ফতোয়া :পূর্ণাঙ্গ রায় তিন বছরেও প্রকাশ হয়নি

আপডেট : ৩০ জুন ২০১৪, ২২:৪৪
‘ফতোয়া’ প্রদান নিয়ে আপিল বিভাগ ঘোষিত রায় তিন বছরেও পূর্ণাঙ্গ আকারে প্রকাশ করা হয়নি। কবে নাগাদ রায়টি প্রকাশ পাবে তা-ও বলতে পারছে না কেউ। তবে একটি সূত্র জানিয়েছে, রায় লেখা নাকি শেষ হয়েছে। এদিকে এই রায় দ্রুত প্রকাশ করার আহবান জানিয়েছেন আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মীরা। তারা মনে করেন, পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ পেলে কোন বিষয়ে কারা ফতোয়া দিতে পারবেন তার সুস্পষ্ট ধারণা পাওয়া যেত। এ ব্যাপারে বার কাউন্সিলের মানবাধিকার কমিটির সাবেক চেয়ারম্যান এডভোকেট জেড আই খান পান্না ইত্তেফাককে বলেন, সুনির্দিষ্ট কারণ ছাড়া রায় প্রকাশে এত বিলম্ব ন্যায়বিচারের পরিপন্থি। রায়টি প্রকাশ পেলে ফতোয়ার মাধ্যমে দেশে যেভাবে নারী নির্যাতিত হচ্ছে সেটা কমার সম্ভাবনা ছিল। ফতোয়া অবৈধ ঘোষণা করে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে করা আপিল সংখ্যাগরিষ্ঠের মতের ভিত্তিতে মঞ্জুর করে ২০১১ সালের ১২ মে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ সংক্ষিপ্ত রায় ঘোষণা করে। রায়ে বলা হয়, যথাযথ শিক্ষিত ব্যক্তিরাই শুধুমাত্র ধর্মীয় বিষয়ে ফতোয়া দিতে পারবেন। তবে ফতোয়ার নামে কোন ব্যক্তিকে শারীরিক ও মানসিক শাস্তি দেয়া যাবে না বলে অভিমত দেয় আপিল বিভাগ। তবে হাইকোর্ট সব ধরনের ফতোয়া অবৈধ ঘোষণা করলেও আপিল বিভাগের রায়ে তা বাতিল করা হয়েছে। তত্কালীন প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হকের নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের ছয় বিচারপতির বেঞ্চ সংক্ষিপ্ত এ রায় ঘোষণা করেন। তবে এ রায়টি সর্বসম্মত ছিল না। আপিল বিভাগের আদেশে বিষয়টি উল্লেখ করা হলেও কয়জন বিচারপতি দ্বিমত পোষণ করেছেন তা প্রকাশ করা হয়নি। তবে সূত্র জানিয়েছে, একজন বিচারক একটি আইনগত প্রশ্নে এ রায়ের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছেন। পরে আপিল বিভাগের বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন মূল রায়টি লিখেন। পূর্ণাঙ্গ এ রায়টি তিনি ইতিমধ্যে প্রধান বিচারপতি মো. মোজাম্মেল হোসেনের কাছে জমা দিয়েছেন বলে জানা গেছে। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে অতিরিক্ত এটর্নি জেনারেল এডভোকেট মুরাদ রেজা ইত্তেফাককে বলেন, রায় এখনো আমাদের হাতে এসে পৌঁছায়নি। সুপ্রিম কোর্ট খোলার পর এ বিষয়ে আরো বিস্তারিত জানতে পারব। প্রসঙ্গত, ২০০০ সালে নওগাঁ জেলার মৌলভী আজিজুল হক এক ব্যক্তির স্ত্রীর তালাক দেয়ার ঘটনায় ফতোয়া জারি করেন। বিষয়টি সংবাদপত্রে প্রকাশিত হলে তা হাইকোর্টের দৃষ্টিতে আসে। আদালত এ ঘটনায় সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে স্ব:প্রণেদিত হয়ে রুল জারি করে। ২০০১ সালের জানুয়ারি মাসে ফতোয়া অবৈধ ঘোষণা করে রায় দেয় হাইকোর্ট। বিচারপতি গোলাম রাব্বানী ও বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানার সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ ফতোয়াকে অবৈধ ও আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করেন। হাইকোর্টের রায়ে বলা হয়, একমাত্র আদালতই মুসলিম বা অন্য কোনো আইন অনুযায়ী ব্যাখ্যা বা মতামত দিতে পারে। আইন বহির্ভূতভাবে কেউ ফতোয়া দিলে তা ফৌজদারি কার্যবিধির ১৯০ ধারা অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। এই রায়ের বিরুদ্ধে মুফতি মো. তৈয়ব ও মাওলানা আবুল কালাম আজাদ ওই বছরই আপিল করেন। আপিল দায়েরের দশ বছর পর ২০১১ সালের মার্চ মাসে এর ওপর শুনানি শুরু হয়। আপিলের শুনানিতে অ্যামিকাসকিউরি হিসেবে শীর্ষ নয় আইনজীবী ও পাঁচ আলেমের মতামত নেয় আপিল বিভাগ। আপিলের শুনানি শেষে ওই বছরের ১২ মে আপিল বিভাগ সংখ্যাগরিষ্ঠ মতের ভিত্তিতে চারটি পর্যবেক্ষণ দিয়ে সংক্ষিপ্ত রায় ঘোষণা করে। আপিল বিভাগের রায়ে বলা হয়, সংখ্যাগরিষ্ট মতাতের ভিত্তিতে দুটি আপিল আংশিকভাবে মঞ্জুর করা হলো। পর্যবেক্ষণগুলো হলো: ১. ধর্মীয় বিষয়াদিতে শুধুমাত্র শিক্ষিত ব্যক্তিগণ ফতোয়া দিতে পারবেন। যা স্বেচ্ছায় গ্রহণ করা যাবে। কিন্তু কোন রকমের বল প্রয়োগ বা অনুচিত প্রভাব প্রয়োগ করা যাবে না। ২. কোন ব্যক্তির অধিকার, মর্যাদা বা সম্মান (যা দেশের আইনের গন্ডির আওতায় আসে) বিনষ্ট করে এমন ফতোয়া দেয়া যাবে না। ৩. ফতোয়া ব্যবহার করে কোন ধরনের শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন কোন ব্যক্তির ওপর আরোপ করা যাবে না। ৪. তবে ওই নির্দিষ্ট ফতোয়াটি (যা হাইকোর্ট অবৈধ বলেছে) অবৈধ ও আইনগত কর্তৃত্ব বহির্ভূত ঘোষণা করা হলো।