বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে উন্নয়নের ছোঁয়া সর্বত্রই পরিলক্ষিত হচ্ছে। জমির স্বল্পতা এবং অন্যান্য ব্যবসায়িক বিবেচনায় অভিজাত এলাকাসহ গুরুত্বপূর্ণ এলাকাসমূহে পাল্লা দিয়ে সুউচ্চ ভবন নির্মিত হয়েছে এবং হচ্ছে। কিন্তু রানা প্লাজার দুর্ঘটনা কিংবা নিমতলী ও চুড়িহাট্টায় অগ্নি দুর্ঘটনা প্রযুক্তির অভাব বা অপরিকল্পিত নির্মাণ বলে বিবেচনা করা যেতে পারে। কিন্তু আধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন বনানীস্থ এফআরটাওয়ার, গুলশান মার্কেট, বসুন্ধরা মার্কেটে অগ্নিকাণ্ডের ব্যাপ্তি এবং প্রাণহানীর বিষয় মেনে নেওয়া যায় না। আমার মতে এর মূল বিষয় এখনো তেমনি গুরুত্বের সহিত নেওয়া হচ্ছে না। যেমন ইমারত নির্মাণের সংশ্লিষ্ট সকল শাখার অভিজ্ঞতা ও শিক্ষাগত যোগ্যতাসম্পন্ন প্রকৌশলী দ্বারা নকশা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন এবং সর্বোপরি জবাবদিহিতার আওতায় আনয়নে বিষয়টি নিশ্চিত হচ্ছে না। উদাহরণস্বরূপ উল্লেখ করা যেতে পারে, ‘এফআর টাওয়া’-এর অগ্নিকাণ্ড দুর্ঘটনার পর কমিটি হয়েছে। প্রিন্ট মিডিয়া এবং ইলেকট্রিক মিডিয়ার মাধ্যমে জানা গেল অগ্নি দুর্ঘটনা প্রতিরোধ ব্যবস্থা যথেষ্ট ছিল না। ফায়ার এক্সিট যথার্থ ছিল না। এ যে যথার্থ ছিল না, দায়িত্ব কোন বিভাগের? ফায়ার সার্ভিস সিভিল ডিফেন্স-এর ‘ছাড়পত্র’, বৈদ্যুতিক লাইসেন্সিং বোর্ড কর্তৃক ছাড়পত্র ব্যতিরেকে ডেসকো/ডিপিডিসি কোনো ভবনে বিদ্যুত্ সংযোগ প্রদান করে না। এক্ষেত্রে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স হতে ছাড়পত্র পেল কিভাবে? বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। তবে এক্ষেত্রে সাংঘর্ষিক নীতিমালা রয়েছে। বিদ্যুত্ সংযোগের আবেদনের সঙ্গে ফায়ারের ‘ছাড়পত্র’ দাখিল করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। অথচ ফায়ারের যন্ত্রপাতি কার্যকারিতা পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য পূর্বেই বিদ্যুত্ সংযোগ প্রয়োজন। যার জন্য বিদ্যুত্ বিভাগ ও ফায়ার সার্ভিস বিভাগের মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন।
ইমারত নির্মাণের সহিত আর্কিটেক্ট, সিভিল ইঞ্জিনিয়ার, ইলেকট্রিক্যাল ও মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারগণের ডিজাইন ও বাস্তবায়নের সহিত সরাসরি সম্পর্ক থাকা অপরিহার্য কিন্তু বাস্তবে কি হচ্ছে, ভূমি মালিকগণ নির্মাণের প্রথমে আর্কিটেক্ট এবং পরবর্তীকালে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারদের নির্মাণ কাজের সহিত সংযুক্ত করে থাকেন। এক্ষেত্রে প্রায় ৯০ ভাগ সুউচ্চ ভবনে শিক্ষাগত যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ইলেকট্রো মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার নির্মাণের দায়িত্ব প্রদানসহ নকশা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের দায়িত্ব প্রদান করা হয়ে থাকে না। এক্ষেত্রে মালিকগণের অজ্ঞতাই অনেকাংশে দায়ী। আর্কিটেক্ট নকশা, ষ্টাকচারাল নকশা বিষয় গুরুত্ব দেওয়া হলেও, কোনো বৈদ্যুতিক যান্ত্রিক নকশার ব্যাপারে গুরুত্ব দেওয়া হয় না। যার ফলশ্রুতিতে নামিদামি ভবনে বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট, অগ্নিকাণ্ড, লিফট দুর্ঘটনা প্রায়শ পরিলক্ষিত হয়। অতিসম্প্রতি এয়ারকুলার হতে অগ্নিকাণ্ডও পরিলক্ষিত হচ্ছে।
নান্দনিক বহুতল সুউচ্চ ভবনের আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, ইমারতের মেয়াদোত্তীর্ণের সময় ন্যূনতমপক্ষে ৭৫ বছর, অথচ বৈদ্যুতিক যান্ত্রিক কাজের আয়ুষ্কাল প্রকারভেদে ছয় বছর হতে ২০ বছর। ইমারত রক্ষণাবেক্ষণ কাজ ব্যাহত হলে, ইমারত ভেঙে যাবে না। জানমালের কোনো ক্ষতি হবে না। কিন্তু বৈদ্যুতিক ও যান্ত্রিক প্রতিনিয়ত রক্ষণাবেক্ষণ না করলে শর্টসার্কিট, বৈদ্যুতিক দুর্ঘটনা অগ্নিকাণ্ড, লিফট দুর্ঘটনার মতো প্রভৃতি ঘটনা ঘটার শতভাগ সম্ভাবনা থেকে যায়। ইমারত চাকচিক্য করার জন্য প্রায় প্রতি বছর রঙ করানো হলেও বৈদ্যুতিক যান্ত্রিক যন্ত্রপাতিসমূহ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয় না। মেয়াদোত্তীর্ণ বৈদ্যুতিক কন্ট্রোল নিয়ন্ত্রণ ডিভাইসসহ ওয়্যারিংসমূহ পরিবর্তন করা হয় না। প্রত্যেক সুউচ্চ ভবনে রক্ষণাবেক্ষণের সিভিল ইঞ্জিনিয়ার নিয়োজিত থাকলেও কোনো বিদ্যুত্ ও যান্ত্রিক প্রকৌশলী নিয়োজিত করা হয়নি। যার ফলশ্রুতিতে ওয়্যারিং যথার্থ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়নি। ফায়ারের যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি পরীক্ষা হয় না। যার জন্য প্রত্যেক সুউচ্চ ভবনে শিক্ষাগত যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতাসম্পন্ন বৈদ্যুতিক ও যান্ত্রিক প্রকৌশলী নিয়োজিত করা অপরিহার্য।
পরিশেষে বলতে হয়, ইমারত নির্মাণের সহিত সংশ্লিষ্ট সকল শাখার যেমন আর্কিটেক্ট ও সিভিল ইঞ্জিনিয়ার-এর পাশাপাশি বৈদ্যুতিক ও যান্ত্রিক প্রকৌশলী নিয়োজিত করা বাধ্যতামূলক। নির্মাণ কাজের শুরুতে অর্থাত্ নকশা প্রণয়নকালে উন্নত বিশ্বে পূর্ত পরামর্শক (Civil Consultant)-এর পাশাপাশি বৈদ্যুতিক যান্ত্রিক পরামর্শক (M&E Consultant) নিয়োজিত করে থাকেন। কারণ নির্মাণ এক সমন্বিত প্রকৌশলী শাখার উপর নির্ভরশীল। বিএনবিসি অনুযায়ী নকশা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন বাধ্যতামূলক। এক্ষেত্রে মালিকসহ, যে কোনো দুর্ঘটনার সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীকে জবাবদিহিতায় আনয়ন করা। নিয়োজিত রক্ষণাবেক্ষণ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য প্রত্যেক সুউচ্চ ভবনে বৈদ্যুতিক যান্ত্রিক প্রকৌশলী নিয়োজিত করা অপরিহার্য। যার জন্য নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ কাজের সহিত সংশ্লিষ্ট সকল শাখার প্রকৌশলীগণের সমম্বয়ে নিরাপদ ভবন নির্মাণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।
n লেখক :তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী, গণপূর্ত ই/এম সার্কেল, চট্টগ্রাম
