আমদানি কমলেও খাদ্যে ফরমালিন বেড়েছে

আপডেট : ২০ জুন ২০১৪, ২২:২২
মানুষের দেহে ১.৫ পিপিএম মাত্রার ফরমালিন সহনীয় কিন্তু ফরমালিন বিরোধী অভিযানে দেখা গেছে, ঢাকায় প্রবেশ করা মৌসুমী ফলে রয়েছে ১২৫ পিপিএম মাত্রার ফরমালিন সরকারি হিসেবে দেখা যাচ্ছে প্রতি বছর বিদেশ থেকে ফরমালিন আমদানি ব্যাপকভাবে কমছে। কিন্তু খাদ্যদ্রব্যে ফরমালিনের ব্যবহার দিন দিন বাড়ছে। শুধু তাই নয়, মৌসুমী ফলে এমনভাবে ফরমালিন ব্যবহার করা হচ্ছে যা মানুষের শরীরে প্রবেশ করলে তত্ক্ষণাত্ একজন মানুষ মারা যেতে পারেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মানুষের দেহে ১.৫ পিপিএম (পার্টস পার মিলিয়ন) মাত্রার ফরমালিন সহনীয়। কিন্তু পুলিশের ফরমালিন বিরোধী অভিযানে দেখা গেছে, ঢাকায় প্রবেশ করা মৌসুমী ফলে রয়েছে ১২৫ পিপিএম মাত্রার ফরমালিন। আর এসব ফলের বাইরে মাছ, মাংস, শাক-সবজিতে তো ফরমালিন পাওয়া যাচ্ছে ব্যাপকভাবে। সমপ্রতি জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য সানজিদা খানমের এক প্রশ্নের উত্তরে বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ জানিয়েছেন, ২০১২-২০১৩ অর্থবছরে বিদেশ থেকে ফরমালিন আমদানি হয়েছে ১ হাজার ৩৭৯ মণ ১৩ কেজি। যা আগের অর্থবছরে ছিল ৫ হাজার ১২৭ মণ ১৬ কেজি। ২০১০-২০১১ অর্থবছরে ছিল ৬ হাজার ৭৩৩ মণ ১২ কেজি। আর ২০০৯-২০১০ অর্থবছরে ছিল ১৩ হাজার ৬২১ মণ ৬ কেজি। সংসদে বাণিজ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, ৩৮টি প্রতিষ্ঠান বৈধভাবে দেশে ফরমালিন আনে। কোন এজেন্ট ফরমালিন আমদানি করে না। আমদানিকারকদের মাধ্যমেই ফরমালিন আসে। তাদের উপর সরকারের নজরদারি রয়েছে। বিভিন্ন হাসপাতাল, ল্যাবরেটরি ও ওষুধ শিল্পের জন্য ফরমালিন আনা হয়। কিন্তু প্রশ্ন হল আমদানি এত কমলেও খাদ্যদ্রব্যে ফরমালিনের ব্যবহার কমছে না কেন? বরং দিন দিন বাড়ছে। সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, এর কারণ অবৈধভাবেও দেশে ফরমালিন আমদানি হচ্ছে। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার রাজধানীর পুরান ঢাকার চানখাঁরপুল এলাকা থেকে ৫০ ড্রাম অবৈধ ফরমালিন জব্দ করেছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট অতুল মণ্ডল ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে এসব ফরমালিন জব্দ করেন। ভ্রাম্যমাণ আদালতের বিচারক অতুল মণ্ডল ইত্তেফাককে বলেন, সিলগালা করা নাদিকা কেমিক্যাল স্টোরের তালা ভেঙে অভিযান চালানো হয়। তিনি জানান, দোকানের মালিক মামুনুর রশিদ ও রিয়াজুর রশিদ পলাতক। দোকানের কোনো বৈধ কাগজপত্র না থাকায় স্টোর আবারও সিলগালা করে দেয়া হয়েছে। অতুল মণ্ডল বলেন, এসব ফরমালিন অবৈধভাবেই দেশে এসেছে। গত এক সপ্তাহ ধরে রাজধানীতে প্রবেশ করা সবগুলো ফলের ট্রাকে তল্লাশি চালাচ্ছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ। এর জন্য চেকপোষ্টের পাশাপাশি ভ্রাম্যমাণ আদালত ও ফরমালিন পরীক্ষারজন্য বিশেষজ্ঞও রাখা হয়েছে। ফরমালিন বিরোধী অভিযানের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের মুখপাত্র যুগ্ম কমিশনার মনিরুল ইসলাম ইত্তেফাককে বলেন, রাজধানীতে প্রবেশ করা এসব ফলের ট্রাকে আম, জাম, লিচু, খেজুর, কলা, তাল, আনারস, লটকন, আপেল ও মাল্টা ছিল। পুলিশ আম, জাম ও লিচুতে পরীক্ষা চালিয়েছে। এই পরীক্ষায় মানবদেহের জন্য অতি ক্ষতিকর ও ভয়ঙ্কর মাত্রায় ফরমালিনের ব্যবহার পাওয়া যায়। আমে পাওয়া গেছে ২ দশমিক ৪৮ থেকে ১২৫ পিপিএম মাত্রায় ফরমালিন। লিচুতে ১ দশমিক ৪৯ থেকে ৩১ পিপিএম মাত্রা। আর জামে পাওয়া গেছে ৩৩ থেকে ৩৫ পিপিএম মাত্রায় ফরমালিন। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, ‘১২৫ পিপিএম মাত্রার ফরমালিন মানুষের শরীরে প্রবেশ করলে লিভার ও কিডনী নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি শিশুদের অঙ্গ প্রত্যঙ্গ বিকলাঙ্গ হয়ে যেতে পারে। প্যারালাইসিসসহ নানা ধরনের জটিল রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে বেশি। এই ফল খেলে গর্ভবতী মায়েরা মৃত বা বিকলাঙ্গ শিশুর জন্ম দিতে পারেন। সবচেয়ে বড় কথা একজন মানুষ এই ফরমালিনের প্রভাবে যেকোন সময় স্ট্রোক করতে পারেন।’ পুলিশের এই অভিযানের বিরুদ্ধে মাঠে নেমেছেন ফল ব্যবসায়ীরা। তারাও দোকান বন্ধ রেখে প্রতিবাদ জানাচ্ছেন। এর জবাবে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার বেনজীর আহমেদ বলেছেন, কোন আন্দোলনই তাদের অভিযান থেকে সরাতে পারবে না। এর সঙ্গে যোগ করে তিনি বলেন, খাদ্যে ফরমালিন মেশানো হত্যা চেষ্টারই শামিল। তাই কোন দোকানের খাবার বা খাবার জাতীয় পণ্যে ফরমালিন পেলে পুলিশ হত্যা চেষ্টার মামলা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কঠোরভাবে পুলিশ এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করবে।