গণতন্ত্র আর মত প্রকাশের দাবিতে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে আরব বসন্তের সূচনা হয়েছিলো ২০১০ সালের শুরুর দিকে। গণবিক্ষোভের মুখে মিসরে প্রেসিডেন্ট হোসনি মুবারক, তিউনিশিয়ার বেন আলী. লিবিয়ার লৌহমানব মুয়াম্মার গাদ্দাফি জামানার অবসান হয়। একে একে আরো কয়েকজন স্বৈরশাসক সরে দাঁড়াতে বাধ্য হয় গণবিক্ষোভের মুখে। এখনো সিরিয়ায় লড়াই চলছে। নিহত ও বাস্তুচ্যুত হয়েছে অগণিত মানুষ। ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে অগণিত অর্থ সম্পদের। তবুও এসব দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। বরং মানুষের জীবনের ঝুঁকি বেড়েছে বহুগুণে। আরব বসন্তের লাভ-ক্ষতি, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি নিয়ে যখন হিসাব-নিকাশ চলছে তখন গণবিক্ষোভ শুরু হয়েছে হংকংয়ে। গণতন্ত্রের দাবিতে গত সপ্তাহে বিশৃঙ্খলাপূর্ণভাবে বিক্ষোভ সমাবেশ করায় কয়েকশ’ বিক্ষোভকারীকে আটক করেছে পুলিশ। বলা হচ্ছে, অবৈধভাবে জনসমাবেশ ও পুলিশি কাজে বাধা দেয়ায় তাদের গ্রেফতার করা হয়। নিরাপত্তাকর্মীদের দাবি- বিক্ষোভে প্রায় লাখ খানেক লোক জড়ো হয়েছিলো। তবে আয়োজকরা দাবি করছেন, রোদ ও বৃষ্টি উপেক্ষা করে হংকংয়ের ৫ লাখ ১০ হাজার বাসিন্দা রাস্তায় এই বিক্ষোভে অংশ নিয়েছে। হংকংয়ের এই বিক্ষোভ চীনের ভূখণ্ডে সবচেয়ে বড় বিক্ষোভের ঘটনা।
১৯৯৭ সালের ১ জুলাই হংকং ব্রিটিশ উপনিবেশমুক্ত হয় এবং চীনের কাছে হংকংয়ের সার্বভৌমত্ব হস্তান্তর করা হয়। হংকংয়ের চীনের কাছে ফিরে যাওয়ার বার্ষিকী উপলক্ষে এই সমাবেশের আয়োজন করা হয়। মহাসমাবেশে অংশগ্রহণকারীদের হাতে ছিল ব্যানার, পোস্টার ও ফেস্টুন। তারা হংকংয়ের নতুন নেতা সি ওয়াই লেয়াংয়ের পদত্যাগ ও সত্যিকার গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দাবি তোলেন। বিশৃঙ্খলা এড়াতে হাজার হাজার পুলিশ মোতায়েন করা হয়। এ ঘটনার পর বেইজিং সমপ্রতি হংকংকে সতর্ক করে দিয়ে বলেছে, চূড়ান্ত কর্তৃত্ব চীনের হাতেই রয়েছে। একদলীয় কম্যুনিস্ট শাসনের কারণে এখানে জনগণের সরাসরি নেতা নির্বাচনের সুযোগ নেই। তবে হংকংয়ের জনগণ প্রচলিত এ নিয়মের বিপক্ষে। তারা চান নেতা নির্বাচনে পুরো অধিকার। ব্রিটিশদের থেকে চীনা শাসনে আসার পর সবচেয়ে সমৃদ্ধ এই প্রদেশটি সেই দাবিই জানিয়ে আসছে। তবে এখনো পর্যন্ত তা পূরণের কোন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। যদিও চীনের সরকার হংকংবাসীকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যে ২০১৭ সালের মধ্যে সেখানে পূর্ণমাত্রায় নির্বাচন দেয়া হবে। এদিকে, রাষ্ট্র পরিচালিত সংবাদপত্র গ্লোবাল টাইমস জানিয়েছে, এ ধরনের বিক্ষোভ হংকংকে পরবর্তী ইউক্রেন কিংবা থাইল্যান্ডে পরিণত করতে পারে। এক সম্পাদকীয়তে বলা হয়, এ ধরনের অস্থিরতা মোকাবেলায় হংকংকে শক্ত হতে হবে। বুধবার সকালের বিক্ষোভের পর আরো বড় আকারে বিক্ষোভ হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিক্ষোভকারীদের সাটের রোডে অবস্থান করার বিষয়ে বলা হয়, তারা হংকংয়ের আইনের শাসনকে হুমকিতে ফেলেছে। আইনের শাসন ভেঙে পড়লে হংকং ইউক্রেন বা থাইল্যান্ডের মতো রাজনৈতিক অস্থিরতায় নিমজ্জিত হতে পারে। কট্টর বিক্ষোভকারী স্বীকার করেছেন তাদের এ বিক্ষোভ অবৈধ হতে পারে। তারপরও গণতন্ত্রের দাবিতে তারা সামনে এগিয়ে যাবেন। কয়েকশ’ বিক্ষোভকারীকে গ্রেফতারের পর তারা অভিযোগ তুলেছে পুলিশের দিকে। তারা বলছে, বিক্ষোভের সময় পুলিশ বল প্রয়োগ করেছে। ঐ সম্পাদকীয়তে আরো বলা হয়, এই বিক্ষোভ হলো বড় পরিকল্পনা অনুযায়ী পরীক্ষামূলক মহড়া এবং এক ধরনের হুমকি। পরবর্তীতে তারা বড় ধরনের বিক্ষোভ করলে হংকংয়ের জন্য তা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়বে। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, বিক্ষোভকারীদের এই অবস্থানের পেছনে শুধু রাজনৈতিক স্বাধীনতার দাবিই একমাত্র কারণ নয়। বরং সম্প্রতি হংকংয়ের উপর চীন সরকারের কঠোর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টাও একটি কারণ। এছাড়া গত কয়েক বছর ধরে হংকংবাসী ও চীনের মূল ভূখণ্ডের জনগণের সঙ্গে উত্তেজনা বাড়ছে। এ বছরের শুরুতে হংকংয়ে চীনারা অপমানের শিকার হয়েছে। এটাকে অনেকে আন্তঃসীমান্ত সাংস্কৃতিক লড়াই বলেও বিবেচনা করছে। চীন মূল ভূ-খণ্ডের নাগরিকদের নিয়ে নানা ধরনের অপপ্রচার হচ্ছে অনলাইনে। এ পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমগুলো উভয়পক্ষকে শান্ত থাকার জন্য আহবান জানিয়ে আসছে। চীনা সরকার ঘোষণা দিয়েছে হংকং পূর্ণভাবে একীভূত হওয়ার পরও তাদের নাগরিক অধিকার বিদ্যামান থাকবে। এছাড়া ২০১৭ সালের নির্বাচনে তাদের মত প্রকাশের সুযোগ থাকবে। অতীতে বিভিন্ন সময়ে চীন ছোট-খাট বিক্ষোভ খুব কঠোর ও সফলভাবে দমন করেছে। এখন দেখার বিষয় হংকংকে তারা কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।
