ্যাংশ ও বড় অঙ্কের ঋণ ইত্যাদি সুবিধা রয়েছে। অথচ শিক্ষকদের বেলায় নৈবচ। বর্তমানে সৃজনশীল পদ্ধতিতে প্রশ্নপত্র প্রণয়ন ও উত্তরপত্র মূল্যায়নে আগের তুলনায় অনেক বেশি সময় ব্যয় হয়। এ কাজগুলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অবস্থান সময়ে সম্ভব হয় না। অধিকাংশ সময়েই গভীর রাত পর্যন্ত জেগে অভ্যন্তরীণ পরীক্ষার এ কাজগুলো করতে হয় পারিশ্রমিক ছাড়াই। অথচ একই কাজ শিক্ষাবোর্ড বা বিশ্ববিদ্যালয়ে হলে পারিশ্রমিক মেলে। শহরের ধনাঢ্য অঞ্চলের বেসরকারি অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও অভ্যন্তরীণ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র প্রণয়ন ও উত্তরপত্র মূল্যায়নে পারিশ্রমিক দেওয়া হয়; তবে এরকম সুবিধাভোগী শিক্ষকের সংখ্যা অতি অল্প। অধিকাংশ শিক্ষকই এ সুবিধা থেকে বঞ্চিত। শিক্ষকদের এই বঞ্চনা থেকে মুক্তি দিয়ে প্রত্যেকের মূল বেতনের ৫০% উত্তরপত্র মূল্যায়নভাতা প্রদান প্রয়োজন। এর সুফল বা সুবিধা ফলবে অনেক। প্রথমত, এ ভাতা চালু হলে শিক্ষকদের উত্তরপত্র মূল্যায়নের জন্য অতিরিক্ত ফি আদায় করা হবে না— ফলে বোর্ড-বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন পরীক্ষার ফি কমে আসবে। এতে দেশের সকল শিক্ষার্থী উপকৃত হবে। সুবিধা প্রান্তিক পর্যায়ে পৌঁছাবে বলে সরকারের সুনাম বাড়বে। দ্বিতীয়ত, সকল শিক্ষকের জন্য উত্তরপত্র মূল্যায়ন বাধ্যতামূলক হবে এবং অতি অল্পসংখ্যক শিক্ষক দিয়ে তড়িঘড়ি করে বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়নের অভিশাপ থেকে জাতি মুক্তি পাবে। চতুর্থত, একটিমাত্র ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে বাংলাদেশের সকল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি কার্যক্রম চালু করতে কোনো বাধা থাকবে না। কারণ ভর্তি পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়নের পারিশ্রমিক কমে যাবে বলে অনেকেই সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষার বিরোধিতা করছেন। এতে করে কোচিং বাণিজ্য এবং এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াজাত প্রশ্নপত্র ফাঁস প্রবণতাও লোপ পাবে। পঞ্চমত, শিক্ষকতা আকর্ষণীয় পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে এবং মেধাবীরা এ পেশায় আসতে অধিকতর আগ্রহী হবে। দেশে শিক্ষার সংখ্যার পাশাপাশি গুণগতমান বাড়বে। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে শিক্ষকদের মূল বেতনের ৫০% উত্তরপত্র মূল্যায়ন ভাতা প্রদান প্রবর্তন করা যায় কিনা তা ভেবে দেখার জন্য সংশ্লিষ্ট সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। চট্টগ্রাম