কোয়ার্টার ফাইনাল। যদিও ফাইনালের এখনও অনেক পথ বাকি, কিন্তু ফাইনালের একটা আমেজ এখনই পেতে শুরু করেছে দলগুলো। সে কারনেই শেষ আটের লড়াইয়ে খেলোয়াড়রা থাকবেন অনেক বেশী উজ্জীবিত এবং অনেক বেশি নার্ভাস। যে দল সেই স্নায়ুচাপকে জয় করতে পারবে, কাঙ্ক্ষিত ফল নিয়ে বেরিয়ে আসবে তারাই। কারণ, আমাদের মনে রাখতে হবে কোয়ার্টার ফাইনালের আটটি দলের শক্তিমত্তা বিচারে খুব বেশী তারতম্য নেই। সুতরাং অনেক দর্শক সমর্থনপুষ্ট কোন দলও যদি এখানে বাদ পড়ে যায়, আমি অবাক হব না।
রাতের প্রথম ম্যাচে লড়বে দুই ইউরোপিয়ান পরাশক্তি জার্মানি এবং ফ্রান্স। ফুটবল ঈশ্বর কি দারুনভাবেই না গল্পটা সাজিয়েছেন! ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা দুই দল লড়বে ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বিখ্যাত স্টেডিয়ামটিতে! দুই দলের বিপুল সমর্থকদের কথা নয়, আমি ভাবছি সত্যিকারের ফুটবলপ্রেমীদের কথা। সাবেক দুই বিশ্বচ্যাম্পিয়নের এই মুখোমুখিতাকে বোধহয় ম্যাচ না বলে ‘দ্বৈরথ’ বলাই যুক্তিযুক্ত। কারণ রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতার পাশাপাশি ফুটবল মাঠে দু’দেশের লড়াইও ইতিহাসখ্যাত। এই লড়াইটাকে আরো বাড়িয়ে তুলেছে তাদের খেলার স্টাইলের অভিন্নতা। ‘নিজেদের ঘর গোছাও, মাঝমাঠ নিয়ন্ত্রণে রাখো; পাল্টা আক্রমণে প্রতিপক্ষের রক্ষণ গুঁড়িয়ে দাও’, দু’দলের খেলার সামগ্রিক বিশ্লেষণ করা যায় এভাবেই। আমার বিশ্বাস আজ রাতেও এই ধরনেরই আরেকটা ঐতিহাসিক লড়াইয়ের সাক্ষী হবো আমরা। লাতিন ফুটবলের ছন্দময়তা হয়তো সেখানে থাকবে না, কিন্তু ইউরোপীয় ফুটবলের প্রথাগত গতিশীলতা থাকবে। তবে একই সঙ্গে দু’দলের মাথায় থাকবে, ম্যাচটা কোয়ার্টার ফাইনাল। অর্থাত্ জিতলে শ্রেষ্ঠত্বের আরো কাছে পৌঁছে যাওয়া, আর হারলে বিদায়। একারণে হয়তো কেউই খুব বেশি ঝুঁকি নিতে চাইবে না। আর, ঝুঁকি এড়াতে তাদের চেষ্টা থাকবে মাঝ মাঠের দখল নেয়ার।
দুই দলেই বর্তমান বিশ্বের সেরা কিছু ডিফেন্ডার আছেন, যারা কিনা একই সঙ্গে দুই উইং দিয়ে দ্রুতগতিতে পাল্টা আক্রমণও চালাতে পারেন। জার্মানির অস্ত্র যদি হন ফিলিপ লাম, ফরাসি শিবিরে তার জবাব দেয়ার জন্য আছেন প্যাট্রিক এভরা। লাম-এভরাদের সামনেই থাকবেন বাস্তিয়ান শোয়েনস্টেইগার, পল পোগবারা। যাদের প্রথমজনের শক্তিমত্তা যদি হয় অভিজ্ঞতা, দ্বিতীয়জন এগিয়ে থাকবেন ক্ষিপ্রতায়।
আক্রমণেও কেউ কারো চাইতে পিছিয়ে নেই। টমাস মুলার, মিরোস্লাভ ক্লোসা, মারিও গোয়েটজেদের সাথে পাল্লা দেয়ার ক্ষমতা রাখেন গ্রিজম্যান, অলিভার জিরুদরা। আর জার্মানির খেলার ছন্দ বজায় রাখার দায়িত্ব যদি থাকে মেসুত ওজিলের উপর, ফ্রান্সের পক্ষে সে কাজটা টুর্নামেন্টের শুরু থেকে করে আসছেন করিম বেনজামা। দু’জনের দক্ষতাই প্রশ্নাতীত। ক্লাব কিংবা জাতীয় দলের হয়ে তাদের নতুন করে প্রমাণের কিছু নেই। আর্সেনাল-রিয়াল মাদ্রিদের মতো বিখ্যাত দুই ক্লাবের হয়ে নিয়মিত মাঠ মাতান দু’জনেই। আজ তাদের হাতেই থাকছে মূলত বিজয়ের চাবিকাঠি।
কারণ ম্যাচ-মেকিংয়ের দায়িত্বটা থাকে তাদের হাতেই। আমার মনে হয়, এই টুর্নামেন্টের পারফরম্যান্স বিবেচনায় কিছুটা এগিয়ে থাকবেন বেনজামা। নিজে তিনটি গোল করার পাশাপাশি সতীর্থদের দিয়ে কয়েকটি গোল করিয়েছেনও। তবে আজ রাতেই হবে তার আসল পরীক্ষা।
রাতের দ্বিতীয় ম্যাচে ব্রাজিল খেলবে কলম্বিয়ার বিরুদ্ধে। আমি আগেই বলেছি, টুর্নামেন্টের এই পর্যায়ে এসে আর ফেভারিট তত্ত্ব খাটবে না। দর্শক সমর্থন কিংবা ঐতিহ্যের বিচারে ব্রাজিল এগিয়ে থাকলেও প্রায় সমান সুযোগ থাকছে কলম্বিয়ারও। জেমস রড্রিগুয়েজের মতো ইনফর্ম একজন স্ট্রাইকার আছেন তাদের সঙ্গে। যে কিনা যে কোন ম্যাচে পার্থক্য গড়ে দেয়ার ক্ষমতা রাখেন।
ব্রাজিলের শেষ ষোলোর পারফরম্যান্স তাদের জন্য একটা সতর্কবার্তা ছিল। আমার বিশ্বাস স্কলারি, কার্লোস আলবার্তোর মতো অভিজ্ঞ ব্যক্তিরা এটা অবশ্যই মাথায় রাখবেন এবং সেই অনুযায়ী দল সাজাবেন। তবে একটা কথা বলতে পারি, আগের খেলাগুলোর মতো ব্রাজিলকে এত সুযোগ হাতছাড়া করলে চলবে না। কারণ, এখন পর্যন্ত তারা যে সব দলের মুখোমুখি হয়েছে তাদের যে কারো চাইতে এগিয়ে আছে কলম্বিয়া। সুতরাং, সুযোগ পেলে ব্রাজিলকে মরণ কামড় দিতে ছাড়বে না তারা।
নেইমারের চোট মুক্তির সংবাদ অবশ্যই ব্রাজিলের জন্য বিশাল সুখবর। যতই ব্রাজিলিয়ানরা বলুক তাদের দল নেইমার নির্ভর নয়, মাঠের খেলায় স্পষ্ট নেইমার ভাল না করলে তাদের পক্ষে গোল বের করাটা কঠিন। নেইমার আজও সুযোগ সৃষ্টি করবেন, এখন সেটা যদি কাজে লাগানো যায় তাহলে ব্রাজিল জিতবে। তবে, সুযোগের অপচয় করলে তার মাসুল গুনতে হতে পারে তাদের।
