মৃত্যুর কারবারিদের রুখতেই হবে

আপডেট : ২৪ জুন ২০১৪, ২১:৩০
বছরের এই সময়টা হলো রসালো ফলের মৌসুম। তাই বিভিন্ন সুস্বাদু ও সুরুচিকর দেশীয় ফলের সমাহার ঘটেছে ফলের দোকানগুলোতে। রাস্তার পাশের ফলের দোকানিরা ক্রেতাদের আকৃষ্ট করতে রঙ-বেরঙের ফলগুলো সাজিয়ে রাখছে যা দেখলেই ছেলে-বুড়ো নির্বিশেষে সব বয়সী মানুষের জিভে জল আসে। কিন্তু কে না জানে ফরমালিন মিশ্রিত নানা রঙের ফলগুলো দেখতে সুন্দর হলেও মানবদেহের জন্য তা কতোটা ক্ষতিকর। আম-জাম, লিচু-কলা থেকে শুরু করে কাঁচাবাজারের টমেটো, মাছ পর্যন্ত কিসে নেই বিষাক্ত এই ফরমালিন! ফরমালিন মিশ্রিত মাছ ও শাকসবজি সারা বছর বাজারে বিক্রি হলেও বছরের এই সময়টা আলোচিত ফরমালিন ও বিভিন্ন ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ মিশ্রিত মৌসুমি ফলের কারণে। ফলের বাগানের মালিকরা অধিক লাভের আশায় আম ও লিচুর কৃত্রিম রঙ বাড়াতে বাগানেই নাকি ফলের ওপর রাসায়নিক ছিটিয়ে তারপরে বাজারজাত করেন। ‘বাজার থেকে কিনে ফল খাওয়া মানেই বিষ খাওয়া’—এ যেন এক ভয়ানক বাস্তবতা! কার্বাইড ছিটিয়ে পাকানো ফল খেয়ে আমাদের শরীরে সৃষ্টি হচ্ছে বিষক্রিয়া। মাছে ফরমালিন, ফলে কার্বাইড, শাকসবজিতে বিষাক্ত কীটনাশক, চালে ক্রোমিয়াম, গরু-ছাগলকে মোটাতাজা করতে ব্যবহূত হচ্ছে স্টেরয়েড। শুঁটকিতেও ব্যবহূত হচ্ছে বিষাক্ত কীটনাশক। বিশেষ করে আম, লিচু, আপেল, কলা ইত্যাদি ফল সুরক্ষার জন্য যেসব রাসায়নিক স্প্রে করা হয়, তা স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এতে করে মানুষের কিডনি, লিভার, পরিপাকতন্ত্র, হূদযন্ত্র, শ্বাসতন্ত্র ইত্যাদি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের কার্যক্ষমতা কমে যাচ্ছে। এমনকি এর ফলে মানবদেহে প্রাণনাশক ক্যান্সার রোগের প্রবণতাও বাড়ছে। বিশেষ করে শিশু-কিশোররা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। গত বছর ফরমালিনযুক্ত লিচু খেয়ে ১৪টি শিশু তাত্ক্ষণিকভাবে মারা গেলো, তাতেও যেন মানুষের সচেতনতা বাড়েনি! জীবনের জন্য অপরিহার্য যে পানি তাও এখন নিরাপদ নয়। টাকা দিয়ে দোকান থেকে বোতলজাত পানি কিনে খেলেও লাভ নেই। সেখানেও রয়েছে মাত্রাতিরিক্ত ভেজাল। এতে পানিবাহিত রোগের কারণে প্রতিবছর হাজার হাজার মানুষ মৃত্যুমুখে পতিত হচ্ছে। ফরমালিন মিশ্রিত যে তাজা মাছ (!) বাজারে বিক্রি হচ্ছে তা খেয়ে আমাদের হার্ট, লিভার ও মস্তিষ্কসহ দেহের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে নানা মরণব্যাধির সৃষ্টি হচ্ছে। একইসঙ্গে ফরমালিন ও কার্বাইডসহ রাসায়নিক পর্দাথ মিশ্রিত খাবার খেয়ে আমাদের দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও কমে যাচ্ছে। ভেজালমুক্ত খাবার এখন আর নগরবাসীর কপালে জুটছে না। অল্প সময়ের মধ্যে মুরগির মাংস অধিক বৃদ্ধি করতে যে স্টেরয়েড ব্যবহূত হচ্ছে তাও স্বাস্থ্যের জন্য হুমকিস্বরূপ। ওষুধেও রয়েছে ভেজাল। তবু ওষুধের গুণগত মান ও দাম নিয়ন্ত্রণে নেই কারো মাথাব্যথা। দেশের মানুষ এই পরিস্থিতি থেকে রেহাই পেতে চায়। তাছাড়া সামনে রমজান আসছে। খাবারে ভেজাল প্রতিরোধে এই মুহূর্তে পৃথিবীর উন্নত দেশের আদলে কার্যকর ও স্থায়ী পদক্ষেপ নেওয়া দরকার। বিএসটিআই-কে তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালনে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে তাগাদা দিতে হবে। মানুষের জীবন ও সুস্বাস্থ্য বজায় রাখার তাগিদে প্রশাসনকে অসাধু ব্যবসায়ী ও উত্পাদকের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। পাইকারি আড়তে বা মূল উত্পাদনকেন্দ্রগুলোতে নজরদারি বাড়াতে হবে। কীটনাশকের ব্যবহারে মানবদেহের যে মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে সে ব্যাপারে প্রান্তিক কৃষক-চাষিদের সচেতন করে তুলতে হবে। ফরমালিন ও বিষাক্ত কীটনাশক আমদানি ও ব্যবহারের ওপর আইনি বিধি-নিষেধ আরোপ করা দরকার। আইনি পদক্ষেপের পাশাপাশি রেডিও-টেলিভিশনের মাধ্যমে ব্যাপক জনসচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। তবেই সম্ভব হবে খাবারে ভেজাল প্রতিরোধ করা। ঢাকা