সবাই যেন এক পরিবার। অথচ কারো বাড়ি বগুড়া, কারো নওগাঁ আবার কেউবা নরসিংদী, দিনাজপুরের। কিন্তু সারাদিন পর রোজা খুলতে হয়ে উঠেছেন এক পরিবারের সদস্য।
কি মহব্বত! একসাথে মিলেমিশে একপাত্র থেকেই ইফতার সারছেন সবাই।
দৃশ্যটি কাওরানবাজারের। গতকাল বুধবার ইফতারের সময় ওয়াসা ভবনের পিছনের টিনসেড ছাপড়ার আড়তে গোল হয়ে বসে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সবজি ব্যবসায়ীরা একসাথে ইফতার করছেন। শুধু এই সবজি ব্যবসায়ীরাই নন, পুরো কাওরানবাজার জুড়েই বিভিন্ন স্থানে রোজাদাররা গোল হয়ে বসে ইফতার করছেন। অনেকে আড়তে বসে, কেউ খোলা আকাশের নিচে বসে, আবার রিকশা-ভ্যান চালান এমন অনেকেই ভ্যানের উপর বসেই ইফতার করছেন। তাদের সাথে যোগ দিচ্ছেন পথ চলতি অনেক মানুষও যারা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ঘরে ফিরতে পারেননি।
কি দিয়ে ইফতার করছেন সবাই? খুব বেশি কিছু নয় মুড়ি, ছোলা, পেঁয়াজু আর বেগুনি। সবকিছু একসঙ্গে মাখিয়ে ইফতারি বানানো হয়েছে। কিন্তু কি পরম মমতায় ইফতারি খাচ্ছেন সবাই। রোজা খোলার আগে আগে তখনো আজান দেয়নি। এক প্রবীণ ফটো সাংবাদিক মুড়ি ও জিলাপি কিনে কাওরানবাজারের মসজিদে ঢুকলেন। বের হওয়ার পর জিজ্ঞেস করলামঃ কি করলেন? বললেনঃ মসজিদে দিলাম। কত মানুষ রোজা থাকে- ইফতার করবে।
তিনি বলেন, তার বাবা-দাদাও রোজার সময় প্রতিদিন মসজিদে মুড়ি ও জিলাপি দিতেন। তাই আমিও দেই। পুরো রমজান জুড়েই আমি মসজিদে মুড়ি ও জিলাপি দেব।
এরইমধ্যে আজান পড়েছে। সবাই যে যার মতো ছুটোছুটি করে নিজেদের ইফতারির নির্দিষ্ট জায়গায় গেলেন।
আযান পড়ায় কাওরানবাজারে বাস থেকে নেমে অনেকেই বাজারের দিকে ছুটে এলেন।
জিজ্ঞেস করতেই একজন বললেনঃ বাসা মিরপুর। রোজা খুলতেই এখানে নেমেছেন। মুখেতো একটু পানি দিতে হবে। শুধু তিনি নন, তার মতো অনেকেই এখানে বাস থামিয়ে নেমেছেন ইফতার করতে।
পরিবার ছাড়া ইফতার করতে খারাপ লাগছে না? এমন প শ্নে পথচারী আমজাদ হোসেন জানালেন, খারাপ লাগলেও কিছু করার নেই। কাওরানবাজারে হোটেল সোনারগাঁও মোড়ে ডিউটি করছেন অনেক পুলিশ সদস্য। সারাদিন রোজা রেখেছেন। ডিউটি ফেলে সরারও উপায় নেই। তাই সোনারগাঁও হোটেলের সামনের বুথে বসেই ইফতার সারছেন। কাওরানবাজারে টেলিভিশন চ্যানেল ‘একুশে টিভির’ পিছনের রাস্তায় চায়ের দোকানগুলোতে ভিড়। পথচলতি মানুষ থেকে শুরু করে, রিক্শাওয়ালা, কাওরান বাজারের ক্রেতা-বিক্রেতাসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এখানে ইফতার করেছেন। এক ঘোর লাগা আনন্দময় পরিবেশ বিরাজ করছে যেন! তাদের মধ্যে থেকে এক রিকশাওয়ালা আলম জানালেন, তেজগাঁও, মগবাজার এলাকাতেই রিকশা চালান তিনি। ইফতারের সময় যেখানে থাকেন সেখানেই ইফতার করেন।
এরপর একটু থামলেন। বললেন, ইচ্ছে করে পরিবারের সাথে ইফতার করতে কিন্তু তা কি আর কপালে আছে? পরিবার থাকে গ্রামের বাড়ি নাটোরে। ঈদের সময় সবার সাথে যেন থাকতে পারি, আল্লাহর কাছে এই দোয়া করি।
