আসছে বর্ষা মৌসুম। সামান্য বৃষ্টিতে নগরীতে হাঁটু সমান পানি জমবে। কখনো কখনো হাঁটু ছাড়িয়ে কোমর অবধি পৌঁছবে। জল-কাদায় মিশে একাকার হয়ে উঠবে নগরী। জলজট ও যানজটে নাকাল হবে নগর জীবন। এটি রাজধানীর ঢাকার বর্ষা মৌসুমের চিত্র। অথচ এসব যেন দেখার কেউ নেই। নেই কোনো সমন্বিত উদ্যোগ। যাদের দায়িত্ব তারা একে অপরকে দোষারোপে ব্যস্ত। অন্যের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে দিতে পারলেই যেন নিজেদের দায়িত্ব শেষ। বন্ধ হচ্ছে না ‘ব্লেম গেম’। সিটি করপোরেশন বলছে ওয়াসার দায়িত্ব, ওয়াসা বলছে এর বিপরীত। মূল সমস্যা সমাধানে দৃশত কোনো সমন্বিত পদক্ষেপ চোখে পড়ছে না। অথচ জলাবদ্ধতা নিরসনে শত শত কোটি টাকার বাজেট করেছে সংস্থাগুলো। দায়িত্বশীলদের পক্ষ থেকে শুধুই প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে। কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। জলাবদ্ধতা নিরসনে সরকারের উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করেও মিলছে না সমাধান।
গত কয়েক বছর ধরে রাজধানীতে ২৪ ঘণ্টায় ৬০ মিলিমিটার বৃষ্টিতেই বিভিন্ন এলাকায় দেখা দিচ্ছে জলাবদ্ধতা। অথচ আসন্ন বর্ষায় সম্ভাব্য জলাবদ্ধতা নিরসনে ৮০৪ কোটি টাকার বাজেট করেছে সংস্থাগুলো। জানা যায়, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে রাস্তা, ফুটপাত ও ড্রেন সংস্কারে খরচ ধরা হয়েছে ৫৮৪ কোটি টাকা। একই খাতে উত্তর সিটি ব্যয় করবে ১৮০ কোটি টাকা। ঢাকা ওয়াসা খাল পুনঃখনন ও পরিষ্কারে ব্যয় ধরেছে ৪০ কোটি টাকা। এছাড়া সংস্থাগুলোর ড্রেন পরিষ্কারের কাজে নিয়মিত ব্যয় তো আছেই।
চলতি বছর বিভিন্ন সময় সামান্য বৃষ্টিতে রাজধানীর বিভিন্ন স্থান ডুবেছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের অন্তত ৩০টি স্থানে জলাবদ্ধতা হয়েছে বলে জানা গেছে। এবার বর্ষা মৌসুমে ভারী বর্ষণে দুর্ভোগ আরো বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। কারণ রাজধানীতে মেট্রোরেলের পাশাপাশি ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন, ওয়াসা, ডিপিডিসি, ডেসকোসহ বিভিন্ন সংস্থার উন্নয়ন কাজ চলমান রয়েছে। উন্নয়ন প্রকল্পের কারণে রাস্তা সংকুচিত হয়েছে। যান চলাচনের জন্য যেটুকু সড়ক আছে তাও খোঁড়াখুঁড়িতে খানাখন্দ তৈরি হয়েছে। জলাবদ্ধতার জন্য ওয়াসার দুর্বল পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থাকে দায়ী করছে সিটি করপোরেশন।
দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের এক কর্মকর্তা বলেছেন, সিটি করপোরেশনের ড্রেন মিশেছে ওয়াসা লাইনের সঙ্গে। ওয়াসা সময়মতো পানি নিষ্কাশন করতে পারে না। এতে পানি নিষ্কাশনে বিলম্ব হয়। ফলে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়।
নগর পরিকল্পনাবিদ স্থপতি ইকবাল হাবিব ইত্তেফাককে বলেন, প্রয়াত মেয়র আনিসুল হকের শেষ বৈঠকে জলাবদ্ধতা নিরসনে ২০১৭ সালের ১৫ জুন সুস্পষ্ট কিছু সিদ্ধান্ত হয়েছিল। বিভিন্ন মেয়াদি পদক্ষেপ গ্রহণ করে বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়ে জলাবদ্ধতা নিরসন করতে হবে। তখন বলা হয়েছিল, দুই সিটি করপোরেশনের মেয়রদের এর মূল দায়িত্ব নিতে হবে। ওয়াসাকে তার দায়িত্ব থেকে অব্যহতি দিয়ে বাজেটকে দুই ভাগ করে সিটি করপোরেশনকে দিয়ে দিতে হবে। ড্রেনেজ ব্যবস্থা ঢেলে সাজানো, ড্রেনেজ ইনটিগ্রেশন এবং খালগুলো এর সঙ্গে যুক্ত করে মহাপরিকল্পনা তৈরি করা, খালগুলো একক মালিকানায় সিটি করপোরেশনকে সোপর্দ করাসহ আরো দীর্ঘমেয়াদি অনেক পরিকল্পনা করা হয়। তবে এসব সিদ্ধান্তসমূহ বাস্তবায়নের যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল সেখানে এক ইঞ্চি কাজও হয়নি। গত দেড় বছরে ড্রেনেজ ব্যবস্থা উন্নয়নে দুই সিটি এবং ওয়াসা কিছু পাইলট প্রকল্প গ্রহণ করেছে। তবে সামগ্রিক উন্নয়নে অর্থাত্ পানি জলাধারে পৌঁছতে সমন্বিত পরিকল্পনা এবং বাস্তবায়নের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। খালগুলো উদ্ধারের নামে টাকা অপচয় হয়েছে।
