মাসকট হলো এমন একটি ডিজাইন বা প্রতীক যার মাধ্যমে আয়োজনকারী দেশের বৈশিষ্ট্য, পরিচ্ছদ, উদ্ভিদকুল, প্রাণিকুল ইত্যাদি তুলে ধরা হয়। ১৯৬৬ সাল থেকে শুরু করে প্রতিটি বিশ্বকাপে মাসকট প্রকাশ শুরু হয়। বিশ্বকাপ উইলি হলো ১৯৬৬ সালের প্রতিযোগিতার মাসকট। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের সাক্ষী হয়ে থাকা বিশ্বকাপের মাসকটসমূহ ও এর বৈশিষ্ট্যগুলো জানাচ্ছেন রিয়াদ খন্দকার
মাসকট! বলতেই সবার সামনে ভেসে উঠে প্রাণোচ্ছল, উদ্দীপ্ত প্রাণী যা পুরো অনুষ্ঠান বা প্রতিযোগিতাজুড়েই মাতিয়ে রাখবে পুরো বিশ্ববাসীকে, স্বাগতিক দেশের প্রতিবিম্বকে তুলে ধরবে নিজের শাশ্বত ও স্বতন্ত্র পন্থায়। যেকোনো আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার অন্যতম সেরা আকর্ষণ এই মাসকট। মাসকট হতে পারে কোনো প্রাণী বা কোনো ব্যক্তি বা এমন কিছু যা স্বাগতিকদের জন্য সৌভাগ্যদায়ক। এটি হতে পারে কোনো কাল্পনিক চরিত্র বা বাস্তবতার সাথে সামঞ্জস্য যা সকলের দৃষ্টি কেড়ে নেবে। অনেক না বলা প্রতিবাদ বা আখ্যাপন তুলে ধরবে মাসকট। রংবেরঙের অনেক পরিচ্ছদ ও যেকোনো তাত্পর্যপূর্ণ নাম মাসকটের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। প্রায় সবধরনের প্রতিযোগিতায় মাসকটের উপস্থিতি দেখা যায়। ফুটবলেও মাসকটের সরব উপস্থিতি প্রতি বিশ্বকাপেই দেখা যায়। কিন্তু ১৯৬৬ সালের আগ পর্যন্ত কোনো মাসকট ব্যবহার করা হয়নি। ১৯৬৬ ইংল্যান্ড বিশ্বকাপ দিয়েই ফুটবলে মাসকটের প্রচলন শুরু হয়। এরপর থেকে দর্শক ও ভক্ত-সমর্থকদের আনন্দ দিয়ে আসছে মাসকট। আসুন জেনে নিই মাসকটের রং-রূপ কেমন ছিল।
১৯৬৬ :ইউনিয়ন জ্যাক জার্সি পরিহিত সিংহের যে মাসকটটি ১৯৬৬ সালের ইংল্যান্ড বিশ্বকাপের অফিসিয়াল মাসকট ছিল তা অদ্যাবধি তৈরিকৃত মাসকটগুলোর মধ্যে অন্যতম সেরা বলে গণ্য হয়। সিংহ হলো ইংল্যান্ডের প্রতীক এবং সেই মাসকটের পরিহিত জার্সিতে world cup শব্দটি লেখা ছিল। World Cup Willie নামক এই মাসকটটির ডিজাইনার ছিলেন প্রখ্যাত ফ্রিল্যান্স শিশুতোষ বইয়ের চিত্রশিল্পী Reg Hoye।
১৯৭০ :১৯৭০-এর মেক্সিকো বিশ্বকাপের অফিসিয়াল লোগোটির নাম ছিল ‘Juanito’। এটি একটি মেক্সিকান ঐতিহ্যবাহী সবুজ জামা পরিহিত বালক যে মাথায় পড়েছিল মেক্সিকান ‘sombrero’ নামক টুপি যেখানে লেখা ছিল ‘MEXICO 70’। এটা ছিল বিশ্বকাপ ফুটবলের প্রথম রঙিন মাসকট।
১৯৭৪ :১৯৭৪-এর পশ্চিম জার্মান বিশ্বকাপের মাসকটে ছিল নতুনত্ব। একের বদলে এখানে ছিল দুইটি বালক। উভয় বালক পরিহিত ছিল পশ্চিম জার্মানের জার্সি, যার একটাতে লেখা ছিল ‘ডগ (Weltmeisterschaft শব্দের সংক্ষিপ্ত রূপ যার অর্থ World Cup)’ এবং অন্যটিতে লেখা ছিল বিশ্বকাপের সাল ‘৭৪’। এই মাসকটটির নাম ছিল ‘Tip and Tap’।
১৯৭৮ :১৯৭৮-এর আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপের মাসকটের নাম ছিল ‘Gauchito’। পরপর তিনবারের মত মনুষ্য বালক মাসকট হিসেবে ব্যাবহার করা হয়। আর্জেন্টিনা দলের জার্সি পরিহিত একটি বালক যার জার্সিতে লেখা ছিল ‘ARGENTINA 78’। এই বালকের গলায় বাঁধা ছিল একটা রুমাল আর হাতে ছিল একটা ‘whip’; আর্জেন্টিনার ঐতিহ্যবাহী একধরনের চাবুক। একটি ফুটবলের উপর পা দিয়ে দাঁড়ানো বালকের এই মাসকটটি মানুষের মনে স্থান করে নেয়।
১৯৮২ :স্পেনের প্রচলিত ফল কমলা, এই কমলার গায়ে স্পেন জাতীয় দলের জার্সি পরিহিত মাসকটটি ছিল ১৯৮২-এর বিশ্বকাপ মাসকট। এর নাম ছিল ‘Naranjito’। এই নামটি এসেছে ‘naranja’ থেকে যার ইংরেজি অর্থ কমলা।
১৯৮৬ :পরবর্তী ১৯৮৬-র মেক্সিকো বিশ্বকাপের মাসকটটির নাম ছিল ‘Pique’ যা এসেছিল একটি দৈত্যাকৃতির মরিচকে কেন্দ্র করে যা মেক্সিকোতে খুবই জনপ্রিয়। এর নামটি নীেয়া হয়েছিল স্প্যানিশ শব্দ ‘picante’ হতে ‘Pique’ নামটির উত্পত্তি যার অর্থ খুব ঝাল এক ধরনের মরিচ।
১৯৯০ :ইতালিতে অনুষ্ঠিত এই বিশ্বকাপের মাসকটটি তৈরি হয় কতগুল লাঠিখণ্ডকে মানুষের অবয়ব দিয়ে। প্রতিটি লাঠিখণ্ড ইতালির পতাকার রঙয়ে রঞ্জিত ছিল। মানব আকৃতির এই ফুটবল খেলোয়াড়ের মাথা হিসেবে ব্যবহার করা হয় একটি ফুটবল। এই মাসকটটির নাম ছিল ‘Ciao’ যা ইতালীয় ভাষায় এক ধরনের বিশেষ সম্ভাষণ।
১৯৯৪ :১৯৯৪-এর আমেরিকা বিশ্বকাপের লোগো ছিল একটি পোষা প্রাণী, কুকুর। লাল, সাদা এবং নীল রঙের জার্সি পরিহিত এই মাসকটের জামায় লেখা ছিল ‘USA 94’। এর নাম ছিল ‘Striker, the World Cup Pup’।
১৯৯৮ :১৯৯৮-এর ফুটবল বিশ্বকাপের মাসকট ছিল ‘Footix’। ফ্রানে্সর প্রচলিত Gallic rooster. এর আদলে তৈরি এই মাসকটটি ছিল এযাবত্ কালের সবচাইতে কালারফুল মাসকট। নীল রঙের শরীর বিশিষ্ট এই মাসকটের লাল রঙের মাথায় হলুদ ঠোঁট একে বিশেষত্ব দান করে। এর বুকে গাঢ় নীল রঙের একটি ব্যানারে সাদা রঙে লেখা ছিল ‘FRANCE 98’।
২০০২ :কমলা, বেগুনী এবং নীল রঙের তিনটি কম্পিউটার গ্রাফিক্সের দ্বারা তৈরি ভিন্ন ভিন প্রাণী সদৃশ আকৃতি নিয়ে তৈরি হয় এই বিশ্বকাপের মাসকট। যা এযাবত্ কালের সবচেয়ে নিম্নমানের মাসকট হিসেবে বিবেচিত হয়।
২০০৬ :‘Goleo VI & Pille’ নামক জার্মান বিশ্বকাপের এই মাসকট গত পাঁচটি বিশ্বকাপের মধ্যে সেরা নির্বাচিত হয়েছে ফিফার অফিসিয়াল ওয়েব সাইটে প্রদত্ত ভোটে। সিংহের গায়ে জার্মান দলের জার্সি পরিহিত এই মাসকট ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে।
২০১০ :দক্ষিণ আফ্রিকার এই বিশ্বকাপের মাসকট ছিল ‘Zakumi’। এই নামে Za রিপ্রেজেন্ট করে দক্ষিণ আফ্রিকাকে আর kumi দ্বারা আফ্রিকার অনেক আঞ্চলিক ভাষায় দশ (১০) বুঝায়। এর সবুজ এবং সোনালি রং দক্ষিণ আফ্রিকা জাতীয় ফুটবল দলের জার্সির রঙকে রিপ্রেজেন্ট করে।
২০১৪ :‘armadillo’ নামক এক প্রকার ট্র্যাডিশনাল প্রাণীকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে এবারের বিশ্বকাপের মাসকট যার নাম ‘Fuleco the Armadillo’। এই মাসকট এর দ্বারা ব্রাজিলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। এবারের বিশ্বকাপ হবে পরিবেশ বান্ধব এমনটাই ব্রাজিলবাসীদের বিশ্বাস। আশা করা হচ্ছে এই মাসকটটি ফুটবল বিশ্বকাপের ইতিহাসে অন্যতম একটি মাসকট হিসেবে জায়গা করে নেবে।
