মানবমুক্তি এবং মানুষের মনকে কলুষ ও বিদ্বেষমুক্ত করে সুন্দর করে তোলার সাধনাই ছিল বেগম সুফিয়া কামালের জীবনাদর্শ। আর তাই সামপ্রদায়িক বিদ্বেষ ও দাঙ্গার বিরুদ্ধে নিরন্তর সংগ্রাম করে গেছেন তিনি। নারীমুক্তি ও অধিকার প্রতিষ্ঠায় তিনি ছিলেন সোচ্চার। আজও সমাজের এই কালো অধ্যায়গুলো বিদ্যমান, তাই তার সাহসী সেই আন্দোলনও প্রয়োজন বলে মনে করেন বিশিষ্টজনেরা। তারা সেই আন্দোলন চালিয়ে নেয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। গতকাল সাহসী জননী কবি বেগম সুফিয়া কামালের ১০৩তম জন্মবার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তারা এই প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
কবির প্রতিকৃতিতে পুষ্পমাল্য অর্পণ করে বাংলা একাডেমিতে জন্মউত্সব শুরু করে তাঁর হাতে গড়া সংগঠন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ। ১৯৭০ সালে প্রতিষ্ঠা করে তিন দশক তিনি নানা আন্দোলন ও কর্মকাণ্ডের মধ্যে সংগঠনের সভাপতিত্ব করেন। প্রতিবছরই এই অনুষ্ঠান দুইটি অংশে বিভক্ত থাকে। প্রথমত তার বিশেষ অবদান নিয়ে স্মারক বক্তৃতা। এবছর ‘সামপ্রদায়িকতা বিরোধী আন্দোলন, গণতন্ত্র ও সুফিয়া কামাল’ শীর্ষক বক্তৃতা প্রদান করেন বাংলা একাডেমীর মহাপরিচালক শাসুজ্জামান খান। তিনি বলেন,তার শুরুটা হয়েছিল ১৯৬৪ সালে কলকাতার দাঙ্গার সময় লেডি ব্রাবোর্ন কলেজে আশ্রয়কেন্দ্র পরিচালনার মধ্য দিয়ে। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর তিনি পঞ্চাশের দশকে সামপ্রদায়িক দাঙ্গার বিরুদ্ধে রাজপথে নামেন শান্তির জন্য। ৬৪তে ঢাকার দাঙ্গায়ও তিনি ছিলেন রাজপথে। সামপ্রদায়িকতা নির্মূলে তিনি হয়ে ওঠেন অসামপ্রদায়িকতার জীবন্ত প্রতীক। নারী জাগরণের দীক্ষা পেয়েছিলেন বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের কাছে। নারী প্রগতির সংগ্রামে তাই তার ভূমিকা অবিস্মরণীয় হয়ে আছে। তিনিই বলেছেন ‘নারী মুক্তি মানে মানবমুক্তি’।
দ্বিতীয় অংশে কবি সুফিয়া কামাল সম্মাননা পদক ২০১৪ প্রদান করা হয়। যা এবছর দেয়া হয় প্রয়াত বিচারপতি দেবেশচন্দ্র ভট্টাচার্যকে। দেবেশচন্দ্র ভট্টাচার্যের পক্ষে এই সম্মাননা গ্রহণ করেন তার ছেলে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। অনুষ্ঠানে দেবেশচন্দ্র ভট্টাচার্যের নারীমুক্তি ও অসামপ্রদায়িক ভূমিকা তুলে ধরেন রাখি দাস পুরকায়স্থ। দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়ে বলেন, যে সময় সুফিয়া কামালের মতো নেতৃবৃন্দ অসামপ্রদায়িক ও নারীমুক্তির আন্দোলন করেছেন, সে সময় বিদেশিরা এই অপরাধের সাথে যুক্ত ছিল। আজ স্বাধীন দেশে নিজ দেশের মানুষ এই অপরাধ করে বেলায়। তাই আদিবাসীদের উপর,সংখ্যালঘুদের উপর নানাভাবে বিপর্যয় নেমে আসে।
অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে পরিষদের সভাপতি আয়শা খানম বলেন, যে পতাকা সাহসী জননী আমাদের হাতে দিয়ে গেছেন আমরা যেন অন্তর দিয়ে তার গুরুত্ব উপলব্ধি করে সকল প্রকার অসাম্প্রদায়িক আন্দোলন ও নারীমুক্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ করে যেতে পারি। আমরা যেন এই পরিস্থিতি পরিবর্তন না হওয়া পর্যন্ত ক্লান্ত না হয়ে পড়ি। অনুষ্ঠানে সা্বাগত বক্তব্য দেন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে সংগীত পরিবেশন করেন খায়রুল আনাম শাকিল ও তানিয়া মান্নান।
