চিকিত্সকদের মফস্বলে পাঠাতে ব্যর্থ প্রশাসন

আপডেট : ২৪ জুন ২০১৪, ২২:০৫
গ্রামীণ মানুষকে চিকিত্সা সেবা দিতে প্রধানমন্ত্রী ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী বার বার চিকিত্সকদের প্রতি নির্দেশনা দিলেও মফস্বলে থাকছেন না চিকিত্সকরা। এই নির্দেশনা বাস্তবায়নের দায়িত্ব যাদের, সেই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদফতরও চিকিত্সকদের গ্রামে রাখতে সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ। কোন চিকিত্সককে রাজধানী থেকে মফস্বলে বদলি করা হলে, কিছুদিন পর তিনি বিভিন্নভাবে তদ্বির করে ফিরে আসেন ঢাকায়। এই চিকিত্সকরা গ্রামে চাকরি করতে না চাইলেও মফস্বলের বেসরকারি ক্লিনিকে ঠিকই প্রাইভেট প্র্যাকটিস করেন। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, যে সরকার ক্ষমতায় থাকে সেই সরকারের চিকিত্সকদের সংগঠনে ভিড় জমান চিকিত্সকরা। তারপর শুরু হয় দলের নাম ভাঙানো। এটা বিএনপি আমলে হয়েছে, এখনও হচ্ছে। বিএনপি সরকারের আমলে ডক্টরস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) সুপারিশে বিএনপি-জামায়াতপন্থি চিকিত্সকদের গ্রামে পাঠানো যায়নি। বর্তমান সরকারের সময়ও স্বাধীনতা চিকিত্সক পরিষদের (স্বাচিপ) জন্য তাদের পছন্দের চিকিত্সককে গ্রামে পাঠানো যাচ্ছে না। সরকার বদলের সঙ্গে সঙ্গে ড্যাব ও স্বাচিপের নিয়ন্ত্রণে চলে যায় রাজধানীর সব হাসপাতাল। এরপর মন্ত্রণালয় ও অধিদফতর চাইলেও তাদের পাঠাতে পারেন না গ্রামে। দলীয় পরিচয়ে, ঘুষের বিনিময়ে ও তদবিরের মাধ্যমে চিকিত্সকরা প্রশাসনের আদেশ বাতিল করে চলে আসেন ঢাকায়। দলীয় পরিচয়ের বাইরে আরেক শ্রেণির চিকিত্সক রাজধানীতে বছরের পর বছর থাকছেন। তারা বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে মেডিক্যাল অফিসার হিসাবে যোগদান করে একই পদেই অবসরে যান। তাদের অনেকে প্রফেসরও হয়েছেন। এরা তদ্বির-লবিং করে, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদফতরে নিয়মিত ঘুষ দিয়ে রাজধানীতে স্থায়ীভাবে থাকছেন। তাদের যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা নিয়েও প্রশ্ন আছে। এই দুই শ্রেণীর চিকিত্সকদের কারণে যারা মেধা, যোগ্যতা, অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ও জ্যেষ্ঠ তারা ভালো জায়গায় বদলি হতে পারেন না। কখনই আসতে পারেন না রাজধানীতে। এসব কারণে স্বাস্থ্য প্রশাসন মফস্বলে চিকিত্সকদের রাখতে পারেন না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সমপ্রতি চিকিত্সকদের উদ্দেশে বলেছেন, মফস্বলে কমপক্ষে তিন বছর না থাকলে পদোন্নতি দেয়া হবে না। চাকরিও হারাতে হতে পারে। প্রধানমন্ত্রীর এই কঠোর হুঁশিয়ারির পর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদফতর বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে নিয়ে মফস্বলের চিকিত্সকদের উপর মনিটরিং করছেন। এদিকে চিকিত্সক নেতারা অভিযোগ করেন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক শ্রেণীর কর্মকর্তার অতীত দুর্নীতি-অনিয়ম, নিয়োগ, বদলি বাণিজ্য ও কেনাকাটার নামে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার কথা প্রায় সবাই জানে। এমন কিছু কর্মকর্তা আছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরেও। ৫ জানুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের স্বাস্থ্যমন্ত্রী নিযুক্ত হন বর্তমান বিরোধী দলীয় নেত্রী রওশন এরশাদ। মন্ত্রণালয়ের একটি অনুষ্ঠানে অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা রওশন এরশাদকে মা বলে সম্বোধন করেন। এতে বিব্রত হন স্বয়ং রওশন এরশাদই। এনিয়ে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয় স্বাস্থ্য বিভাগে। সেই কর্মকর্তা এখনো স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে বহাল তবিয়তে তার কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। এ ধরনের আরো কয়েকজন কর্মকর্তা অধিদপ্তরে আছেন। তেল মর্দনে অভ্যস্ত এই ধরনের কর্মকর্তা দিয়ে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা বাস্তবায়ন হবে কিনা তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। প্রসঙ্গত, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০০৯ সালে নার্সদের চাকরিতে যোগদানের সময় পদমর্যাদা দ্বিতীয় শ্রেণীর করার ঘোষণা দেন। এ ঘোষণার পর সে অনুযায়ী আর্থিক সুযোগ-সুবিধা নার্সরা পেয়ে আসছেন। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের পর ৫ বছর পার হলেও নার্সদের নিয়োগবিধি চূড়ান্ত হয়নি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দুর্নীতিবাজ আমলাদের জন্য। রাজধানীর ১০টি সরকারি হাসপাতালের কর্তৃপক্ষ বলেন, এই সকল হাসপাতালে কর্মরত বেশিরভাগ চিকিত্সকই লেজুড়ভিত্তিক রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। চিকিত্সা শিক্ষা থেকে তাদের বেশি আগ্রহ আর্থিক দেনদরবার ও রাজনীতি কর্মকাণ্ডের প্রতি। এই কারণে প্রায়ই রাজধানীর সরকারি হাসপাতালে ভুল চিকিত্সার অভিযোগ উঠছে। কারণ রোগীর সেবায় তাদের মন নেই। তাদের জন্য মেডিক্যাল কলেজের ছাত্র-ছাত্রীরাও সুশিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। কর্তৃপক্ষ বলেন, চিকিত্সকরা থাকবেন গবেষণা নিয়ে ব্যস্ত। সারা বিশ্বে চিকিত্সকরা তাই করছেন। বাংলাদেশের চিত্র ভিন্ন। রাজনীতি নিয়েই তারা বেশি ব্যস্ত। কেউ কেউ পদ ধরে রাখার জন্য যা যা দরকার তাই করে থাকেন। এই সকল চিকিত্সককে দিয়ে কেমন চিকিত্সা সেবা পাওয়া যাবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। সারাক্ষণ তারা হাসপাতালে খবরদারি করে থাকেন। এর প্রভাব পড়েছে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের ওপরও। তারাও লেজুড়ভিত্তিক রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েছে। তাদের কারণে সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্য প্রশাসন কাজ করতে পারছে না। কর্তৃপক্ষের মতে, চিকিত্সা-শিক্ষা, দেশ ও রোগীদের বৃহত্তর স্বার্থে চিকিত্সকদের লেজুড়ভিত্তিক রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। দলীয় নেতাকর্মী পরিচয়দানকারী চিকিত্সকরা হাসপাতালে কখন আসেন, কখন যান তা কেউ জানে না। তারা জুনিয়র চিকিত্সকদের ওপর চিকিত্সা সেবা কিংবা জটিল অপারেশনের দায়িত্ব ছেড়ে দিচ্ছেন। বৃহস্পতিবার থেকে শনিবার পর্যন্ত রাজধানীর বেশিরভাগ বিশেষজ্ঞ চিকিত্সক মফস্বলে গিয়ে প্রাইভেট প্রাকটিস করে আসছেন বছরের পর বছর ধরে। এ সময় হাসপাতালের যাবতীয় চিকিত্সা ইন্টার্ন ও মেডিক্যাল অফিসাররা দেন। জরুরি প্রয়োজনে পাওয়া যায় না জ্যেষ্ঠ চিকিত্সকদের। এ অবস্থায় কোন রোগীর মৃত্যু হলে অভিযোগ ওঠে জুনিয়র চিকিত্সকের ভুল চিকিত্সায় রোগীর মৃত্যু হয়েছে। খুলনার বটিয়াঘাটা, লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জ, কুড়িগ্রামের উলিপুর, বাগেরহাটের ফকিরহাট, নরসিংদীর রায়পুরা, চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা, নাটোরের লালপুর ও পাবনার আটঘরিয়া সংবাদদাতা জানান, তাদের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কাগজকলমে দেখা যায় ৯৮ ভাগ চিকিত্সক উপস্থিত। বাস্তবে পরিস্থিতি ভিন্ন। অথচ তারাই পার্শ্ববর্তী জেলা কিংবা ওই জেলায় রাতদিন প্রাইভেট প্রাকটিস করেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. দীন মো. নুরুল হক বলেন, বর্তমান সরকার গ্রামাঞ্চলের প্রান্তিক মানুষের কাছে চিকিত্সা সেবা পৌঁছে দিয়েছে। ইউনিয়ন সাব-সেন্টার ও কমিউনিটি ক্লিনিকে বসে উন্নত সেবা নেয়ারও ব্যবস্থা চালু রয়েছে। এতসব করার পরও গ্রামাঞ্চলে চিকিত্সা সেবা ব্যাহত হয় যাদের কারণে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে বলে তিনি জানান। স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলেন, তিনি জনগণের প্রতিনিধি। জনগণকে স্বাস্থ্য সেবা দিবেন বলে অঙ্গীকার করেছেন। দরিদ্র জনগণ যাতে ফ্রি চিকিত্সা সেবা পান সেই বিষয়টি সকল হাসপাতালে নিশ্চিত করা হয়েছে। চিকিত্সা প্রদানে আধুনিক প্রযুক্তিও চালু করা হয়েছে। চিকিত্সকদেরও গ্রামাঞ্চলে থাকার সুযোগ-সুবিধা দেয়া হয়েছে। এত সুযোগ-সুবিধা দেয়ার পরও চিকিত্সকরা কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকবেন এটা কোনভাবেই মেনে নেয়া হবে না। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী কর্মস্থলে উপস্থিতসহ জনগণের চিকিত্সা সেবা নিশ্চিত করতে যা দরকার তাই করা হবে বলে তিনি জানান।