হার্টে ত্রুটিযুক্ত শিশুদের জন্য দেশেই বিশেষায়িত চিকিত্সা

আপডেট : ২৫ জুন ২০১৪, ২২:০৭
দেশে প্রতিবছর হূদযন্ত্রে নানা ত্রুটি নিয়ে ২৫ হাজার শিশু জন্মাচ্ছে। ধনী-দরিদ্র অনেক অভিভাবক জানেন না তাদের শিশু সন্তানের হূদযন্ত্রে সমস্যা রয়েছে। অত্যন্ত ব্যয়বহুল এই চিকিত্সা। দরিদ্র শ্রেণীর পক্ষে এই ব্যয়ভার বহন করা বেশ কঠিন। গ্রামের এ ধরনের শিশুদের শরীরে যখন উপসর্গ দেখা দেয় তখন তাদের অশিক্ষিত বাবা-মা দৌঁড়ান কবিরাজ-ওঝা ও হাতুড়ে চিকিত্সকের কাছে। তারা এটাকে বলে আলগা দোষ, বাতাস লেগেছে কিংবা জিনভুতের আছর লেগেছে। জাতীয় হূদরোগ ইনস্টিটিউট, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের হূদরোগ বিভাগ ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিশু কার্ডিওলজি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, অপচিকিত্সা নেয়ার পর এমন অবস্থায় শিশুদের কার্ডিওলজি বিভাগে আনা হয়, যখন আর করার কিছু থাকে না। মৃত্যুই তখন নিশ্চিত গন্তব্য হয়ে পড়ে। হূদযন্ত্রে ত্রুটি নিয়ে জন্মানো শিশুদের চিকিত্সা সেবা এদেশে অনেক আগেই গড়ে উঠেছে। যদিও তা দরিদ্র-অশিক্ষিত পরিবারের লোকজন জানেন না। গতকাল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে পেডিয়াট্রিক কার্ডিয়াক ক্যাথল্যাবের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে হূদরোগ বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকরা এদেশে শিশু হূদরোগের চিকিত্সা ও আক্রান্ত হওয়াসহ বিস্তারিত প্রেক্ষাপট তুলে ধরেন। সরকারিভাবে শেরে বাংলানগর জাতীয় হূদরোগ ইনস্টিটিউটে হূদরোগীদের আধুনিক পূর্ণাঙ্গ চিকিত্সা সেবা গড়ে উঠেছে অনেক আগেই। কিন্তু শিশুদের জন্য আলাদা কোন বিভাগ সেখানে গড়ে উঠেনি। একমাত্র বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে আলাদা শিশু হূদরোগীর চিকিত্সা সেবা শুরু হলেও জোরাতালি দিয়ে চলছিল এই বিভাগটি। ২০০৯ সাল থেকে শিশু কার্ডিওলজী বিভাগের চিকিত্সা সেবায় একের পর এক আধুনিক প্রযুক্তি যুক্ত হতে থাকে। পেডিয়াট্রিক কার্ডিয়াক ক্যাথল্যাব চালুর পর বিভাগটি পূর্ণাঙ্গতা পেল। ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পরপরই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দিকনির্দেশনায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিত্সা-শিক্ষার মানোন্নয়নে দৃশ্যপট পরিবর্তন হতে শুরু করে। প্রখ্যাত নাক, কান, গলা বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. প্রাণ গোপাল দত্তের বলিষ্ঠ নেতৃত্ব পাচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়টি। যিনি বিশ্ববিদ্যালয়টি চিকিত্সা শিক্ষার মান আন্তর্জাতিক মান সম্পন্ন করে তুলতে সক্ষম হয়েছেন। নতুন নতুন বিভাগ ও আধুনিক প্রযুক্তিগত চিকিত্সা সেবা চালু করে তিনি এই মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়টিকে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে অন্যতম সেরা চিকিত্সা শিক্ষা কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। এরই ধারাবাহিকতায় সর্বশেষ যুক্ত হলো পেডিয়াট্রিক কার্ডিয়াক ক্যাথল্যাব। সেখানে রয়েছে শিশু হূদরোগীদের জন্য পূর্ণাঙ্গ করোনারি কেয়ার ইউনিট ও ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট। যা সংকটাপন্ন শিশু হূদরোগীদের চিকিত্সা দিয়ে বাঁচিয়ে রাখতে সহায়তা করবে। এই পেডিয়াট্রিক ক্যাথল্যাব চালু হওয়ায় হূদযন্ত্রে ত্রুটি নিয়ে জন্মানো শিশুদের আধুনিক পূর্ণাঙ্গ পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও চিকিত্সা সেবা প্রদান করা যাবে। ভিসি অধ্যাপক ডা. প্রাণ গোপাল দত্ত বলেন, মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে পেডিয়াট্রিক ক্যাথল্যাবে দরিদ্র শিশুদের জন্য স্বল্পমূল্যে কিংবা বিনামূল্যে চিকিত্সা সেবা প্রদানের ব্যবস্থা থাকবে। এছাড়া মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে দরিদ্র অসহায় রোগীদের চিকিত্সা প্রদানের ব্যবস্থা শুরু থেকে চলে আসছে বলে তিনি জানান। শিশু কার্ডিওলজি বিভাগের বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকরা বলেন, বিশ্বের প্রতি এক হাজার নবজাতকের মধ্যে ৬ থেকে ৭ হূদরোগ নিয়ে জন্মগ্রহণ করছে। বাংলাদেশে এই সংখ্যা কত তার কোন পরিসংখ্যান নেই। গর্ভবতী মায়ের ভেজাল ও ফরমালিনযুক্ত খাবার গ্রহণ এ ধরনে শিশু জন্মদানের ঝুকি বাড়াচ্ছে। বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে বিশিষ্ট কার্ডিওলজিস্ট অধ্যাপক ডা. সজল ব্যানার্জি বলেন, গর্ভাবস্থায় মাকে ফল, দুধ, মাছ ও শাক-সবজি খাওয়ার জন্য চিকিত্সকরাই পরামর্শ দিয়ে থাকেন। চিকিত্সকের পরামর্শ অনুযায়ী গর্ভবতী মায়েরা সেই ফলমুল, দুধ মাছ, শাক-সবজি নিয়মিত খেয়ে থাকেন। এই শাক-সবজি ফলমূল ও খাদ্য সামগ্রিকে ফরমালিনসহ বিষাক্ত কেমিক্যাল মেশানো হয়। এগুলো খাওয়ার পর মায়ের পেটের সন্তানের হার্টে ছিদ্রসহ মরণব্যাধি হওয়ার আশংকা শতভাগ। আর এই কারণেই শিশুদের জন্মগত হূদরোগের সংখ্যা আশংকাজনক হারে বাড়ছে বলে তিনি জানান। মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিশু কার্ডিওলজি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. জাহিদ হোসেন বলেন, জন্মগত হার্টের ত্রুটি নিয়ে জন্মগ্রহণকারী শিশুদের মধ্যে ৩০ ভাগেরই অপারেশন ছাড়া ইন্টারভেনশনের মাধ্যমে চিকিত্সা দেয়া যায়। ৬০ থেকে ৭০ ভাগ শিশুদের অপারেশন প্রয়োজন হয়। পেডিয়াট্রিক কার্ডিয়াক ক্যাথল্যাবের মাধ্যমে এখন শিশুরা সহজেই আধুনিক চিকিত্সা সেবা পাবে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চিকিত্সা সেবার মানোন্নয়নে বলিষ্ট পদক্ষেপ ও দিক-নির্দেশনা অনুযায়ী একের পর এক চিকিত্সা সেবায় যুক্ত হচ্ছে অত্যাধুনিক ইউনিট। এই দেশে রোগীদের সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়াসহ বিদেশে চিকিত্সা সেবার জন্য যাওয়া প্রয়োজন হবে না। সেইভাবেই অত্যাধুনিক চিকিত্সা সেবা দেশেই দ্রুত গড়ে উঠছে।