দলিতদের বাইরে রেখে সার্বিক উন্নয়ন সম্ভব নয়

আপডেট : ২৮ জুন ২০১৪, ২২:৪৯
সমাজে পিছিয়ে পড়া দলিত গোষ্ঠীকে উন্নয়নের বাইরে রেখে দেশের সার্বিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাই তাদেরকে আবাসন, শিক্ষা, চিকিত্সা ও কর্মসংস্থানের যথাযথ সুযোগ দিতে হবে। গতকাল শনিবার সকালে রেলওয়ে ভবনে ‘রেলওয়ের জমিতে বসবাসকারী দলিত সম্প্রদায়ের সমস্যা ও সম্ভাব্য সমাধান’ শীর্ষক মতবিনিময় সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন। সংবিধানের আলোকে দলিতদের জন্য সমঅধিকার দাবি করে বক্তারা বলেন, স্থায়ী আবাসস্থল ও বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ দিলে দলিতরা বঞ্চনা থেকে মুক্তি পাবে। এজন্য সামাজিক মূল্যবোধ তৈরি ও দলিতদের জন্য রেলওয়ের জমি ইজারা দেয়ারও দাবি জানান বক্তারা। হেকস্ সুইজারল্যান্ডের সহযোগিতায় অনুষ্ঠানটির আয়োজন করে প্রান্তিক ও মূলসে াতধারার বাইরের জনগোষ্ঠীর উন্নয়ন নেটওয়ার্ক (এনএনএমসি)। সভায় বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. তাফাজ্জল হোসেন প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন হেকস্ সুইজারল্যান্ডের কান্ট্রি ডিরেক্টর শামীমা আখতার শিমুল, বাংলাদেশ রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক আমজাদ হোসেন, চিফ প্লানিং অফিসার মঞ্জুরুল আহসান, যুগ্ম মহাপরিচালক মো. শামসুজ্জামান, এনএনএমসি’র আহবায়ক ড. মুহম্মদ শহীদ উজজামান, সমন্বয়ক মনজুন নাহার, সদস্য হিমাংসু চন্দ্র চান্দা, শ্যাম লাল, সুনীল কুমার মৃণাল এবং বাংলাদেশ হরিজন ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক নির্মল চন্দ্র দাসসহ দলিত জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা। বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. তাফাজ্জল হোসেন বলেন, যুগ যুগ ধরেই অনেক দলিত গোষ্ঠী রেলওয়েতে সেবাধর্মী কাজ করে যাচ্ছে। তাই দলিত শ্রেণীর উন্নয়ন না হলে রেলওয়েরও উন্নয়ন হবে না। এজন্য আমরা দলিতদের জন্য সরকারের দেয়া চাকরি কোটা বাস্তবায়ন করছি। চাকরিতে দলিতদের জন্য সরকারের দেয়া ৮০ শতাংশ কোটা ভবিষ্যতেও সঠিকভাবে বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি বলেন, চাকরির ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার তাদের প্রাপ্য। তবে এসব চাকরির সুযোগ দিন দিন তুলনামূলকভাবে কমে আসছে। তাই অন্য পেশায় দলিতদেরকে এগিয়ে আসতে হবে। তিনি আরও বলেন, দলিতদের উন্নয়নে রেলওয়ের পক্ষ থেকে যথাসম্ভব পদক্ষেপ নেয়া হবে। দলিতদেরকে উচ্ছেদ করতে তিনি অনাগ্রহী বলে উল্লেখ করেন। রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক আমজাদ হোসেন বলেন, সংবিধানে সব মানুষের জন্য সমঅধিকার দেয়া হয়েছে। তাই দলিতদের ব্যাপারে দায়িত্ব এড়ানোর সুযোগ নেই। আর তারা পশ্চাতপদ হওয়ায় তাদের জন্য বেশি সুযোগ দেয়া প্রয়োজন। এজন্য কিছু কিছু পদে চাকরিতে দলিতদেরকে ১০০ ভাগ কোটা দেয়া যেতে পারে। দলিতরা না আসলে সেক্ষেত্রে অন্যদের নিয়োগ হতে পারে। তাছাড়া দলিতদের আবাসনের নিরাপত্তা দিতে প্রতি বছর কলোনি মেরামত ও পয়ঃনিষ্কাশনের জন্য কিছু বাজেট রাখা যেতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন। শামীমা আখতার শিমুল বলেন, অর্থনৈতিক মুক্তি না আসলে দলিত গোষ্ঠীর উন্নয়ন হবে না। এজন্য প্রচলিত কাজের পাশাপাশি বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। স্থায়ী আবাসন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবাসহ তাদের জীবনমান উন্নয়নে সরকারের অগ্রগামী ভূমিকা রাখা প্রয়োজন। সমাজের প্রতি তাদের অবদানের দায়বদ্ধতা থেকেই তাদের জন্য আমাদের বেশি মনোযোগী হওয়া প্রয়োজন। তিনি আরও বলেন, হেকস্ সুইজারল্যান্ড দীর্ঘদিন ধরেই দলিতদের উন্নয়নে তৃণমূল পর্যায়ে কাজ করছে। তাদের জীবনমান উন্নয়নে কারিগরি শিক্ষা ও স্বাস্থ্য উন্নয়নে বিশেষভাবে কাজ করে যাচ্ছে। এনএনএমসি’র সদস্য শ্যাম লাল বলেন, দলিতদের ছেলে-মেয়েরা শিক্ষিত হচ্ছে। কিন্তু তারা যোগ্যতা অনুযায়ী চাকরি পাচ্ছে না। তাছাড়া দলিতদের আবাসস্থল রেলওয়ের কোয়ার্টারের দুর্দশা উল্লেখ করে তিনি বলেন, কোয়ার্টারগুলো এতো পুরোনো যে ছাদ দিয়ে পানি পড়ে। যে কোনো সময় ভেঙ্গে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাছাড়া খুব অল্প জায়গায় একই ঘরে পরিবারের সবাইকে রাত্রি যাপন করতে হয়। দলিতদের প্রতিনিধি জয়নাল বাষ্প ও মনি লাল বাষ্পও একই সুরে কথা বলেন। নির্মল চন্দ্র দাস বলেন, দলিতরা ভেসে আসেনি। বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিত্সা তাদের অধিকার। কিন্তু কেউই এ বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে নজর দেন না। তবে বর্তমান সরকার দলিতদের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ভর্তিতে ও কিছু কিছু চাকরিতে কোটা দিয়েছে। আমলতান্ত্রিক জটিলতায় সেগুলোও ঠিকভাবে বাস্তবায়ন হয় না। সাম্প্রতিক সময়ে রেলওয়ের চাকরিতে কোটা বাস্তবায়ন করে দলিতদের প্রাধান্য দেয়ায় তিনি রেলওয়ে কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, দলিতদের জন্য বাজেটে বরাদ্দ দেয়া হলেও স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের কারণে এর সুবিধা যথাযথভাবে পাওয়া যায় না। বরাদ্দ দেয়ার পাশাপাশি এ বিষয়েও নজর দেয়া প্রয়োজন। তবে দলিতদের জন্য স্থায়ী আবাসস্থলের জন্য বহুতল ভবন করে তাতে বরাদ্দ দেয়ার দাবি জানান তিনি। নির্মল চন্দ্র বলেন, উচ্ছেদের ভয়ে দলিতরা স্থায়ীভাবে কিছু করতে পারে না। এজন্য জমি বরাদ্দ কিংবা বহুতল ভবনের স্পেস বরাদ্দ দিলে তাদের উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে। দলিত জনগোষ্ঠীর জীবন চিত্র নিয়ে অনুষ্ঠানে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন এনএনএমসি’র সমন্বয়ক মনজুন নাহার। তিনি বলেন, দলিত সম্প্রদায় গুরুত্বপূর্ণ সেবাধর্মী কাজ করেও সমাজে অবহেলিত ও অস্পৃশ্য। ধর্মীয় উপাসনালয়েও এদের প্রবেশাধিকার নেই। হোটেল, রেস্টুরেন্টে তাদের ঢুকতে দেয়া হয় না। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তাদের শিশুরা বঞ্চনার শিকার হয়। শিক্ষার্থীদের দ্বারা তারা অবহেলার শিকার হয়। মাঝে মাঝে শিক্ষকরাও অবজ্ঞা করেন। এতে শিক্ষায় তারা পিছিয়ে পড়ছে। শিক্ষিত হয়েও দলিতদের কর্মসংস্থান পেতে নানা ভোগান্তির শিকার হতে হয়। দলিতদের বিভিন্নমুখী দুর্ভোগ দুর্দশার কথা তুলে ধরে মনজুন নাহার আরও বলেন, রেলওয়ে কিংবা পৌরসভার কলোনিতে মাত্র ৯৬ বর্গ ফুটের একটি ঘরে বাবা-মা, ছেলে, ছেলের বৌ, মেয়ে, মেয়ে-জামাই, নাতি-নাতনিসহ পরিবারের ৭-৮ জন একসঙ্গে বসবাস করে। একইঘরে মানুষ ও গবাদি পশুও রাত্রি যাপন করে। সৈয়দপুর রেলওয়ে কলোনিতে প্রায় ১২০ জন সদস্যের জন্য মাত্র ২টি ল্যাট্রিন রয়েছে। মনজুন নাহার বলেন, দলিতরা প্রতিনিয়ত মজুরি বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। রেলওয়ে বিভাগ, সিটি কর্পোরেশন ও পৌরসভাসহ নানা সেক্টরে পরিচ্ছন্নতা কর্মী হিসেবে তাদের মজুরি মাসিক কম-বেশি ৫০০ থেকে ১২০০ টাকা। কোনো কোনো পৌরসভায় মজুরি মাত্র ৩০০ থেকে ১০০০ টাকা। এসবের ফলে সমাজের মূল ধারায় অবহেলিত ও বঞ্চিত হওয়ায় দলিত জনগোষ্ঠীর শিশুরা বিচ্ছিন্ন হয়ে বড় হচ্ছে। বাধ্য হয়ে তারা একই কাজ করছে। প্রতিনিয়ত দলিত গোষ্ঠী স্বাস্থ্য ঝুঁকির সম্মুখীন হচ্ছে। অসামাজিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে। এ অবস্থায় বক্তারা রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের কাছে রেলওয়েতে বসবাসবারত দলিত জনগোষ্ঠীর জন্য স্বাস্থ্যসম্মত আবাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলার দাবি জানান তিনি। এছাড়া রেলওয়ের পোষ্য কোটায় শিক্ষিত দলিত সন্তানদের চাকরির কোটা নির্ধারণ ও তা বাস্তবায়ন করারও দাবি জানানো হয়।