প্রতিদিন হাজারেরও বেশি যান চলাচল করে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক। যেহেতু ঢাকা হচ্ছে রাজধানী আর চট্টগ্রামকে বলা হয় বাণিজ্যিক রাজধানী, যা সকলের নিকট বন্দর নগরী হিসেবেই সুপরিচিত, আর এই দুই শহরের একমাত্র যোগসূত্র হচ্ছে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক, সেহেতু এই সড়কটি অন্য সব সড়ক থেকে আলাদা হওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু বিভিন্ন জায়গায় ভাঙন এবং ধীরগতির সংস্কার কাজ ২৫৬ কিলোমিটার এই রাস্তাকে করে দিচ্ছে ক্রমশ সংকীর্ণ। রাস্তাটি এখন অনেকটা অবহেলিত। আগে যেখানে যাত্রীবাহী কোনো বাসে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা যেতে লাগতো প্রায় ৬ ঘণ্টা এখন তা ১০ ঘণ্টার নিচে নামতে নারাজ।
গত ২৮ জুলাই ফিরছিলাম চট্টগ্রাম অলংকার মোড় থেকে রাত ১০টায় বাসে চেপে। সীতাকুণ্ডেই বসে থাকতে হলো প্রায় ৪ ঘণ্টা। আটকে থাকার পর যখন কুমিল্লা বিশ্বরোড ক্রস করছে ঠিক তার ১৫ মিনিটের মাথায় আমাদের বাসটি পড়লো দুর্ঘটনায়। তখন ভোর হয়ে গেছে। অথচ আমাদের ততক্ষণে ঢাকা পৌঁছে যাওয়ার কথা। ড্রাইভার অতি বেগে গাড়ি চালানোর কারণে এই দুর্ঘটনাটি ঘটে এবং অনেকেই আহত হন, একজনের চোখে গ্লাস ঢুকে যায়। কেউ মারা যাননি। এভাবেই প্রতিদিন ঘটছে এমন দুর্ঘটনা আর হারাতে হচ্ছে কারো না কারো স্বজনকে। এর মূল কারণটা ছিল যানজট। যদি রাস্তা ভালো থাকতো তবে হয়তো দীর্ঘক্ষণ যানজট থাকতো না। আর ড্রাইভারও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পৌঁছানোর জন্য অতি বেগে গাড়ি চালাতো না। এতে ড্রাইভারের যদিও দোষ ছিল কিন্তু এই রাস্তার সমস্যাটি একেবারেই উড়িয়ে দেওয়ার মতো নয়।
২০০৬ সালের দিকে ক্রমবর্ধমান ভ্রমণ চাহিদা মেটানো এবং ভারী যানবাহন চলাচলের পৃথক লেনের অব্যবস্থার কারণে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর কর্তৃক দাউদকান্দির টোলপ্লাজা থেকে চট্টগ্রাম সিটি গেট পর্যন্ত রাস্তাটি ২ লেন থেকে ৪ লেনে উন্নীত করার লক্ষ্যে একটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছিল যা কিনা ২০১৩ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তা না হওয়ায় দুর্ঘটনা ও জনদুর্ভোগ পরিণত হয়েছে নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনায়, বিশেষ করে প্রতিবছর ঈদের সময় যাত্রীদের পড়তে হয় সীমাহীন ভোগান্তিতে।
অধিকাংশ আমদানি করা পণ্য এই রাস্তা দিয়ে ঢাকা হয়ে সারা দেশে যায়। তাছাড়া আমাদের দেশের প্রধান আয়ের উত্স পোশাকশিল্প রপ্তানিতেও এই মহাসড়কটির অবদান অনস্বীকার্য। অথচ যদি এই মহাসড়কটি চাহিদা অনুযায়ী পর্যাপ্ত সমপ্রসারণ করা যায় তবে তা জাতীয় অর্থনীতিতেও সুফল বয়ে আনবে। একটা উদাহরণের মাধ্যমে ব্যাপারটি বোঝানো যেতে পারে। ধরা যাক ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে দৈনিক ১০০ গাড়ি চলাচল করে। চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা পৌঁছাতে গাড়িটির সময় লাগে ৮ ঘণ্টা আর তাতে তেল খরচ হয় ১০ লিটার। এখন যদি যানজটবিহীন রাস্তায় গাড়িটির পৌঁছাতে ৪ ঘণ্টা লাগে সে ক্ষেত্রে তেল লাগবে মাত্র ৫ লিটার। আর দৈনিক তেল খরচ বাঁচবে ১০০–৫= ৫০০ লিটার এবং ১ বছরে বাঁচবে ৩৬৫–৫০০ =১৮২৫০০ লিটার। এখন প্রশ্নটা হচ্ছে কীভাবে তা সম্ভব? আমরা জানি, ১৬ কোটি মানুষের এই বাংলাদেশে রয়েছে বিশাল মানব সম্পদ। যেখানে আমাদের এই সম্পদ কাজে লাগিয়ে দুবাই ও সৌদিআরবসহ অনেক দেশ গড়ে তুলেছে বিশাল অট্টালিকা, সাজাচ্ছে তাদের দেশকে নান্দনিক সৌন্দর্যে। তবে কেন আমরা নিজেদের জন্য কাজে লাগাবো না আমাদের এই মহামূল্যবান মানব সম্পদকে। যদি চীন তাদের মানব সম্পদকে কাজে লাগিয়ে ৬ দিনে ১৫ তলা হোটেল তৈরি করতে পারে, তবে আমাদের পক্ষে একটি রাস্তা যথাসময়ে সম্পন্ন করা আকাশ কুসুম কোনো কল্পনা নয়।
সরকারের উচিত ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কটির দিকে বিশেষভাবে নজর দেওয়া এবং অনুধাবন করা যে, এর গুরুত্ব অনেক।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
