ফুটবলার

আপডেট : ২৯ জুন ২০১৪, ২০:১৯
চলছে টান টান উত্তেজনাময় ফুটবল বিশ্বকাপ। আর এই বিশ্বকাপকে সামনে রেখে পুরো বিশ্ব মেতে উঠেছে ফুটবলের রঙ্গে। পিছিয়ে নেই আমাদের দেশের ফুটবলারও। বিশ্বকাপের খেলা থেকেই নিজেদের উজ্জীবিত করছেন। প্রত্যাশা ও প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন স্বপ্নের বিশ্বকাপে একদিন বাংলাদেশকে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে। তাই এ প্রজন্মের মেধাবী কয়েকজন ফুটবলারদের নিয়ে আমাদের এবারের আয়োজন। গ্রন্থনা করেছেন রিয়াদ খন্দকার ও আহসান রনি জাহিদ হোসেন এমিলি স্ট্রাইকার, বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দল ও মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব ছোটবেলায় খুবই চটপটে ছিলেন। ৫ ভাই ও ১ বোনের মধ্যে তিনিই ছিলেন সবচেয়ে দুষ্টু। দৌড়াদৌড়ি-লাফালাফি ছিল তার সারাদিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। বাবা-মা তাই চিন্তায় থাকতেন—এই ছেলের কী হবে। বলা হচ্ছে দেশসেরা ফরোয়ার্ড মো. জাহিদ হাসান এমিলির কথা। তার বড় ভাই লিটন খান একসময়কার ব্রাদার্স ইউনিয়ন ক্লাবের ক্যাপ্টেন। ছোট ভাইয়ের দুষ্টুমি তিনি যেমন দেখতেন তেমনি দেখতেন ফুটবল খেলার প্রতি তার ঝোঁক। তাইতো বাবা-মাকে রাজি করিয়ে দুষ্টু ছেলেকে সোজা করার জন্য ভর্তি করিয়ে দেওয়া হলো বিকেএসপিতে। সাল ১৯৯৯। তিনি ক্লাস সেভেনে ভর্তি হলেন বিকেএসপিতে। তারপর থেকেই নিয়মিত ফুটবলের অনুশীলন শুরু। ছোট হলেও তার খেলা দেখে মুগ্ধ হতেন সকলে। তাই অল্প সময়ের মধ্যেই আন্ডার-১৪ টিমে চান্স পেয়ে গেলেন তিনি। দলের হয়ে বিমান কাপের সর্বোচ্চ গোলদাতা হন। এরপর ২০০১ সালে চান্স পেয়ে যান আন্ডার-১৬ টিমে। তার ভালো খেলার ধারা অব্যাহত থাকে। ২০০২ সালে আন্ডার-২০ টিমে তিনি চান্স পান মাত্র ১৭ বছর বয়সে। সেই বছরই তার ক্লাব ক্যারিয়ার শুরু হয়। বাংলাদেশের সেরা প্রায় সব ক্লাবে খেলেছেন তিনি। শুরু করেন ব্রাদার্স ইউনিয়ন দিয়ে। তার সক্রিয় অংশগ্রহণে ২০০৪ ও ২০০৫ সালের লীগ চাম্পিয়ন হয় ব্রাদার্স। এরপর তিনি চান্স পান আন্ডার-২৩ টিমে। ২০০৫ সালে আসে তার কাঙ্ক্ষিত দিন। জাতীয় দলে ডাক পান এই প্রতিভাবান খেলোয়াড়। তিনি আবাহনী, শেখ জামাল, শেখ রাসেল, মুক্তিযোদ্ধা ও মোহামেডানের হয়ে খেলেছেন এবং বর্তমানে স্থির হয়েছেন মোহামেডানে। গতবছর রেকর্ড পারিশ্রমিকে মোহামেডানে যোগ দেন তিনি। তিনি বলেন, ‘পৃথিবীর এক নম্বর খেলা ফুটবল। তাই এই খেলার একজন হতে পেরে আমি গর্বিত। আরও বেশি গর্ববোধ করি যখন আমি দেশের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করি।’ তিনি মনে করেন, সরকারের উচিত ফুটবলের দিকে আরও বেশি নজর দিয়ে এই খেলাকে এক নম্বর অবস্থানে নিয়ে যাওয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা করা। খেলার প্রতি এদেশের মানুষের ভালোবাসা আছে বলে বিশ্বাস তার। যদি সরকার ফুটবল কাঠামো উন্নয়নের জন্য সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণ করে তবে আমাদের দেশের তরুণপ্রজন্ম আরও বেশি ভালো করবে বলে বিশ্বাস করেন তিনি। তার স্ত্রী তারানা হাসান এখনও পড়াশোনা করছেন। তাকে নিয়েই তার ছোট সংসার। তিনি চান, যতদিন সম্ভব দেশের প্রতিনিধিত্ব করতে এবং নিজের দেশের ফুটবলকে পৃথিবীর কাছে পরিচয় করিয়ে দিতে। জাহিদ হোসেন এমিলি ডাকনাম :এমিলি জন্ম তারিখ ও স্থান :২৫ ডিসেম্বর, ১৯৮৭ ও পিরোজপুর মায়ের নাম :মিসেস হাওয়া বেগম বাবার নাম :মো. ইদ্রিস আলী প্রথম স্কুল :দাউদপুর পল্লী মিলন মাধ্যমিক স্কুল প্রিয় মানুষ :মা প্রিয় পোশাক :জিন্স প্যান্ট ও শার্ট সাফল্যের সংজ্ঞা :এমন একটি অবস্থানে পৌঁছানো, যার ফলে মানুষ মনে রাখে। ০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০ মো. ওয়ালী ফয়সাল ডিফেন্ডার, বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দল ও আবাহনী ক্রীড়াচক্র যখন তিনি ৩য় বা ৪র্থ শ্রেণীতে পড়েন তখন আবাহনী-মোহামেডানের রাজত্ব। নিজের প্রিয় দলের ফ্লাগ নিয়ে ঘুরে বেড়াতেন সেই সময়। মামা আবদুল্লাহ পারভেজ বিজেএমসি-এর খেলোয়াড় ছিলেন। তার মাধ্যমেই খেলাধুলায় হাতেখড়ি হয় বাংলাদেশ জাতীয় দলের নির্ভরযোগ্য ডিফেন্ডার মো. ওয়ালী ফয়সালের। চারদিকে ফুটবল খেলা দেখে ছোট থেকে তার মধ্যে জিদ তৈরি হয় ভালো ফুটবল খেলে ক্লাবে চান্স পাওয়ার। কোচ আজমল খন্দকার বিদ্যুত্ তার খেলা দেখে অনেক প্রশংসা করেন। পরিবার না চাইলেও তিনি খেলাধুলা চালিয়ে যেতে থাকেন। আজিমখানা মাঠে তার খেলা দেখে প্রয়াত ফুটবলার মোমেন মুন্না মুগ্ধ হন এবং তাকে আবাহনীর জুনিয়র টিমে আসার আমন্ত্রণ জানান। তিনি তখন শহীদ নুর হোসেন পাইওনিয়ন ক্লাবের হয়ে খেলতেন। পরবর্তীতে ওয়ারী ক্লাবের জুনিয়র টিমের হয়ে খেলেন তিনি। ২০০৩ সালে তিনি যোগ দেন প্রিয় ক্লাব আবাহনীতে। প্রথম বছর সেরকম চান্স না পেলেও ২০০৩ ও ২০০৪ সালে মূল দলের হয়ে খেলার সুযোগ পান এবং অসাধারণ পারফর্মেন্স দেখান। এরই ফলে ২০০৫ সালে ডাক পান জাতীয় দলে। জাতীয় দলে খেলার অভিজ্ঞতাকে জীবনের সেরা অভিজ্ঞতা বলে জানিয়ে তিনি বলেন, দেশের হয়ে যখন তিনি কোনো ভালো দলকে হারিয়েছেন তখনই গর্বে বুক ভরে গেছে তার। দেশের হয়ে সবসময় ভালো পারফর্মেন্স দেখিয়ে তিনি দলের অপরিহার্য সদস্যে পরিণত হয়েছেন। আবাহনীর পাশাপাশি ওয়ালী মোহামেডান, শেখ জামালে খেলেছেন। তিনি মনে করেন ভালো খেলার জন্য অনেক পরিশ্রম করতে হয়। ফুটবলের প্রতি ভালোবাসা তৈরি হওয়ার পর ফুটবল খেলার জন্য সকলকে উপদেশ দেন তিনি। তার মতে, ফুটবল খেলাটিকে ভালোবাসলেই এই খেলায় ভালো করা যায়। এদিকে ২০০৯ সালে আফরোজা সুলতানাকে বিয়ে করে নারায়ণগঞ্জে সংসার পেতেছেন তিনি। তার আশা, বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের প্রেসিডেন্ট মো. সালাহউদ্দীনের ২০২২ সালের মধ্যে বিশ্বকাপ খেলার লক্ষ্য অর্জনের স্বপ্নটি সত্যি হবে। ফুটবলের কল্যাণে এই খেলার সাথে জড়িত সকলকে এগিয়ে এসে এই খেলার উন্নয়নে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি। তিনি আশা করেন, দর্শকরা তাদের সাপোর্ট দিয়ে এদেশের ফুটবল খেলার ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনবে। মো. ওয়ালী ফয়সাল ডাকনাম :ওয়ালী ও ফয়সাল জন্ম তারিখ ও স্থান :১ মার্চ, নারায়ণগঞ্জ মায়ের নাম :খোদেজা বেগম বাবার নাম :নিজাম উদ্দীন প্রথম স্কুল :পাইকপাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রিয় মানুষ :মামা প্রিয় উক্তি :মাকে ভালোবাসি প্রিয় পোশাক :প্যান্ট ও টি-শার্ট অবসর কাটে যেভাবে :গান শুনে ও টিভি দেখে সাফল্যের সংজ্ঞা :কষ্ট করে কিছু অর্জন করাই সাফল্য। ০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০ মো. মামুনুল ইসলাম মামুন অধিনায়ক, বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দল ও শেখ জামাল স্পোর্টিং ক্লাব চট্টগ্রাম শহরের কদমতলীতে বেড়ে উঠেছেন তিনি। ক্রীড়া সংগঠক বাবার বড় ছেলে বিধায় ছোট থেকে খেলাধুলার প্রতি সম্পৃক্ততা তৈরি হয় জাতীয় দলের বর্তমান অধিনায়ক মো. মামুনুল ইসলাম মামুনের। দুই মামা ফুটবলার ছিলেন আর এক মামা ছিলেন দেশসেরা দৌড়বিদ। দুই মামা মাধ্যমেই ফুটবলে হাতেখড়ি। ক্রীড়া পরিবার বিধায় বাবাও তাকে প্রথম গিফট দেন ফুটবল এবং ক্রিকেটের বল ও ব্যাট। সকলের অনুপ্রেরণায় তাই ৫-৬ বছর থেকেই খেলাধুলার শুরু হয়েছিল মামুনের। বাড়ি সকলেই খেলাধুলা অন্তঃপ্রাণ বিধায় ক্লাস ফাইভেই তাকে ভর্তি করে দেওয়া হলো বিকেএসপিতে। অত ছোট বয়সে ফুটবল নেওয়া যায় না বিধায় তিনি ভর্তি হন জিমন্যাস্টিকে। তিন বছর পর ২০০০ সালে তিনি ফুটবলে ভর্তি হন। আগে ফুটবল খেললেও নিয়মিত প্র্যাকটিস ও নিজেকে ঝালিয়ে নেওয়ার কাজ শুরু হয় এই সময় থেকেই। তিনিও কঠোর পরিশ্রম করেছেন। এরই ফলে ২০০৩ সালে ডাক পান আন্ডার ১৭ দলে। ২০০৪-০৫ খেলেছেন আন্ডার ১৯ দলে এবং ভালো পারফর্মেন্সের ধারাবাহিকতায় ২০০৬ সালে চান্স পান আন্ডার ২৩ দলে। এই সময়ই অসাধারণ পারফর্মেন্স দেখিয়ে চান্স পেয়ে যান জাতীয় দলে ২০০৭ সালে। নিজের ধারাবাহিক ভালো পারফর্মেন্স ও নেতৃত্ব গুণ থাকার কারণে তাকে বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের কোচ নির্বাচিত করা হয়েছে। তিনি শেখ জামাল ধানমন্ডি ক্লাবেরও অধিনায়ক। তার নেতৃত্বে ঈর্ষণীয় সাফল্য অর্জন করেছে শেখ জামাল। তিনি যেই ক্লাবের হয়েই খেলেছেন সেই ক্লাবের সাফল্য বয়ে এনেছেন। মামুন ব্রাদার্স ইউনিয়ন, আবাহনী, মোহামেডান, শেখ জামাল, মুক্তিযোদ্ধা ক্রীড়া চক্র ও শেখ রাসেলের হয়ে খেলেছেন। দেশের ফুটবলকে এগিয়ে নিতে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন ও ক্লাব সংগঠকদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি। তিনি মনে করেন, সঠিক ও সময়োপযেগী পরিকল্পনা নিতে পারলে খুব কম সময়ের মধ্যেই এদেশের ফুটবল একটি ভালো অবস্থানে পৌঁছতে পারবে। তিনি নবীনদের নিয়ে আশাবাদী। ঠিকমতো পরিচর্চা পেলে তারা এদেশের ফুটবলকে বিশ্বকাপের ময়দানে খুব দ্রুতই নিয়ে যেতে পারবে বলে মনে করেন মামুন। তরুণদেরকেও অনেক পরিশ্রম করার পরামর্শ দেন তিনি। স্ত্রী সাদিয়া সুস্মিতা আইইউবিতে বিবিএ পড়ছেন। তাকে নিয়েই সুখের সংসার তার। নিজের ভবিষ্যত্ স্বপ্নের কথা বলতে গিয়ে তিনি জানান, দেশের হয়ে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ জিততে চান। এশিয়ার মধ্যে অন্যতম সেরা দল হিসেবে বাংলাদেশকে প্রতিষ্ঠিত করার স্বপ্নে বিভোর এই প্রতিভাবান ফুটবলার। মো. মামুনুল ইসলাম মামুন ডাকনাম :মামুন জন্ম তারিখ ও স্থান :১২ ডিসেম্বর, চট্টগ্রাম মায়ের নাম :উম্মে কুলসুম বাবার নাম :আলহাজ্জ্ব নুরুল ইসলাম নুরু প্রথম স্কুল :রেলওয়ে পাবলিক স্কুল, চট্টগ্রাম প্রিয় মানুষ :হযরত মুহাম্মদ (সা.) প্রিয় উক্তি :সদা সত্য কথা বলিবে। প্রিয় পোশাক :জিন্স ও টি-শার্ট অবসর কাটে যেভাবে :গান শুনে ও ফ্যামিলির সাথে সময় দিয়ে সাফল্যের সংজ্ঞা :কঠোর পরিশ্রম।