দুর্গম এলাকায় শিক্ষার আলো ছড়িয়ে

আপডেট : ২২ জুন ২০১৪, ১৯:৫৮
বড় বড় গর্ত আর খানাখন্দ পেরিয়ে ভোলাগঞ্জ গেলে মনে হবে এই এলাকার মানুষ কিভাবে প্রতিদিন এই পথে চলাফেরা করে। রাস্তার অবস্থা এতটাই ঝুঁকিপূর্ণ যে সবসময় গাড়ি উল্টে খাদে পড়ার আশঙ্কা থাকে। প্রতিদিনের যাতায়াতের চরম দুর্ভোগ পেরিয়ে আর যাই হোক শিশুদের স্কুলে আসা সম্ভব নয়, এমন প্রশ্ন মনে জাগাও অবান্তর নয়। বরং যৌক্তিক। তবে কাঁচা ঘরের প্রাইমারি স্কুলে ঢুকে এই ধারণা আশ্চর্যজনক ভাবে বদলে যাবে। শিক্ষার আলোতে আলোকিত হওয়ার প্রত্যাশীদের নিয়ে লিখেছেন— রাবেয়া বেবী আলোকিত ওরা: প্রতিদিন যাতায়াতের যুদ্ধ করে ছোট্ট ছোট্ট সোনামনিরা স্কুলে এসে উচ্চ শিক্ষিত হওয়ার লক্ষ্যে পড়াশোনা করে। তাদের কারো পরনে ভাল কাপড় নেই, ব্যাগে টিফিন নেই, বিস্তীর্ণ পাথর অধ্যুষিত এলাকা হওয়ায় তেমন করে খেলার মাঠ নেই, স্কুলে টয়লেট নেই। তারপরও তারা শিক্ষার আলোতে আলোকিত হওয়ার প্রত্যয়ে প্রত্যয়ী। এই সকল স্কুলে বেশিরভাগই মেয়ে শিক্ষার্থী। আর এদের শিক্ষার আলো দিতে বলিয়ান যারা তারাও সবাই নারী। বিপুল উত্সাহে চলে তাদের পারস্পরিক শিক্ষা দেয়-নেয়া। তারপরেও তারা জানে না প্রাথমিক শিক্ষা শেষে আর পড়ার সুযোগ হবে কিনা। কারণ মাধ্যমিক স্কুলের সংখ্যা যেমন কম, তেমন সেগুলো তাদের নাগালের বাইরে। সরকারের সবার জন্য শিক্ষা কার্যক্রম দুর্গম এলাকার শিশুদের শিক্ষার দেয়ার কর্মসূচি একযোগে পালন করছে সরকারি ও বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা। অনেক প্রতিকূলতা সত্ত্বেও স্কুল সময় হলেই শিশুরা আসে স্কুলে। তবে এখনও এ অঞ্চলের অনেক এলাকায় স্কুল নেই। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বলছে, পর্যায়ক্রমে সব দুর্গম স্থানেই স্কুল করা হবে। আর নারী শিক্ষকদের অগ্রাধিকার দেয়া হবে। কারণ শিশুদের মাতৃস্নেহে তারাই শিক্ষা দিতে পারেন। সাথে আছে দুর্গম অঞ্চলের সমাজ উন্নয়নে নারী অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করার বাস্তবতা। চলে স্বতঃস্ফূর্ত আদান-প্রদান: ‘এই যে আমার দেশ, এই যে আমার বাড়ি, এই বাংলাদেশের জন্য আমি জীবন দিতে পারি।’ একটু লোকসঙ্গীতের ধাঁচে, খুব সুন্দর করে দেশাত্মবোধক গানটি শোনাচ্ছিল চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী তামান্না আক্তার। তামান্নাকে গানটি শিখিয়েছেন তার শিক্ষক রুকসানা পারভিন। সিলেট ভোলাগঞ্জ কাঁঠাল বাড়ি গ্রামের প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষক রুকসানা। তার স্কুলের ৩১ জন শিক্ষার্থীকে পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি গান, কবিতা, নাচও শিক্ষা দেন আর এই সব বিষয়ে তিনি নিজেও আগে প্রশিক্ষণ নিয়ে নেন। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের উচ্ছলতা দেখে বোঝার উপায় নেই তারা খানাখন্দ, ভাঙ্গাচোরা পথ পেরিয়ে এখানে পড়তে-পড়াতে আসে। আর সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৩টা পর্যন্ত একটানা পড়ে চলে। রুকসানা জানান, উচ্চ মাধ্যমিক ভর্তি হয়ে তিনি স্কুলের চাকরি পান। প্রতিবন্ধকতার জালে: উপকরণ আর পড়াশোনায় তেমন কোন সমস্যা না থাকলেও তাদের তিন মাস পর পর একসাথে বেতন দেয়ার সমালোচনা করেন সীমা। তিনি বলেন, প্রত্যেক মাসে বেতন পেলে তাদের অনেক বেশি সাশ্রয় হতো। আর প্রতিমাসে বেতন পেলেও বেতনের পরিমাণ আর একটু বাড়ানো এবং একটানা একজনের ত্রিশজন শিক্ষার্থীকে পড়ানো কষ্টকর বলে অভিযোগ করেন অন্য বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার শিক্ষকবৃন্দ। আর অভিভাবক খালেদা আক্তার বলেন, এই স্কুলে পড়া শেষ হলে তার সন্তানকে কোথায় দেবেন , সেই ভাবনায় তিনি শঙ্কিত। সংশ্লিষ্টদের অভিমত: এসব বিষয়ে ব্র্যাক শিক্ষা কর্মসূচি পরিচালক ড. শফিকুল ইসলাম বলেন, ব্র্যাক সব সময় নারী ও শিশুদের প্রাধান্য দিয়ে থাকে। আর একজন শিক্ষক এই জন্যই দেয়া হয়, যেন একসাথে অনেক দিন পড়ালে তার সাথে শিক্ষার্থীদের একটি ভাল সম্পর্ক হয়। শিক্ষকদের সাথে শিক্ষার্থীদের বোঝাপড়াও ভাল হয়। নারীদের মাতৃসুলভ ব্যবহারের জন্য আমাদের স্কুল গুলোতে শীত-গ্রীষ্ম, বর্ষা-বাদলে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি বেশি থাকে। তিনি আরও বলেন, এটি আমাদের একটি নির্দিষ্ট মেয়াদী পরিকল্পিত কর্মসূচি, তাই হঠাত্ করে এর কোন ব্যবস্থা পরিবর্তনও সম্ভব নয়। মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মসূচি বৃদ্ধি সরকারকেই করতে হবে মন্তব্য করেন তিনি। কারণ যে সব প্রস্তুতি মাধ্যমিক শিক্ষায় প্রয়োজন তা তারা দিতে পারেন না। সিলেট জেলার সহকারী শিক্ষা অফিসার মোঃ আবদুল ওয়াহেদ জানান, কোম্পানীগঞ্জ এলাকায় এমপিওভুক্ত ৮/১০টি স্কুল আছে। এখনই নতুন কোন স্কুল করার পরিকল্পনা নেই। আর শিক্ষকদের বেতনও মাসকাভারী করা সম্ভব নয় কারণ এই শিক্ষাকর্মসূচি যে প্রকল্পভিত্তিক তা পরিবর্তন সম্ভব নয়। তবে তিনি বলেন, ২০১৩ সালে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করা শিক্ষার্থীরা ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে এবং ২০১৪-তে উক্ত শ্রেণি শেষ করা শিক্ষার্থীরা ৭ম শ্রেণিতে একই স্কুলে পড়তে পারবে। এবং প্রতি বছরই এক শ্রেণি করে স্কুলের কলেবর বৃদ্ধি পাবে। ছবি: জিনাত সুলতানা