আজ নিজামীর যুদ্ধাপরাধ মামলার রায়

আপডেট : ২৩ জুন ২০১৪, ২২:২৬
জামায়াতের আমির মতিউর রহমান নিজামীর বিরুদ্ধে একাত্তরে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার রায় আজ মঙ্গলবার ঘোষণা করা হবে। গতকাল সোমবার বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিমের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ রায়ের জন্য এই দিন ধার্য করেন। যুদ্ধাপরাধের মামলায় এটি হবে দুই ট্রাইব্যুনালের দশম রায়। বুদ্ধিজীবী হত্যাসহ যুদ্ধাপরাধের ১৬ অভিযোগে বিচার হচ্ছে নিজামীর। তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রমাণ হয়েছে দাবি করে আদালতের কাছে সর্বোচ্চ শাস্তি কামনা করেছে রাষ্ট্রপক্ষ। অন্যদিকে, আসামিপক্ষের দাবি নিজামীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ গণহত্যা, সুপিরিয়র রেসপনসিবিলিটির অভিযোগসহ ’৭১ সালের কোন অপরাধ প্রমাণ করতে পারেনি। তিনি অভিযোগ থেকে অব্যাহতি পাবেন বলে আশা করছে তারা। এদিকে, রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে রাজধানীসহ সারাদেশে নিরাপত্তা জোরদার করেছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলো। ২০১০ সালের ২৫ মার্চ মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠিত হওয়ার পর এখন পর্যন্ত নয়টি মামলার রায় ঘোষণা করা হয়েছে। এর মধ্যে ট্রাইব্যুনাল-১ থেকে তিনটি ও ট্রাইব্যুনাল-২ থেকে ছয়টি মামলার রায় ঘোষণা করা হয়। নিজামী বাদে দুই ট্রাইব্যুনালে তিনটি মামলার রায় ঘোষণা অপেক্ষমাণ রয়েছে। এর মধ্যে ট্রাইব্যুনাল-১ এ আছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক নেতা মোবারক হোসেন ও ফরিদপুর বিএনপির নেতা পলাতক জাহিদ হোসেনের মামলার রায়। আর ট্রাইব্যুনাল-২ এ রায় ঘোষণার অপেক্ষায় আছে জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য মীর কাসেম আলীর মামলা। এছাড়া সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে শুনানি শেষে রায়ের অপেক্ষায় আছে জামায়াতের নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মামলা। এখন পর্যন্ত যুদ্ধাপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল কাদের মোল্লার। দ্বিতীয় দফায় যুক্তিতর্ক শেষে গত ২৪ মার্চ নিজামীর মামলাটি রায় ঘোষণা অপেক্ষমাণ রাখেন ট্রাইব্যুনাল। এর আগে সাবেক চেয়ারম্যান বিচারপতি এটিএম ফজলে কবীরের নেতৃত্বাধীন ট্রাইব্যুনাল-১ গত বছরের ১৩ নভেম্বর নিজামীর মামলার কার্যক্রম শেষে রায় ঘোষণা অপেক্ষমাণ রেখেছিলেন। বিচারপতি এটিএম ফজলে কবীরের চাকরির বয়সসীমা পূর্ণ হওয়ায় তিনি গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর অবসর নেন। সেই থেকে চেয়ারম্যানের পদটি শূন্য ছিল। গত ২৩ ফেব্রুয়ারি ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয় বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিমকে। তিনি দায়িত্ব গ্রহণের পর ১০ মার্চ থেকে এ মামলায় নতুন করে যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের দিন ধার্য করেন। এরপর তিন কার্যদিবসে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করে রাষ্ট্রপক্ষ। অন্যদিকে, গত ১৩ মার্চ থেকে পাঁচ কার্যদিবসে নিজামীর পক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলাম ও মিজানুল ইসলাম। উল্লেখ্য, একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় হত্যা, লুট, ধর্ষণ, উস্কানি ও সহায়তা, পরিকল্পনা ও ষড়যন্ত্র এবং বুদ্ধিজীবী হত্যার মতো ১৬টি অভিযোগে বিচার হচ্ছে নিজামীর। ২০১০ সালের ২৯ জুন মতিউর রহমান নিজামীকে একটি মামলায় গ্রেফতারের পর একই বছরের ২ আগস্ট তাকে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়। এরপর ২০১১ সালের ১১ ডিসেম্বর জামায়াতের আমিরের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ উপস্থাপন করে ট্রাইব্যুনালের রাষ্ট্রপক্ষ। ২৮ ডিসেম্বর আদালত অভিযোগ আমলে নেয়। অভিযোগ গঠনের বিষয়ে শুনানি শেষে ২০১২ সালের ২৮ মে নিজামীর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের ১৬টি অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে ট্রাইব্যুনাল-১ এ তার বিচার শুরু হয়। অভিযোগ গঠনকালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগের সঙ্গে ১৬ নম্বর অভিযোগে বুদ্ধিজীবী হত্যা যোগ হয়েছে। ঐ ২৬ আগস্ট থেকে এ মামলায় সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু হয়। তদন্ত কর্মকর্তা আব্দুর রাজ্জাক খানসহ এ মামলায় রাষ্ট্রপক্ষে সাক্ষ্য দেন মোট ২৬ জন। আর নিজামীর পক্ষে তার ছেলে মো. নাজিবুর রহমানসহ মোট চারজন সাফাই সাক্ষ্য দেন। সাক্ষ্য ও জেরা শেষে গত বছরের ৩ থেকে ৬ নভেম্বর রাষ্ট্রপক্ষ যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করে। এরপর ৭ নভেম্বর থেকে চার দিন আসামিপক্ষের যুক্তিতর্কের জন্য দিন ধার্য থাকলেও নিজামীর আইনজীবীরা না আসায় ১৩ নভেম্বর রায় ঘোষণা অপেক্ষমাণ রাখেন ট্রাইব্যুনাল। পরে অবশ্য আসামিপক্ষের আবেদনে যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের অনুমতি দেন ট্রাইব্যুনাল। আর দ্বিতীয় দফায় যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শুরু হয় চলতি বছরের ১০ মার্চ থেকে। নিজামীর বিরুদ্ধে যত অভিযোগ মতিউর রহমান নিজামীর বিরুদ্ধে একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় হত্যা, লুট, ধর্ষণ, উস্কানি ও সহায়তা, পরিকল্পনা ও ষড়যন্ত্র এবং বুদ্ধিজীবী হত্যার ১৬টি অভিযোগ গঠন করে ট্রাইব্যুনাল। যদিও রাষ্ট্রপক্ষ ১৫টি অভিযোগে তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করেছে ট্রাইব্যুনালে। প্রথম অভিযোগে বলা হয়েছে, পাবনা জিলা স্কুলের প্রধান শিক্ষক মাওলানা কছিমুদ্দিনকে একাত্তরের ৪ জুন পাকিস্তানি সেনারা অপহরণ করে নূরপুর পাওয়ার হাউসের ক্যাম্পে নিয়ে যায়। সেখানে নিজামীর উপস্থিতিতে তার ওপর নির্যাতন চালানো হয়। ১০ জুন তাকে ইছামতী নদীর পাড়ে আরো কয়েক জনের সঙ্গে হত্যা করা হয়। দ্বিতীয় অভিযোগে বলা হয়েছে, একাত্তরের ১০ মে পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার বাউশগাড়ি গ্রামের রূপসী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। স্থানীয় শান্তি কমিটির সদস্য ও রাজাকারদের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত ঐ সভায় ছিলেন নিজামী। সভার পরিকল্পনা অনুসারে ১৪ মে দু’টি গ্রামের প্রায় সাড়ে ৪৫০ জনকে পাকিস্তানি সেনারা হত্যা করে। এছাড়া প্রায় ৩০-৪০ জন নারীকে ধর্ষণ করে রাজাকাররা। তৃতীয় অভিযোগে বলা হয়েছে, একাত্তরের মে মাসের শুরু থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত মোহাম্মদপুরের ফিজিক্যাল ট্রেনিং ইনস্টিটিউটে নির্যাতন, হত্যা, ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। নিজামী ঐ ক্যাম্পে নিয়মিত যাতায়াত ও মানবতাবিরোধী অপরাধের ষড়যন্ত্র করতেন। চতুর্থ অভিযোগ হলো পাবনার করমজা গ্রামে হত্যা, ধর্ষণ ও লুটের ঘটনায় নিজামীর সম্পৃক্ততা। পঞ্চম অভিযোগ হলো, একাত্তরের ১৬ এপ্রিল নিজামীর সহযোগিতায় পাকিস্তানি সেনারা ঈশ্বরদী উপজেলার আড়পাড়া ও ভূতের বাড়ি গ্রামে হামলা চালিয়ে বাড়িঘর লুণ্ঠন ও অগ্নিসংযোগ করে। এ সময় ২১ জন নিরস্ত্র মানুষ মারা যায়। ষষ্ঠ অভিযোগ হলো একাত্তরের ২৭ নভেম্বর ধুলাউড়া গ্রামে ৩০ জনকে হত্যায় নেতৃত্ব ও সম্পৃক্ততার। সপ্তম অভিযোগ হলো একাত্তরের ৩ ডিসেম্বর সোহরাব আলী নামে এক ব্যক্তিকে নির্যাতন ও হত্যার। অষ্টম অভিযোগে বলা হয়েছে, ঐ সালের ৩০ আগস্ট নিজামী নাখালপাড়ার পুরোনো এমপি হোস্টেলে গিয়ে আটক রুমী, বদি, জালালদের হত্যার জন্য পাকিস্তানি সেনাদের প্ররোচনা দেন। নবম অভিযোগ হলো ৩ ডিসেম্বর হিন্দু অধ্যুষিত বিশালিখা গ্রামে ৭০ জনকে গণহত্যার। দশম অভিযোগে বলা হয়েছে, নিজামীর নির্দেশে রাজাকাররা পাবনার সোনাতলা গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা অনিল চন্দ্র কুণ্ডুর বাড়িতে আগুন দেয়। ১১ নম্বর অভিযোগে বলা হয়েছে, একাত্তরের ৩ আগস্ট চট্টগ্রাম মুসলিম ইনস্টিটিউটে ইসলামী ছাত্রসংঘ আয়োজিত সভায় নিজামী উস্কানিমূলক বক্তব্য দেন। ২২ আগস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক একাডেমি হলে আল মাদানীর স্মরণসভায় উস্কানিমূলক বক্তব্যের জন্য ১২ নম্বর, ৮ সেপ্টেম্বর প্রতিরক্ষা দিবস উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনের সামনে ছাত্রসংঘের সভায় বক্তব্যের জন্য ১৩ নম্বর, ১০ সেপ্টেম্বর যশোরে রাজাকারদের প্রধান কার্যালয়ে উস্কানিমূলক বক্তব্যের জন্য ১৪ নম্বর অভিযোগ গঠন করা হয়েছে। ১৫ নম্বর অভিযোগে বলা হয়েছে, একাত্তরের মে মাস থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত সাঁথিয়া পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ে রাজাকার ক্যাম্প ছিল। নিজামী ও রাজাকার সামাদ মিয়ার ষড়যন্ত্রে সেখানে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হয়। ১৬ নম্বর অভিযোগ বুদ্ধিজীবী নিধনের। জামায়াতের তত্কালীন ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘ ও আলবদর বাহিনীর প্রধান হিসেবে ওই গণহত্যার দায় নিজামীর ওপর পড়ে। নিজামীর বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের আদেশে বলা হয়, ১৯৪৩ সালে পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার মোহাম্মদপুর গ্রামে জন্ম নেয়া নিজামী ১৯৬৩ সালে কামিল পাস করেন। জামায়াতের তখনকার ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘের পূর্ব পাকিস্তান শাখার প্রধান হিসাবে একাত্তরে তিনি ছিলেন আলবদর বাহিনীরও প্রধান। স্বাধীনতাকামী বাঙালির ওপর দমন-পীড়ন চালাতে পাকিস্তানি বাহিনীকে সহযোগিতার জন্য গঠিত রাজাকার বাহিনী ও শান্তি কমিটিতে তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়। দিনাজপুরে ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যানের পৈতৃক বাসভবনের সামনে কড়া নিরাপত্তা দিনাজপুরের স্টাফ রিপোর্টার জানান, মামলার রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে দিনাজপুর শহরে ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যানের পৈতৃক বাসভবনের সামনে কড়া নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে পুলিশ। দিনাজপুরের পুলিশ সুপার মো. রুহুল আমিন জানান, দিনাজপুর শহরের মুন্সিপাড়ায় চেয়ারম্যানের পৈতৃক বাসভবনের সামনে গতকাল সোমবার বিকাল থেকে পর্যাপ্তসংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। শহরের পাহাড়পুরস্থ জেলা জামায়াতের কার্যালয়সহ অন্যান্য স্থানেও অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। পুলিশ সুপার জানান, যে কোন ধরনের নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড প্রতিহত করার জন্য দিনাজপুর শহরসহ বিভিন্ন উপজেলায় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রাখা হয়েছে। নিজামীকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে নেয়া হয়েছে গাজীপুর প্রতিনিধি জানান, গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ ীয় হাই-সিকিউরিটি কারাগারে আটক জামায়াতের আমির মতিউর রহমান নিজামীকে ঢাকা কেন্দ ীয় কারাগারে নেয়া হয়েছে। গাজীপুর কারাগার সূত্র জানায়, সোমবার বিকাল ৪টার দিকে বিশেষ পুলিশী প্রহরায় নিজামীকে ঢাকা কেন্দ ীয় কারাগারের উদ্দেশে পাঠানো হয়েছে। জানা গেছে, নিজামী হাই-সিকিউরিটি কারাগারের নীলগিরি সেলের তৃতীয় তলায় বন্দী ছিলেন। মানবতা বিরোধী অপরাধের মামলা ছাড়াও আলোচিত দশ ট্রাক অস্ত্র মামলায় তিনি মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত কয়েদী।