কালো মানিকের গল্প

আপডেট : ২৪ জুন ২০১৪, ১৯:২৭
এডসন অ্যারান্তেস দো নাসিমেন্তো। এই নামটি কি তোমরা কখনও শুনেছ? এই নামের কোনো মানুষকে তোমরা চেন বলে কি মনে হয়? কী একটা খটমট নাম, তাই না? মজার বিষয় হলো এই মানুষটির আসল নাম জানলে কিন্তু তোমরা সব্বাই চিনতে পারবে। তিনি যে আর কেউ নন, ফুটবল বিশ্বের অলিখিত সম্রাট পেলে! বিখ্যাত বিজ্ঞানি টমাস আলভা এডিসনের নাম থেকেই তার নামের ‘এডসন’ অংশটি বেছে নেন তার বাবা-মা। তার মূল খটমট নামটির বদলে ছোটবেলায় তাকে ডাকা হতো ‘ডিকো’ নামে। তারপর একটা সময় এসে তার নাম হয়ে যায় পেলে। সেটার ইতিহাসও বেশ মজার। ভাস্কো দা গামা ক্লাবে তার পছন্দের ফুটবলার ছিলেন গোলরক্ষক বিলে। ‘বিলে’ নামটিকে পেলে নিজেই একটু বদলে ডাকতেন ‘পিলে’ বলে। তার সতীর্থরা এই ‘পিলে’ থেকেই তার নাম দিয়ে দেন পেলে। এখন তো পেলে নামটি শুনলেই সারা পৃথিবীতে মানুষ কেবল একজনকেই চিনে থাকেন, যিনি তার পায়ের জাদু দিয়ে বিশ্বকে মাতিয়ে রেখেছেন দুই দশকেরও বেশি সময়। বিশ্ব ফুটবলের কত যে রেকর্ড ব্রাজিলিয়ান এই ফুটবলারের দখলে রয়েছে, তার কোনো ইয়াত্তা নেই। ফুটবলের এই মহান জাদুকর জন্মগ্রহণ করেন ১৯৪০ সালের ২১ অক্টোবর। তার বাবা ডনডিনহো ছিলেন একজন ফুটবলার। তার মায়ের নাম সেলেস্তে অ্যারানতেস। ব্রাজিলের ত্রেস কোরাকোয়েস শহরের এক বস্তিতে তার জন্ম হলেও তিনি বেড়ে উঠেছেন সাও পাওলোর বাউরু নামের এক শহরে। তার ফুটবলের হাতেখড়িও এখানেই। পেলের পরিবার ছিল ভীষণ দরিদ্র। পেলের বাবা যে উপার্জন করতেন, তা দিয়ে তাদের সংসার চলত না। যে কারণে ছোটবেলায় পেলেকেই কাজ করতে হয়েছে চায়ের দোকানে। শুধু তাই নয়, রেল স্টেশনে ঝাড়ু দেওয়ার কাজ থেকে শুরু করে জুতা পরিস্কার করার কাজও করতে হয়েছে তাকে! তবে ছোটবেলা থেকেই পেলের স্বপ্ন ছিল ফুটবলার হওয়ার। যত কাজই তিনি করেছেন, সবসময়ই তিনি মনে মনে ভেবেছেন যে বড় হয়ে তিনি বিশ্বের সেরা খেলোয়াড়দের একজন হবেনই। অথচ সত্যিকারের একটি ফুটবল কেনার মতো টাকাও ছিল না তার পরিবারের। ছোটবেলা তাই মোজার মধ্যে ফেলে দেওয়া খবরের কাগজ কুড়িয়ে এনে ভরে তৈরি করতেন ফুটবল। বাংলাদেশে তার জন্ম হলে হয়ত জাম্বুরা দিয়েই তাকে ছোটবেলায় ফুটবল খেলতে হতো! তবে সত্যি ফুটবল দিয়ে খেলার সুযোগ যখন মিলল, তখন কিন্তু ঠিকই পেলে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন তার অসামান্য প্রতিভার কথা। একসময় তিনি বাউরু অ্যাথলেটিক ক্লাবের জুনিয়র দলে খেলা শুরু করেন। রেডিয়াম নামের একটি দলের হয়ে ইনডোর ফুটবলও খেলেন তিনি। এসব ক্লাবে খেলার সময়েই তার পায়ের জাদুতে মুগ্ধ হয়েছেন দর্শকরা। ওই সময়ে ব্রাজিলের বিখ্যাত ফুটবলার ছিলেন ওয়ালডেমার ডি ব্রিটো। তিনি পেলের খেলা দেখে বলেছিলেন, ‘এই ছেলেটি একদিন বিশ্বের সেরা ফুটবলার হবে।’ তিনি পেলেকে ১৫ বছর বয়সে নিয়ে আসেন সান্তোসের কোচ লুলার কাছে। ১৯৫৬ সালের ৭ সেপ্টেম্বর মাত্র ১৬ বছর বয়সে প্রথম তিনি খেলতে নামলেন সান্তোসের হয়ে। ওই ম্যাচেই গোল করে তিনি সর্বকনিষ্ঠ ফুটবলার হিসেবে গোল করার রেকর্ডটি নিজের করে নেন। তারপর আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। সান্তোসের পর ব্রাজিল জাতীয় দলের জার্সি গায়েও চমক অব্যাহত রাখলেন তিনি। সারা পৃথিবীকে মুগ্ধ করে একে একে ১২৮১টি গোলের মালিক হয়ে গেলেন এই ফুটবল সম্রাট, জিতলেন তিন তিনটি বিশ্বকাপ। ১৯৬৯ সালের ১৯ নভেম্বর ভাস্কো দা গামা ক্লাবের বিপক্ষে এক ম্যাচে তিনি তার সহস তম গোলটি করেন। সান্তোসে তাই ১৯ নভেম্বরকে এখনও ‘পেলে দিবস’ হিসেবে পালন করা হয়। দেখতে কালো বলে ব্রাজিলিয়ানরা আদর করে পেলেকে ‘পেরোলা নেগরা’ বা ‘কালো মানিক’ বলে ডাকে। হাজার গোলের মতো হাজার হাজার পুরস্কারও রয়েছে ফুটবলের এই কালো মানিকের ঘরে। এই কালো মানিক বুঝিয়ে দিয়েছেন—বড় হতে চাইলে দ্রারিদ্র্য কোনো বাধা নয়, প্রয়োজন কঠোর পরিশ্রম আর অধ্যাবসায়।