বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারকে আরো কঠোর হতে হবে

আপডেট : ০২ জুলাই ২০১৪, ২১:০৩
মাহে রমজানে দ্রব্যমূল্য এবং চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণে সরকার কড়া পদক্ষেপ নিয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকেও দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে কঠোর নির্দেশ দেয়া হয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ব্যবসায়ীদের সাথে দফায় দফায় বৈঠক করেছে; পণ্যবাহী ট্রাকে চাঁদাবাজি ঠেকাতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়েছে। সারাদেশে দ্রব্যমূল্য সহনীয় রাখা ও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিভাগীয় এবং জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে কাজ করছেন সংশ্লিষ্ট প্রশাসন। কিন্তু তাতেও কি দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে আছে? প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় আর জেলা প্রশাসনের তাবত্ হুমকি-ধমকিকে কি পাত্তা দিলো ব্যবসায়ীরা? একদিনের ব্যবধানে এবারের রমজানে কাঁচামরিচ ও বেগুনের দাম বেড়ে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। প্রথম রোজায় ৪০ টাকার শসা বিক্রি হয়েছে প্রতিকেজি ৭০ থেকে ৮০ টাকা। কাঁচামরিচ ৫৫ থেকে ৬৫ টাকা দরে বিক্রি হলেও চলতি রমজান মাসে বিক্রি হচ্ছে ১০০ থেকে ১২০ টাকা কেজি দরে। আর ৫০ টাকার বেগুন বিক্রি হচ্ছে প্রতিকেজি ১০০ টাকা দরে। মাছ-মাংসের দামও বেড়েছে। কেজিপ্রতি পাঙ্গাস ১২০-১৪৫, সিলভার কার্প ১৫০-১৬০, শিংমাছ ৫০০-৬২০, তেলাপিয়া ১৫০-১৭০, দেশি মাগুর ৬০০-৮০০, চায়না পুঁটি ১৫৫-১৯০। দেশি আলু (লাল) ৪০, করলা ৫০-৬০, পটোল ৫০, কাকরোল ৪৫-৫০, চিচিঙ্গা ৪০-৫০, মিষ্টি কুমড়া ২৫-৩০, লাউ ৪০-৬০, কচুর লতি ৪০-৫০, গাঁজর ৪০-৫০ টাকা, পেঁপে ৪০-৪৫ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। এটাই বর্তমানে রাজধানীর বিভিন্ন বাজারের হালচিত্র। শুধু তরি-তরকারি নয়, ছোলা, খেজুর, মাছ-মাংস সবকিছুর দামই এখন বেশ চড়া। এখন দেশে অতি খরা নেই, নেই অতিবৃষ্টি, নেই হরতাল-অবরোধও। তাহলে কেন এভাবে বাড়লো পণ্যমূল্য? রোজার মাসে বেশ কিছু পণ্যের চাহিদা অন্য মাসের চেয়ে বেড়ে যায়। চাহিদা অনুযায়ী পণ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে নানামুখী উদ্যোগ নেয়া সত্ত্বেও তার সুফল অনেক সময় ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায় পরিবহন চাঁদাবাজি ও মজুদদারীর কারণে। এবারও বেড়েছে। চলতি সরকারের অধীনেই গত রমজানে বাজার অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে ছিলো। এবার নেই। সিয়াম সাধনার মাসে নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় ক্ষুব্ধ ক্রেতারা। প্রতিবছর রোজা আসে; বাড়ে জনগণের নাভিশ্বাস। এটা নতুন নয়। ঈদ আর রোজা মানেই পণ্যমূল্যের দাম বেড়ে যাওয়া। এটা দ্রব্যমূল্য বাড়ারই মওসুম। দীর্ঘদিন ধরে এটাই চলে আসছে এদেশে। এ বছরও তার ব্যতিক্রম হয়নি। রোজা শুরু হতেই দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন পাগলা ঘোড়া ছুটছে তো ছুটছেই। বর্তমানে অস্থির হয়ে উঠেছে বাজার। কোনই সুখবর নেই। চাল, ডাল, তেল, পেঁয়াজ, রসুন, ডিম, আলু, খেজুর, মাছ, মাংস, মসলা, কাঁচামরিচ, শাকসবজি, ফলমূলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রতিটি পণ্যের দাম বেড়েছে। সংযম নয় এ যেন ব্যবসায়ীদের বেশি আয়ের মহাউত্সব। নিত্যপ্রয়োজনীয় হেন পণ্য নেই যে গায়ে মূল্যবৃদ্ধির উত্তাপ নেই—তফাত্টা শুধু ডিগ্রির, কোনোটার বেশি কোনোটার কম। নতুন বাজেটের পরও পণ্যবাজারে তার বিরূপ প্রভাব পড়েনি। তাই সরকারি মহল স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেছিলো। কিন্তু কয়েকটা দিন পার না হতেই রমজানের আগমনী বার্তায়, কারণ ছাড়াই নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির উত্তাপ লাগে। রমজান উপলক্ষে কতক বিশেষ পণ্যের চাহিদা বাড়ে। ভোজ্যতেল, চিনি, ছোলা, মসুর, পিঁয়াজ, রসুন, আদা, নানারকম গরম মশলার চাহিদা বেড়ে যায় অনেক। চাহিদা বাড়ে মাছ, মাংস, দুধের। আর ব্যবসায়ী-মজুদদাররা ধরেই নেয়, মুনাফায় পকেট ভারি করার মওকাই হচ্ছে সিয়াম সাধনার মাস পবিত্র রমজান। রমজানে দুটো পয়সা কামিয়ে নিতে এরা কোমর বেঁধে প্রস্তুতি নেয় পূর্বাহ্নেই। মজুদ গড়ে তোলে, দফায় দফায় মূল্য বাড়িয়ে সাধারণ ভোক্তাদের নাভিশ্বাস তুলে ছাড়ে। এসব মুনাফাখোর এদেশের অসহায় মানুষের কথা ভাবে না। রোজায় নিম্নআয়ের মানুষ তাদের চাপিয়ে দেয়া দাম দিয়ে খাবার কিনতে পারছে না। ওরা ২ বেলা পেটপুরে খেতে পারছে না। আসলে মানুষকে জিম্মি করে অধিক মুনাফা লাভের ব্যবসায়ীদের এই খেলা কোন সরকারই বন্ধ করতে পারে না, একথা কেউ বিশ্বাস করবে না। সরকারের সদিচ্ছা থাকলে এই খেলা বন্ধ করা অবশ্যই সম্ভব, কিন্তু এই সম্ভবকে অসম্ভবের হাত থেকে বাঁচাতে সরকারকে অবশ্যই হার্ড লাইনে চলতে হবে। প্রথমে চিহ্নিত করতে হবে সেই সকল অসাধু ব্যবসায়ীকে যারা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে তাদের সকল বিবেকহীন আয়োজন সম্পূর্ণ করেছে। অর্থনীতিতে একটা কথা আছে, চাহিদার তুলনায় উত্পাদন যতো কম হবে পণ্যের দাম বাজারে ততো বেশি হবে। মুক্তবাজার অর্থনীতিতে বাজার নিয়ন্ত্রণ করা সহজ কাজ নয়। সেনানিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও চারদলীয় জোট সরকার এবং বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকারের সময় দেখেছি, যতবার পণ্যের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে, ততবার বাজারে মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে। ব্যবসায়ীরা সরকারকে বারবার আশ্বাস দিচ্ছে, রোজার মধ্যে পণ্যের দাম বাড়বে না। কিন্তু বাস্তবে তা তামাশা মাত্র! তার কোনো প্রভাব বাজারে পড়েনি কখনো। দেশব্যাপী ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা অসংখ্য অসত্ ব্যবসায়ী সবসময়ই বেপরোয়া। তারা মন্ত্রী, সচিব, ডিসি, এসপিদের ছোঁড়া হুংকারকে দিব্যি ধিক্কার দিয়ে চলেছে। অসত্ বৃহত্ ব্যবসায়ীদের একটি গোষ্ঠী বরাবরই পণ্যমূল্য বাড়িয়ে তাদের পকেট স্ফীত করে চলেছে। এর একটা বিহিত হওয়া দরকার। দ্রব্যমূল্যের নিয়ন্ত্রণ সরকারকে যেকোন মূল্যে নিতেই হবে। এজন্য বিরোধীদলগুলোকেও সাহায্যের হাত বাড়িয়ে এগিয়ে আসতে হবে। এভাবে অহেতুক পণ্যমূল্য বাড়ার ঘটনা বোধকরি কোন সভ্য সমাজে ঘটে না। অন্য কোন দেশেও তার নজির নেই। এভাবে আর চলতে পারে না। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে এখনই ওদের রুখতে হবে। সরকার, জনগণ দলমত নির্বিশেষে ওদের উপর দুর্বারগতিতে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে। প্রতিবাদী হতে হবে। বাজার নিয়ন্ত্রণে এর আর বিকল্প আছে বলে আমি মনে করি না। লেখক :সাংবাদিক [email protected]