চীনা ভাষায় খেলার নাম, টু সু ছু পা। ওই ভাষায় ‘টু সু’ কথার অর্থ পা দিয়ে লাথি মারা। ‘ছু’ অর্থ চামড়ার তৈরি বল। পুরো অর্থ বোঝায় ‘চামড়ায় তৈরি বলকে পা দিয়ে লাথি মারো’। সংক্ষেপে ‘পায়ে বল মারা’। এই টু সু ছু পা থেকে কখনো কিমারী নামে, সেখান থেকে আবার হারপাস্টাম নামে। হারপাস্টাম থেকে ক্যালচিও এবং সবশেষে এখন সম্পূর্ণ পুরোদস্তুর ফুটবল বা আধুনিক সকার। নানা দেশ নানা গোষ্ঠী বিভিন্ন সময়ই এমনই নামে ফুটবলের আদলে এমন খেলা খেলতেন। যেখান থেকে বর্তমানে সারাবিশ্ব উন্মাদনায় পরিণত হয় ফুটবল বিশ্বকাপ। সবকিছুই পরিবর্তন হয় কিন্তু বল আগেও গোল এখনো গোল, পরিবর্তন হয়েছে শুধু বলের ধরনে। সেই ১৯৩০ থেকে আজ পর্যন্ত প্রতিটি বিশ্বকাপে অন্যতম চরিত্র হয়ে ওঠে বিশ্বকাপের বলটি। বিশ্বকাপের বলগুলো নিয়ে আলোচনা কম হয়নি। উরুগুয়েতে অনুষ্ঠিত প্রথম ১৯৩০ বিশ্বকাপের ফাইনালে ঘটেছিল অবাক করা কাণ্ড। সেবার ম্যাচের দুই অর্ধে ব্যবহার করা হয়েছিল দুটো বল। কারণ ফাইনালে মুখোমুখি দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী উরুগুয়ে ও আর্জেন্টিনা দুদলই খেলতে চেয়েছিল নিজ নিজ বল দিয়ে। সমাধান ছিল একটাই। প্রথমার্ধে আর্জেন্টিনার ‘১২ প্যানেল মডেল’ এবং দ্বিতীয়ার্ধে উরুগুয়ের ‘টি-মডেল বল’ দিয়ে খেলা হয়। ১৯৩৪ বিশ্বকাপে ইতালির তৈরি ‘ফেদেরেল ১০২’ বলটি প্রথম ফুটবল, যেটিতে চামড়ার বদলে সুতার সেলাই ব্যবহার করা হয়। পরবর্তী ১৯৩৮ বিশ্বকাপের বলটির আনুষ্ঠানিক কোনো নাম ছিল না। তবে ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত সেই বিশ্বকাপের বল বানানোর দায়িত্ব পেয়েছিল দেশটির ক্রীড়াসামগ্রী প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান এলেন। তারপর টানা ১২ বছর কোনো বিশ্বকাপ হয়নি বিশ্বযুদ্ধের কারণে। পরবর্তীতে ১৯৫০ সালের বিশ্বকাপের ‘ডুপ্লো টি’ নামের বল দিয়ে খেলা শুরু হলেও ১৯৫৪ সালের বিশ্বকাপে সুইস বলটিকে খাতা কলমে এবারের বিশ্বকাপের বল ব্রাজুকার প্রথম আনুষ্ঠানিক পূর্বসূরি মানা হয়। আসুন জেনে নিই বিভিন্ন প্রজন্মের উন্মাদনায় ভরা বিশ্বকাপ ফুটবলগুলো সম্পর্কে।
ব্রাজুকা
তিন বছরের নিবিড় গবেষণা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে অবশেষে উন্মোচন করা হয়েছে ২০১৪ ব্রাজিল বিশ্বকাপের অফিশিয়াল বল ব্রাজুকা। ব্রাজুকা শব্দটির মানে ব্রাজিলিয়ান। বলটির ওজন ৪৩৭ গ্রাম। গড়ন ছয় প্যানেলবিশিষ্ট। সহজ গ্রিপিং এবং মাঠের ঘাসের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার সক্ষমতা বলটির বিশেষত্ব।
১৯৫৪
সুইস
সুইজারল্যান্ডে অনুষ্ঠিত ১৯৫৪ বিশ্বকাপের অফিসিয়াল বল ছিল ‘সুইস’। বলটিতে প্রচলিত বাদামি রঙের বদলে হলুদ রং ব্যবহার করা হয়েছিল। বলটিকে ১৮টি প্যানেলে তৈরি করা হয়েছিল।
১৯৫৮
টপ স্টার
১৯৫৮ সালে সুইডেনে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপের অফিসিয়াল বল ছিল টপ স্টার। এই বলের গড়নও ছিল ১৮ প্যানেলের। ১৯৫৮ বিশ্বকাপে বাদামি এবং সাদা দুটি ভিন্ন রঙের টপ স্টার বল ব্যবহার করা হয়েছিল।
১৯৬২
ক্র্যাক টপ স্টার
বিশ্বকাপের অফিসিয়াল বল হিসেবে ব্যবহার করা হয় ক্র্যাক। এটি বলের ধাঁচে রীতিমতো বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে আসে। লম্বা অষ্টভুজ প্যানেল ব্যবহার করায় পাসিং, কিকের ওপর নিয়ন্ত্রণ বাড়ে।
১৯৬৬
চ্যালেঞ্জ ৪ স্টার
১৯৬৬ সালে ইংল্যান্ডে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপের অফিসিয়াল বল ‘চ্যালেঞ্জ’। বলটি ১৯৫৮ বিশ্বকাপে ব্যবহূত ‘টপ স্টার’ বলের আদলে তৈরি করা হয়েছিল। পার্থক্য বলতে ছিল চ্যালেঞ্জের কমলা রং।
১৯৭০
টেলস্টার
অ্যাডিডাসের বল দিয়ে খেলা হয় প্রথম বিশ্বকাপ। টেলিস্টার নামকরণ করা হয়েছিল টেলস্টার স্যাটেলাইটের নামে। অ্যাডিডাসের বলটি ৩২টি সাদা-কালো প্যানেলে তৈরি করা হয়।
১৯৭৪
ডারলাস্ট
১৯৭৪ বিশ্বকাপের অফিসিয়াল বল অ্যাডিডাসের চিলি ডারলাস্ট। ১৯৬৪ চিলি বিশ্বকাপের সাদা বলের আদলে প্রস্তুত করা বলটি ছিল পুরোপুরি সাদা-কালো।
১৯৭৮
ট্যাংগো ডারলাস্ট
অ্যাডিডাসের ট্যাংগো ডারলাস্টের আবির্ভাব ফুটবলে রীতিমতো বিপ্লব ঘটিয়ে দেয়। ৩২ প্যানেলের বলটির ২০টি প্যানেলে প্রায় ত্রিভুজাকৃতির ছোপ ব্যবহার করা হয়েছিল।
১৯৮২
ট্যাংগো এসপানা
১৯৮২ সালের স্পেন বিশ্বকাপের অফিশিয়াল বল ট্যাংগো এসপানা। বলটিকে বিশেষভাবে পানি প্রতিরোধক করে তৈরি করা হয়েছিল। ট্যাংগো এসপানা ছিল চামড়ার তৈরি সর্বশেষ বল।
১৯৮৬
অ্যাজটেকা
১৯৮৬ বিশ্বকাপের অফিশিয়াল বল হিসেবে দেখা মেলে সম্পূর্ণ নতুন ধরনের বল অ্যাজটেকার। বলটি ছিল হাতে সেলাই করা প্রথম বল। বলটির বাইরের অংশে পলিইউরেথেনের প্রলেপ দেওয়া ছিল।
১৯৯০
এতরুসকো
ইতালিতে অনুষ্ঠিত ১৯৯০ বিশ্বকাপে অ্যাডিডাসের বানানো প্রথম উচ্চ-প্রযুক্তির বল। এই বলে লেটেক্স, নিওপ্রিন এবং পলিইউরেথেন ব্যবহার করা হয়েছিল। এতে ২০টি এতরুসকিয়ান সিংহের মাথার ছবিও আঁকা ছিল।
১৯৯৪
কুয়েস্ট্রা
আমেরিকায় অনুষ্ঠিত ১৯৯৪ ফিফা বিশ্বকাপের অফিশিয়াল বল কুয়েস্ট্রা। পুরো বলটি মোড়ানোর জন্য ব্যবহার করা হয়েছিল পলিস্টাইরেন ফোমের প্রলেপ। হালকা হওয়ায় নিয়ন্ত্রণে বাড়তি সুবিধা যোগ করেছিল।
১৯৯৮
ত্রিকলোর
১৯৯৮ ফ্রান্স বিশ্বকাপের অফিশিয়াল বল ত্রিকলোর (ট্রাইকালার তিন রঙা) ব্যবহার করা হয়েছিল ফ্রান্সের জাতীয় পতাকার তিনটি রং লাল-সাদা-নীল। এটিই বিশ্বকাপ ইতিহাসের প্রথম রঙিন বল।
২০০২
ফিভারনোভা
নতুন শতাব্দী, নতুন বল! ১৯৭৮ সাল থেকে প্রচলিত ট্যাংগো মডেলের ধারা ভেঙে নতুন বল হিসেবে আবির্ভাব ঘটে ফিভারনোভার। বলটির সোনালি এবং লাল রং এশিয়ার সংস্কৃতি এবং বিপ্লবের প্রতীক।
২০০৬
টিমজিস্ট
জার্মানিতে অনুষ্ঠিত ২০০৬ বিশ্বকাপের বল টিমজিস্ট। জার্মান শব্দ টিমজিস্টের মানে দলীয় সংহতি। ১৯৭০-এর বিশ্বকাপ থেকে প্রচলিত প্রথাগত ৩২টি প্যানেলের বদলে এই বলে ব্যবহার করা হয় ১৪টি প্যানেল।
২০১০
জাবুলানি
বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত বল এটিই। জুলু শব্দ জাবুলানির মানে উদযাপন। জাবুলানি বলে সাদা পটভূমির ওপর ১১টি ভিন্ন রঙের ত্রিভুজ প্রতিকৃতি ব্যবহার করা হয়।
