দেশে চিংড়ি উত্পাদনে আধুনিকতার সাফল্য

আপডেট : ২৮ জুন ২০১৪, ২২:৫৭
চিংড়ি উত্পাদনে দেশে নতুন রেকর্ড সৃষ্টি হয়েছে। আধা নিবিড় (সেমি ইন্টেনসিভ) পদ্ধতি অনুসরণ করে প্রতি হেক্টরে প্রায় ৪ হাজার ৫০০ কেজি চিংড়ি উত্পাদন করা হয়েছে। আবার উন্নত সনাতন (ইমপ্রুভ এক্সটেনসিভ) পদ্ধতি অনুসরণ করার ফলে প্রতি হেক্টরে ১ হাজার ৫০০ কেজি চিংড়ি উত্পাদন করা সম্ভব হয়েছে। বাংলাদেশে দীর্ঘকাল ধরে সনাতনী পদ্ধতির মাধ্যমে চিংড়ি চাষ করে প্রতি হেক্টরে মাত্র আড়াইশ থেকে তিনশ কেজি চিংড়ি উত্পাদন করে আসছে। অথচ বাংলাদেশের মতো চিংড়ি উত্পাদনকারী ও রপ্তানিকারক দেশ থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, ভারত, চীন, ইন্দোনেশিয়াসহ কয়েকটি দেশে আধুনিক পদ্ধতি অনুসরণ করে প্রতি হেক্টর জমিতে গড়ে প্রায় ৩ হাজার কেজি চিংড়ি চাষ করে আসছে। বাংলাদেশ চিংড়ি উত্পাদন ও রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে দীর্ঘকাল ধরে বিশ্বে পরিচিতি পেলেও শুধু উন্নত ও আধুনিক পদ্ধতি অনুসরণে অনেক পিছিয়ে রয়েছে। এতোদিন ধরে সরকারি বা বেসরকারি কিংবা ব্যক্তিগত পর্যায়েও আধুনিক চিংড়ি চাষ পদ্ধতি অনুসরণ না করায় চিংড়ি খাতে রপ্তানি আয় তেমন একটা বাড়ছে না। বরং আধুনিক পদ্ধতি অনুসরণকারী বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সাথে রপ্তানির ক্ষেত্রে ঠিকতে না পেরে অনেক ব্যবসায়ী আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার নজির রয়েছে। অনেকে ব্যাংকের ঋণে দায়গ্রস্ত হয়ে ব্যবসা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছে। দীর্ঘকাল পর বাংলাদেশ হিমায়িত মত্স্য রপ্তানিকারক সমিতি (বিএফএফইএ)-এর উদ্যোগে আধা নিবিড় ও উন্নত সনাতন পদ্ধতিতে চিংড়ি চাষের জন্য পাইলট প্রকল্প গ্রহণ করে। উক্ত প্রকল্পের আওতায় কক্সবাজারের খুরুশকুল এলাকায় ১১টি পুকুর বা জলাধার নেয়া হয়। এর মধ্যে ৬টি জলাধারে আধা নিবিড় এবং ৫টি জলাধারে উন্নত সনাতন পদ্ধতিতে চিংড়ি চাষ করা হয়। গত ১৬ মার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে দুই ধরনের পদ্ধতির চিংড়ি চাষের জন্য জলাধারে পোনা অবমুক্ত করা হয়। এরপর থেকে বিএফএফইএ-Gর বিশেষজ্ঞ টিমসহ সরকারের মত্স্য বিভাগের লোকজনসহ প্রকল্পের তত্ত্বাবধান শুরু করেন। cieZ©x‡Z গত বুধবার প্রকল্প এলাকার জলাধারসমূহ থেকে চিংড়ি তোলা হয়। এতে বিএফএফইএসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তাগণ প্রকল্পের উত্পাদিত চিংড়ির পরিমাণে আশ্চর্য হয়ে পড়েন। দেশে উত্পাদিত চিংড়ি চাষে এক নতুন দিগন্ত সৃষ্টি হয়। জানা যায়, আধা নিবিড় চাষ পদ্ধতি কিছুটা ব্যয় বহুল হলেও উত্পাদন পরিমাণের তুলনায় তা খুবই bMY¨। অপরদিকে উন্নত সনাতন পদ্ধতি‡Z তেমন একটা খরচ নেই বললেই চলে। তবে সকল ক্ষেত্রে চাষাবাদের প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত নিবিড় পরিচর্যা এবং পর্যবেক্ষণে থাকতে হয়। জানা যায়, বাগদা চিংড়ি উত্পাদনে উপযোগী উপকূলীয় অঞ্চলে অধিক চিংড়ি উত্পাদনে চাষীদের উদ্বুদ্ধ করার জন্য বিএফএফইএ কক্সবাজার এলাকায় এ প্রকল্প হাতে নিয়েছে। বিএফএফইএ-Gর পক্ষ থেকে জানানো হয়, চিংড়ি চাষীদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ প্রদান, মাটি ও পানির গুণাগুণ পরীক্ষা করে জমি তৈরি, সুস্থ চিংড়ি পোনা এবং পরিমিত সুষম খাদ্য দিয়ে আধা নিবিড় চিংড়ি চাষ পদ্ধতির পাশাপাশি উন্নত সনাতন চিংড়ি চাষের মাধ্যমে এই রেকর্ড পরিমাণ চিংড়ি চাষ উত্পাদন সম্ভব হয়েছে; কিন্তু দেশের সমুদ্র উপকূলীয় এলাকার লোকজন সনাতন পদ্ধতিতে বাগদা চিংড়ি চাষ করে আসছে। আন্তর্জাতিক বাজারে বাগদা চিংড়ির ব্যাপক চাহিদাও রয়েছে। দেশে বর্তমানে বাগদা চিংড়ির চাষের জন্য জমি রয়েছে ১ লাখ ৭০ হাজার হেক্টর এবং গলদা চিংড়ির জন্য প্রায় ৪৫ হাজার হেক্টর জমি রয়েছে। জানা যায়, কক্সবাজার ও খুলনা উপকূলীয় এলাকায় কিছু স্থানীয় উদ্যোক্তা আধা নিবিড় পদ্ধতি অনুসরণ শুরু করেছে। তারা এক্ষেত্রে সাফল্যও পেয়েছেন। বিএফএফইএ-Gর সভাপতি মো. আমিন উল্লাহ জানান, দেশের সমৃদ্ধির জন্য চিংড়ি উত্পাদনের এই সাফল্য সারাদেশের চিংড়ি চাষীদের মধ্যে ছড়িয়ে দেয়া জরুরি। তিনি অধিক চিংড়ি উত্পাদনে চাষীদের আধুনিক পদ্ধতি ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করার ওপর জোর দেন। তিনি এখাতে সহজ শর্তে এবং স্বল্প সুদে অন্তত ১ হাজার কোটি টাকা ঋণ বরাদ্দের জন্য সরকারের প্রতি অনুুরোধ জানান। এ ঋণ প্রদান করা হলে চিংড়ি রপ্তানি বাবদ ২০১৫ সালে ১০ হাজার কোটি টাকা এবং ২০২১ সালের মধ্যে ৫০ হাজার কোটি টাকা আয় হবে। বিএফএফইএ-Gর পরিসংখ্যান অনুযায়ী চলতি অর্থ বছরের মে পর্যন্ত ১১ মাসে চিংড়ি রপ্তানি করে ৪৯৫ মিলিয়ন ডলার আয় হয়েছে। চিংড়ি রপ্তানির প্রবৃদ্ধি গত বছরের তুলনায় শতকরা ২২ ভাগ বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশ থেকে বিশ্বের ৫০টি দেশে হিমায়িত চিংড়ি রপ্তানি হয়। বর্তমানে দেশের চিংড়ি প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানায় সাড়ে ৩ লাখ টন চিংড়ি প্রক্রিয়াজাতকরণ সম্ভব হলেও বছরে গড়ে মাত্র ৬০ হাজার টন প্রক্রিয়াজাতকরণ করা হচ্ছে।