কার্তিকে লোকাচার

আপডেট : ২৯ নভেম্বর ২০১৮, ১৮:২৩

 ‘মশা-মাছির মুখ পুড়া যায়,

ভালা আইয়ে, বুরা যায়।’

লোকছন্দে কথিত ওপরের স্লোগানধর্মী কথাগুলো প্রাচীনকাল থেকে গ্রাম-বাংলার খেতের আইল-বাতারে কিংবা নদী-খাল-বিলের পাড় বরাবর পল্লির শিশু-কিশোরদের মুখে সুরারোপিত হয়ে শোনা যেত। বিশেষ করে প্রতিবছর কার্তিক মাসের সংক্রান্তিতে এ-ধরনের লোক-সংস্কৃতি বাংলাদেশের বহুকালের গ্রামীণ ঐতিহ্য হিসেবে পরিচিতি পেয়ে আসছে। একটা সময় ছিল, যেহেতু কার্তিক মাসের শেষ দিনটিতে বাংলার সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রায় ঘরে ঘরে কার্তিক পূজার প্রচলন ছিল, সেহেতু ব্রতচারী উপাস্য নারীদের সাথে গাঁয়ের শিশু-কিশোরদেরও আনন্দের অন্ত ছিল না। গাঁয়ের পেশাদার পাল কিংবা আচার্য মৃিশল্পীর বাড়ি থেকে মাথায় করে পৌরাণিক দেবতা কার্তিকের মূর্তি কিনে নিয়ে আসার পরই গোধূলি সময়টাতে পাড়ার ছেলেরা দল বেঁধে বেরিয়ে পড়ে কুশপুত্তলিকার মুখে অগ্নি সংযোগ করে। তাদের টগবগে উদ্ভাসিত মুখে মুখে তখন উল্লিখিত শ্লোকসদৃশ লোকছন্দ ধ্বনিত হতে থাকে। সত্যি, সে এক অদ্ভুত আনন্দের শিহরণ তাদের। বিশেষ করে মন্দ রিপুকে, মন্দ দিকগুলোকে ধ্বংস করে ভালোকে আনয়ন করার আকাঙ্ক্ষাই রয়েছে উক্ত স্লোগানে। তাই, বলা হয়েছে—‘ভালা আইয়ে, বুরা যায়’।

ঋতুচক্রের নিয়মেই বাংলা বারো মাসের মধ্যে চৈত্র ও কার্তিক মাসকে প্রাকৃতিক বিবেচনায় মড়া বা নিষ্প্রাণ মাস হিসেবে মনে করা হয়ে থাকে। গাঁয়ের মানুষ যখন এ মাস দুটোতে বিরাজিত অনটন থেকে মুক্তি পাবার আকাঙ্ক্ষায় একান্ত ধৈর্যের সাথে পাড়ি দিতে চায় তাদের সময়, তখন এ দুটো সংক্রান্তিতেই যেন নিসর্গের জরাগ্রস্ততা কাটিয়ে নতুন আলোকিত দিনের আগাম বার্তা শুনতে পায় তারা। চৈত্রের শেষ দিনে বাসন্তী পূজার সমারেহে যেমন নতুন বর্ষবরণের প্রস্তুতি, তেমনি কর্তিকের শেষ দিনেও ঘরে ঘরে কার্তিক পূজার মধ্য দিয়ে শরতের প্রভাববলয়ের শেষ মূর্তিপূজাটিকে হেমন্তে উপভোগ করা। কেন না, কার্তিককে সৌন্দর্যের প্রতীক আর দেবসেনাধ্যক্ষ মনে করা হয়। তাই, পূর্ব হতে চলমান পুরুষতান্ত্রিক সমাজচিত্রে তখন, এমনকি আজও প্রত্যেক নারীই আশা করে থাকেন, তাদের সন্তান-বিশেষ করে পুত্র যেন সুন্দর ও বলবীর্যবান হয়। এ লোকাচার বঙ্গ-ভারতের সর্বত্র হলেও বেশি করে দৃশ্যমান থাকে বাংলার পল্লিগুলোতেই। অনস্বীকার্য যে, আগে থেকেই উপমহাদেশের এমনকি বাইরেও নারীরা অবহেলিত ছিল এবং আজও তা ক্রমহ্রাসমান হলেও আছে। কিন্তু, এই নারীদেরকেই দেখা যায় দিবারাত উপোস করে কার্তিকের ব্রত সাধনা করে স্বামী-পুত্র-ভাইদের দীর্ঘ জীবন ও সমৃদ্ধি কামনায় কত না তাদের প্রচেষ্টা।

সনাতন ধর্মমতে, পুরাকালে নিষ্ঠাবতী কন্যা-জায়া-জননী ও ভগ্নির এক প্রতীক ছিল ঊষাবালী। কার্তিকের ব্রত সাধনার পরিপালন করার মানসে ঊষাবালী হাটে গিয়ে পূজার যে সমস্ত আনুষঙ্গিক দ্রব্য ও উপাচার সংগ্রহ করে, সে বর্ণনাই একটি লোকগান ব্রতসাধনায় অংশগ্রহণকারী সম্মিলিত নারীদের কণ্ঠে পূজা-অন্তে গীত হয়। নারীরা শুদ্ধ মন ও বেশভূষায় সে রাতজুড়ে যে গান গেয়ে থাকে, তার একটি—

বুলে গো, ঊষাবালী হাটে যায় গো

পিইন্দা পাটের শাড়ি।

বাইচ্ছা বাইচ্ছা কিনে ঊষা

নয়া ঘটি, নয়া মুছি।

বুলে গো, ছাইড়া দেও গো ঊষার অঞ্চল

আমি দিব কড়ি গো।

বুলে গো, ... ... ... ... পাটের শাড়ি।

বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল বলেছিলেন, ‘হে দারিদ্র্য, তুমি মোরে করেছ মহান’। অর্থাত্ দরিদ্রতার মতো বিরূপ পরিবেশে অর্থনৈতিক মুক্তির নিমিত্তে মানুষের যে নিরন্তর সংগ্রাম; অর্থ, বিত্ত আর বৈভবের প্রতিক্রিয়া যেখানে অনুপস্থিত, সেখানে সাধারণ বা বিত্তহীন মানুষকে অপেক্ষাকৃত মহান থাকতে দেখা যায়। ঠিক তেমনি, তখনকার গ্রামবাংলার কার্তিকের অনটন বা জরাগ্রস্ততার ভেতর সামান্য লোকাচারে একটি দিনের জন্যে ভুলে গিয়ে যেন আনন্দে আত্মহারা হয়ে যায় শিশু-কিশোরেরা; এই আনন্দের মাঝেই ওরা নিজেদের মহান করে তোলে। আর নারী ব্রতীদের তো কথাই নেই। যদিও কার্তিক পূজার আড়ম্বরি ভারতের পশ্চিমবঙ্গের চন্দন নগরে আর বাংলাদেশের গোপালগঞ্জে বেশ হাঁকডাক ও ঐতিহ্য নিয়েই হয়ে আসছে, তবুও বাংলাদেশের বিভিন্ন গাঁঁয়েও ছিল এ পূজার আচার। কিন্তু দুঃখের বিষয়, এখন গাঁয়ের পর গাঁ ঘুরলেও কদাচিত্ চোখে পড়ে এমন সুন্দর বীরের প্রতীক পূজা-আচারের নিয়ম রক্ষা করার ন্যূনতম প্রয়াস। প্রায় দুই যুগেরও অধিক কাল হতে চলল কার্তিকে লোকাচার বিলুপ্তপ্রায়। ময়মনসিংহের বিভিন্ন অঞ্চলে এককালে সনাতনী প্রায় ঘরে ঘরেই হতো কার্তিকের ব্রত। ঘরে ঘরে নারীদের ব্যস্ততা আর আনন্দের সীমা ছিল না। এ জেলার ভালুকা অঞ্চলের বিরুণীয়া-কংশেরকুল গাঁয়ের কার্তিক পূজার লোক-ঐতিহ্য দেখে এসেছি আশৈশব। নিজ গাঁ বিধায়, বিরুণীয়ার ভগ্নি-জায়া-জননীদের মধ্যে যাঁদের দেখেছি, তাঁদের মধ্যে—বেলী রাণী বর্মণ, প্রয়াত প্রফুল্ল বালা ভৌমিক, প্রয়াত কিরণ বালা ভৌমিক, প্রয়াত প্রমদা বালা দেবী, প্রয়াত কুসুম রাণী ভৌমিক ও প্রয়াত বাসনা ভৌমিকের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তাঁদের কণ্ঠে গাওয়া আরেকটি গান—

বুলে রে, কার্তিক যাইবাইন কৈলাশ বনে উইট্যা বর।

লও-অ রে অমুকের নামে আইছে কার্তিক

অমুকের নামে যায় গো।

এরূপে পাড়ার প্রতিটি নারী-পুরুষের নাম ধরে প্রীতি ও শুভকামনায় তাঁরা গীত পরিবেশন করেছেন।

পুরাণে কার্তিক দেবতার বেশ কয়েকটি নামের উল্লেখ রয়েছে। যেমন—কার্তিকেয়, মরুগান, কুমার, স্কন্দ, সুব্রাহ্মণ, আয়ান, চেয়্যন, সেন্থিল, ভেলন, স্বমীনাথ, সারাভন, বিশক নামগুলো আমাদের জানা একেকটি অলঙ্কৃত নাম। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কাটোয়া গঙ্গাতীরবর্তী হরিসভা পাড়ার পূর্ব নাম ছিল চুনুরিপাড়া। জানা যায়, এ পাড়াতে গড়ে উঠেছিল বারবনিতার পল্লি। তাদের আশ্রয়দাতা ছিলেন তখনকার জমিদারবাবু ও বণিকেরা। সেখানকার বনিতারা মাতৃত্বের স্বাদ পাওয়ার আশায় সে সময় ন্যাংটা কার্তিকের আরাধনা করতে শুরু করেছিল। সন্তানের আশায় এখনো সেখানে শিশুকার্তিকের পূজা করার রীতি রয়েছে। এ পূজাকে কেন্দ্র করেই জমিদার ও বণিকদের মধ্যে ‘কার্তিকের লড়াই’ প্রতিযোগিতা হতো কাটোয়া শহর ও আশপাশে।

কার্তিক পূজার লোকাচার পূর্বাপর অনেকটা শুদ্ধ ও সংযমী। সারাদিন উপোস থেকে রাতে কার্তিকের ব্রত অন্তে শুদ্ধ ও সংযমের যে গীত গাওয়ার ঐতিহ্য ছিল বিরুণীয়ার ব্রতচারী নারীদের, তা নিম্নরূপ—

‘কার্তিকের বইনাইন ভর্তি-বিদ্যা শুদ্ধ অইল গো।

 ধোবার ক্ষারে নাপেতর নরুণে ভর্তি শুদ্ধ অইল গো।

কার্তিকের বইনাইন ভর্তি সংযম ভরা করে গো।

নয়া চাইলে, নয়া ডাইলে সংযম ভালা করে গো;

নয়া জলপই, নয়া তেঁতুই, নয়া শিমুট, নয়া মুলা

সংযম তারা করে গো।

কার্তিকের বইনাইন ... ... ... ... ... অইল গো।

লোকগানটিতে—বইনাইন= বোনেরা, জলপই=জলপাই, তেঁতুই=তেঁতুল এবং শিমুট=শিম বোঝানো হয়েছে। বাংলাদেশের সর্বত্র কার্তিকের ব্রতসাধনা ইদানীং আর দৃশ্যমান না হলেও গোপালগঞ্জে এদিনটি উপলক্ষে আজো রয়েছে আবহমান বাংলার অতি প্রাচীন কৃষ্টি, সংস্কৃতি ও নিজস্বতা ধরে রাখাতে ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচ। কার্তিকেয় দেবসেনাপতির আগমনের এ বিশেষ দিনে এখানকার পাশ বরাবর বয়ে যাওয়া মধুমতি নদীর সানপুকুরিয়া উত্তরপাড়া থেকে দক্ষিণপাড়া পর্যন্ত প্রায় চার কিলোমিটার জলপথজুড়ে অনুষ্ঠিত হয় নৌকাবাইচ ও গ্রামীণ মেলা। পার্শ্ববর্তী জেলার বাসিন্দারাও এখানে এসে উপভোগ করেন লাখো মানুষের সমাগমে এ দৃষ্টিনন্দন প্রতিযোগিতা।

যেহেতু কার্তিক পূজার লোক-স্লোগান দিয়ে আমার লেখা শুরু করেছিলাম, তাই আবার ফিরে আসি বিরুণীয়ায় অনুষ্ঠেয় কার্তিক পূজায় বাতি জ্বালানোর লোকগানে—

‘বুলে রে, নব বরের নব ললিতা নন্দের ধরে গীত গো,

বুলে রে, সন্ধ্যাবালা লাগায় বাতি অমুকের বউয়ে গো;

বুলে রে, সন্ধ্যাবালা লাগায় বাতি অমুকের মায় গো;

বুলে রে, ... ... ... ... (বিভিন্ন সম্পর্কিত নারীগণ)।

এ অঞ্চলে এ বিশেষ দিনের কার্তিকের ব্রত লোকাচারে আমরা লক্ষ করি, ঊষাবালী এক বিশেষ চরিত্র। তাই, লোকগানগুলোতে ঊষাবালীর প্রভাব রয়েছে আগাগোড়া। তেমনি আরও একটি গান, যা বান্দের গান হিসেবে প্রচলিত তা—

ঊষাবালী, ঊষাবালী, দেবী তোরে ডাকে গো।

কিসের কারণে দেবী আমারে তলব করে গো?

এই-অ ঊষা বান্দে ইঁদুর, কামানে খেঁচিয়া গো।

ঊষাবালী ঊষাবালী, দেবী তোরে ডাকে গো।

কিসের কারণে দেবী আমারে তলব করে গো?

ঊষাবালী বান্দে চড়ই, কামানে খেঁছিয়া গো,

ঊষাবালী বান্দে মশা, কামানে খেঁছিয়া গো,

ঊষাবালী বান্দে মাছি, কামানে খেঁছিয়া গো।

আগেই বলা হয়েছে যে, বাংলার সনাতন ধর্মাবলম্বী রমণীগণ কার্তিকের ব্রতসাধনা করে থাকেন কার্তিকের মতো অনুপম সুন্দর ও শৌর্যবীর্যশালী পুত্র লাভের আশায়। তবে, তার পরও রয়েছে আরও আশা, আরও টান, ভালোবাসা, সুখাবেশ। প্রিয় পুত্রের সুস্বাস্থ্য কামনা, এমনকি পরিবারের সকল পুরুষ সদস্যের সুস্থ জীবন আশায়ও পতিব্রতা রমণীদের দেখা যায়, কার্তিক পূজার মানত করতে। এ প্রসঙ্গে  এখানে বরিশাল অঞ্চলের এক বন্ধুর মুখে শোনা একটি মানতের ছন্দাকার রূপ—                          

‘ফল্না মাসে ফল্না পূজা, ফল্না যদি বাঁচে,

জোড় ফল্নার পূজা দিমু ফল্না মাসের শেষে।’

অর্থাত্, স্বামীর নাম ‘কার্তিক’ হওয়ায় স্বামীকে তার স্ত্রী (স্বামীর নাম মুখে না এনে) ‘ফল্না’ বলে সম্বোধন করে থাকে। আর যেহেতু কার্তিক মাসের শেষ দিন কার্তিক পূজা হয়ে থাকে, তাই সে রমণী কার্তিক দেবতার প্রতি অগাধ ভক্তি রেখেই কার্তিক মাস ও কার্তিক পূজার স্থলে ‘ফল্না মাস’ ও ‘ফল্না পূজা’ বলে তার প্রার্থনা সম্বলিত মানত করেছিল। আর এরই সঙ্গে আমিও আমার লেখার আপাতত শেষ করতে চাই এই বলে যে, কার্তিকের সংক্রান্তি রজনীতে কার্তিক পূজাই বলি, ব্রতই বলি বা আরাধনাই বলি, সনাতন ধর্মীয় আচারের মোড়কে এ ক্রিয়াকর্মকে কেন্দ্র করে যে লোকগান সমৃদ্ধ লোকাচার, তা যেন আগ্রহী পাঠক ও সংশ্লিষ্ট আরাধ্যাদের প্রাণবন্ত করে রাখে; মানসপটে তাদের চির জাগরুক থেকে পরিবর্তিত এ সমাজচিত্রের নিগড় হতে মুক্ত হয়ে পুনরাবির্ভাব ঘটে বিলুপ্তপ্রায় এ লোকাচারের।