নরসিংদীর চিত্র

৩৭টি প্রাইভেট ক্লিনিক চলছে সরকারি ডাক্তারের তত্ত্বাবধানে

আপডেট : ০৫ জুলাই ২০১৪, ২২:২৭
রাজধানী ঢাকার অদূরে নরসিংদী জেলা। ঢাকা থেকে মাত্র দেড় ঘণ্টার পথ। অথচ এ জেলায় চিকিত্সকদের নিয়োগ দিলে বেশির ভাগ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে তারা যোগদান করতে চান না। কেউ কেউ যোগদান করলেও কর্মস্থলে থাকতে চান না। নানা অজুহাত, তদ্বির, দলীয় ক্ষমতা ও উেকাচের বিনিময়ে বদলি বাগিয়ে শহরে কিংবা রাজধানীতে চলে আসেন। তবে ঢাকা থেকে গিয়ে নিয়মিত নরসিংদীতে প্রাইভেট প্র্যাকটিস করছেন ঐ সব চিকিত্সকগণের অনেকেই। নরসিংদী সরকারি হাসপাতালে রোগীদের সময় না দিয়ে নিয়োজিত চিকিত্সকরা দিন রাত করছেন প্রাইভেট প্র্যাকটিস। নরসিংদীতে ৩৭টি প্রাইভেট ক্লিনিক চলছে ঐসব চিকিত্সকদের তত্ত্বাবধানে। ৬টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও ২টি ১শ শয্যার হাসপাতালে নিয়োজিত চিকিত্সকদের উপর ভরসা করে নরসিংদীর ৩৭টি ক্লিনিক চলছে। অথচ ঐ সব সরকারি হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রোগী এসে চিকিত্সকদের দেখা পান না। তবে ঐ সময় প্রাইভেট ক্লিনিকে গেলেই সরকারি চিকিত্সকদের দেখা মিলে। নরসিংদী জেলায় সরকারিভাবে মঞ্জুরিকৃত চিকিত্সকের পদ ১৩৬টি এবং ৪১টি চিকিত্সকের পদ দীর্ঘদিন শূন্য। ২টি ১শ শয্যার হাসপাতাল, ৬টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, ইউনিট পর্যায়ের সাব সেন্টার ৬৭টি ও কমিউনিটি ক্লিনিক ১৯৪টি রয়েছে এই জেলায়। সরকারিভাবে চিকিত্সা ব্যবস্থার এত সুযোগ হাতের কাছে থাকলেও নরসিংদীবাসী চিকিত্সাসেবা নিয়ে চরম দুর্ভোগের শিকার। পরীক্ষার ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও ক্লিনিকে রোগীদের পাঠিয়ে দিয়ে চিকিত্সকরা পাচ্ছেন ৬০ ভাগ কমিশন। চাহিদা অনুযায়ী সরকারি ওষুধ সামগ্রী সরবরাহ করা হয়ে থাকলেও ৯৮ ভাগ ওষুধ রোগীদের দেয়া হয় না। পাচার হয়ে যায় নিয়মিত। কেনাকাটা ও সরবরাহ ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করে কথিত এক সাংবাদিকের নেতৃত্বে একটি গ্রুপ। ঐ সাংবাদিক পরিচয়দানকারী ব্যক্তির দাপটে সিভিল সার্জন কার্যালয়ের কর্মকর্তা কর্মচারী ও চিকিত্সকরা প্রায় অসহায়। নরসিংদী জেলায় লক্ষাধিক তাঁত শিল্পে ১০ লক্ষাধিক শ্রমিক কাজ করে। এ ছাড়া ২টি সার কারখানা ছাড়াও রয়েছে বিভিন্ন ধরনের মিল কারখানা। সড়ক দুর্ঘটনা ছাড়াও শ্রমিকরা নানা অসুখে ভোগেন কিংবা মিল কারখানায় দুর্ঘটনার শিকার হন। চিকিত্সাসেবা থাকা সত্ত্বেও চিকিত্সকদের অনুপস্থিতিসহ অব্যবস্থাপনার কারণে ঐ সব শ্রমিকদের চিকিত্সাসেবা নিয়ে অসহনীয় দুর্ভোগ পোহাতে হয়। তাদের ৯০ ভাগকে চিকিত্সার জন্য ঢাকায় আসতে হয়। বিলম্বে ঢাকায় পৌছাতে অনেকে অ্যাম্বুলেন্স কিংবা বহনকারী যানবাহনেই মারা যান বলেও শ্রমিকরা জানান। সরেজমিনে নরসিংদী সদর ও ৬টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে ডাক্তার, নার্স ও আগত রোগীদের সঙ্গে আলাপকালে তারা বর্তমান চিকিত্সাসেবার পুরো বিবরণ তুলে ধরেন। ১০০ শয্যা সদর হাসপাতাল শুধুমাত্র নরসিংদী সদরে (সাবেক ৫১ শয্যা বিশিষ্ট স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স) ১০০ শয্যার সদর হাসপাতালে ১৯ জন চিকিত্সকের মধ্যে বর্তমানে ১৫ জন চিকিত্সক রয়েছেন। তার মধ্যে কনসালটেন্ট মেডিসিন ১ জন, কনসালটেন্ট সার্জন ১ জন, কনসালটেন্ট রেডিওলজি্ট ১ জন এবং ডেন্টাল সার্জন ১ জনসহ ৪ জন ডাক্তার গত ৬ মাস পূর্বে হাসপাতাল থেকে বদলি হয়ে অন্যত্র চলে গেছেন। ফলে রোগীদের ভোগান্তির শেষ নেই। নার্স ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীর ১৫টি পদ শূন্য থাকায় রোগীর চাপে দিশেহারা হয়ে পড়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। হাসপাতালে সরকারিভাবে স্বল্প খরচে আল্ট্রাসনোগ্রাম, এক্সরে, ইসিজি করার সুযোগ থাকলেও কর্মকর্তা, কর্মচারীদের স্বেচ্ছাচারিতা ও দালালদের খপ্পরে পড়ে বাইরের সেন্টারগুলো থেকে এসব পরীক্ষা করানো হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। দালালদের প্রতারণা, মেডিক্যাল রিপ্রেজেনটেটিভদের উত্পাত, কর্তব্যরত ডাক্তারদের ভিজিট আদায় এবং নিয়মিত ডাক্তার না থাকায় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিত্সা নিতে আসা দরিদ্র রোগীদের পড়তে হয় চরম ভোগান্তিতে। একশ্রেণির চিকিত্সক হাসপাতালে রোগী দেখার সময় রোগীদের কাছ থেকে ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত ভিজিট আদায় করে প্রাইভেট ক্লিনিকের প্যাডে ব্যবস্থাপত্র দেন। রোগীরা চেম্বার থেকে বের হলে দালালরা প্যাডের ওই ঠিকানায় পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য যেতে বলে। সরকারিভাবে হাসপাতালের রোগীদের জন্য ওষুধের সরবরাহ থাকলেও রোগীদের তেমন কোনো ওষুধ সরবরাহ করা হয় না। হাসপাতালের দুটি অ্যাম্বুলেন্স দীর্ঘদিন যাবত্ বিকল। দুটি এক্সরে মেশিনের মধ্যে ১০০ এম এম-এর একটি মাত্র মেশিন চালু রয়েছে। ৫০০ এমএম মেশিনটি গত দুই বছর যাবত্ অকেজো হয়ে পড়ে রয়েছে। অ্যাম্বুলেন্স এবং এক্সরে মেশিন নষ্ট থাকলেও টেকনিশিয়ান এবং ড্রাইভার ডিউটি না করেই বেতন নিচ্ছেন। অপরিষ্কার আর ময়লা আবর্জনায় ভরা হাসপাতালের প্রতিটি টয়লেটও ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। ১০০ শয্যা জেলা হাসপাতাল নরসিংদীর বাসাইলে স্থাপিত ১০০ শয্যা বিশিষ্ট জেলা হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে আউটডোরে রোগীর সংখ্যা ৪৫০ জন। এ হাসপাতালে সুপারিনটেন্ডেন্ট ১টি, সহকারী কনসালটেন্ট সার্জারি ১টি, ইএনটি এবং চক্ষু ২টি, অ্যানেসথেসিয়া ২টি, গাইনি কনসালটেন্ট পদ ১টি, ডেন্টাল সার্জন ১টি, কনসালটেন্ট শিশু ১টি, মেডিক্যাল অফিসার ২টি, ইমারজেন্সি মেডিক্যাল অফিসারের ১টি পদ খালি রয়েছে। ২৪ জন নার্সের মধ্যে ৩ জন নার্স কর্মরত রয়েছেন। তবে ডেপুটেশনে ৩৯ জন নার্স কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। ২২ জন ক্লিনারের মধ্যে মামলার কারণে অধিকাংশ কাজে যোগদান করছে না। এ হাসপাতালে ডাক্তার, কর্মকর্তা, কর্মচারীসহ ১৪৪টি পদের বিপরীতে ১০২ জন কর্মরত আছেন। বাকী ৪২ পদ শূন্য রয়েছে। এ হাসপাতালের দুটি অ্যাম্বুলেন্স এবং দুটি এক্সরে মেশিনও দীর্ঘদিন যাবত্ অকেজো হয়ে রয়েছে। ফলে রোগীদের ভোগান্তি ও দুর্ভোগের শেষ নেই। নরসিংদী ১০০ শয্যা জেলা হাসপাতালের আরএমও ডা. এএনএম মিজানুর রহমান জানান, তিনি এবং তার সহযোগী ডাক্তারগণ রোগীদের চিকিত্সা সেবা প্রদানে কোন প্রকার ত্রুটি করেন না। তাদের সাধ্যমত রোগীদের সেবা চালিয়ে যাচ্ছেন। রায়পুরা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স প্রয়োজনের তুলনায় জনবল অপ্রতুল হওয়ায় মুখ থুবড়ে পড়েছে ৫০ শয্যা বিশিষ্ট রায়পুরা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিত্সা সেবা কার্যক্রম। ২১ জন ডাক্তারের বিপরীতে কাগজে-কলমে ৯ জন থাকলেও কর্মস্থলে পাওয়া গেছে মাত্র তিনজন। ফলে উপজেলার দুর্গম চরাঞ্চলসহ দূরদূরান্ত থেকে চিকিত্সা সেবা নিতে এসে প্রায়ই ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন সাধারণ রোগীরা। সেই সাথে জনবলের অভাবে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে নতুন ভবনের এসি, ফার্নিচারসহ প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র। অন্যদিকে, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সকল ধরনের ওষুধ পর্যাপ্ত পরিমাণে বরাদ্দ থাকলেও বিভিন্ন ওষুধ কোম্পানির রিপ্রেজেন্টেটিভদের সাথে হাত মিলিয়ে অতিরিক্ত সুবিধা পাওয়ার স্বার্থে কর্তব্যরত কিছু ডাক্তার সাধারণ রোগীদের বাহির থেকে ওষুধ কিনে আনতে বাধ্য করেন, এমন অভিযোগ স্থানীয় মহলের। বেলাব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স নানামুখী সমস্যায় জর্জরিত হয়ে বেলাব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিত্সা সেবা দারুণভাবে ব্যাহত হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। আর এ কারণে বেলাব ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় প্রায় ৫ লক্ষাধিক লোক চিকিত্সা সেবা না পেয়ে নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালের উপর। হাসপাতাল সূত্র জানায়, হাসপাতালটিতে ৩১ শয্যা চালু থাকা সত্ত্বেও এখানে নেই কোন অপারেশন থিয়েটার। যার কারণে গাইনী ও প্রসূতি (ইওসি) সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন সহস্রাধিক জনগণ। এছাড়া দীর্ঘদিন যাবত্ হাসপাতালটির এক্স-রে মেশিন, আলট্রাসনোগ্রাফী মেশিন, ইসিজি মেশিন থাকা সত্ত্বেও অচল হয়ে পড়ে আছে। অথচ এসব বিভাগের কর্মরত কর্মচারীরা বসে বসে বেতন নিচ্ছেন। প্যাথলজিতে ২ জন টেকনোলজিস্ট থাকা সত্ত্বেও যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্টের অভাবে সব পরীক্ষা করা হয় না। ৮ জন ডাক্তারের স্থলে উপস্থিত আছেন মাত্র একজন ডাক্তার। পলাশ উপজেলা পলাশ উপজেলা হাসপাতালে ডাক্তার না থাকায় স্বাস্থ্য সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন রোগীরা। শিল্পনগরী ঘোড়াশাল, পলাশের বিপুল সংখ্যাক জনগোষ্ঠীর জন্য মাত্র ৯ জন চিকিত্সক থাকলেও কর্মস্থলে চিকিত্সকের অনুপস্থিতি ও প্রশাসনের অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার কারণে কার্যত ভেঙ্গে পড়েছে সরকারি চিকিত্সা ব্যবস্থা। সরজমিনে পলাশ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ঘুরে জানা যায়, ৩১ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালের দুরবস্থা দীর্ঘ দিনের। ডাক্তার স্বল্পতার কারণে দিন দিন রোগীর সংখ্যা কমছে। লোকবলের অভাবে ৫০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালটি দীর্ঘদিন ধরে প্রায় তালাবদ্ধ অবস্থায় রয়েছে। কর্তৃপক্ষ জানান, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে কোন ডাক্তার ও নার্স না পাওয়া পর্যন্ত ৫০ শয্যা হাসপাতালটি চালু করা সম্ভব নয়। হাসপাতালের প্যাথলজি ও এক্স-রে বিভাগ চলছে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ভিজিট টিম হাসপাতালে ৪ জন ডাক্তারকে কর্তব্য অবহেলার কারণে সাময়িক বরখাস্ত করলেও কর্তৃপক্ষের টনক নড়েনি। এদিকে হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্স ও এক্সরে মেশিনটি দীর্ঘদিন ধরে নষ্ট হয়ে পড়ে রয়েছে। মনোহরদী উপজেলা মনোহরদী উপজেলায় স্বাস্থ্য সেবা কেন্দ গুলোতে অনিয়মের কারণে সাধারণ মানুষ তাদের সেবা পাচ্ছে না। গত দুই বছর আগে ৩১ শয্যা হতে ৫০ শয্যায় উন্নিত হয়েছে উপজেলা স্বাস্থ্য কেন্দ টি। কার্ডিয়লজি, গাইনি, মেডিসিন, চক্ষু, অর্থোপেডিক্স, ডেন্টাল সার্জন নিয়ে ছয় জন কনসালটেন্টসহ ২০ জন চিকিত্সক নিয়োগ প্রাপ্ত আছেন। কনসালটেন্টদের দুই/এক জন সপ্তাহে দুই/এক দিন ঢাকা থেকে কয়েক ঘণ্টার জন্য কর্মক্ষেত্রে আসেন। আবার চলে যান। কয়েক লাখ টাকা ব্যয়ে ডেন্টাল ইউনিট বসানো হয়েছে। এরই মধ্যে ডেন্টাল সার্জন প্রেষণে চলে গেছেন ঢাকায় মিটফোর্ড হাসপাতালে। চক্ষু বিশেষজ্ঞ এখানে নিয়োগ থাকলেও কাজ করেন ঢাকা জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে। এক মাস আগে নতুন ই.সি.জি মেশিন আনা হয়েছে হাসপালে। অদক্ষ টেকনিশিয়ান দিয়ে পরিচালনা করে ইতিমধ্যে এই মেশিনটিও বিকল হয়ে গেছে। একযুগ আগে আনা অ্যাম্বুলেন্সটি নিজেই এখন রোগী। গুরুতর রোগীদের উন্নত চিকিত্সার জন্য পাঠানো হয় ভাড়া করা গাড়ি দিয়ে। ১৯৬৪ সালে নির্মিত ৩১ শয্যার দালানটি ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করার কথা থাকলেও মৃত্যু ঝুঁকি মাথায় নিয়ে রোগীদের রাখা হচ্ছে ওই দালানে। অপরিষ্কার রন্ধন শালায় নিম্নমানের খাবার তৈরি করে পরিবেশন করা হচ্ছে রোগীদেরকে।