সিনেমার পর্দায় কাহিনীকারের লেখা ঝাড়া ঝাড়া সংলাপ আওড়ে কতশত বার যে তিনি হাজার হাজার দর্শক ভক্তদের হাততালি কুড়িয়েছেন তার ইয়ত্তা নেই। চলচ্চিত্রের পর্দায় তাকে সব সময় দেখা গেছে আদর্শবান ও সত্ চরিত্রের মানুষ হিসেবে। রূপালি পর্দায় তার অভিনয় দেখে দর্শকরা ভেবেছে দুনিয়াটা যদি এমন ভালো মানুষে ভর্তি হয়ে যেত তবে দুঃখ বলে কিছু থাকতো না! দুনিয়াটা হয়ে যেতো সুখের মহাসাগর।
কিন্তু এই ‘নায়ক’ প্রমাণ করে দিলেন যে সংলাপ লেখকের লেখা সুন্দর সুন্দর কথাগুলো সিনেমাতে পাঠ করলেই বাস্তব জীবনে নিজেকে যে সত্ ও বিবেকবান হতে হবে তার মানে নেই। বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে সিনেমার নায়ক বাস্তব জীবনে হতে পারেন একজন ‘খলনায়ক’ বা ভিলেন। আর এই খলনায়ক তকমা পেয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের বাংলা সিনেমার একসময়কার জনপ্রিয় তারকা তাপস পাল। অভিনয় জীবনে সিনেমার কাহিনীতে যে পরিমাণ সুন্দর সুন্দর কথা বলে এসেছেন এখন বাস্তব জীবনে ঠিক সেই পরিমাণ কুিসত, অশ্লীল, আইন-অমান্যকারী কথাবার্তা বলে সবার কাছে নন্দিত তারকা এখন গণ-নিন্দিত ভিলেন। সপ্তাহখানেক আগেও চলচ্চিত্রপ্রেমিকরা জানতেন না তাদের প্রিয় নায়ক তাপস পালের মধ্যে লুকিয়ে আছে এমন এক বিতর্কিত চরিত্র।
কি বলেছেন তাপস পাল? উত্তরে বলা যেতে পারে কি বলেননি তিনি! নোংরা ভাষায় যত কথা বলা যেতে পারে তার সবই তো প্রায় বলে ফেলেছেন তিনি!
ভারতে এ বছর অনুষ্ঠিত লোকসভা নির্বাচনে তাপস পাল তৃণমূল কংগ্রেসের টিকেটে এমপি নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি এখন দলীয় নেতাকর্মী দ্বারা বেষ্টিত থাকেন। তাই বিপক্ষ রাজনৈতিক দলের ভালো-মন্দ সব কর্মীকে তিনি শত্রু ভাবতে শুরু করেছেন। শত্রুদের শায়েস্তা করার দায়িত্বও যেন তিনি নিজ হাতে তুলে নিয়েছেন। নিজে আইনপ্রণেতা হলেও প্রকাশ্যে জানিয়ে দিলেন তিনি নিজে রাষ্ট্রের আইন মানেন না! সদর্পে ঘোষণাও দিয়েছেন যে তিনি পকেটে সারাক্ষণ ‘মাল’ (অস্ত্র) নিয়ে ঘোরেন। বিপক্ষ রাজনৈতিক দলের কর্মীদের প্রয়োজন হলে নিজ হাতে গুলি করে মারবেন! গুলিতেই শেষ নয়। দলীয় দুর্বৃত্তদের দিয়ে ‘ধর্ষণ’ করিয়ে তিনি তার প্রতিপক্ষের মা-বোনদের শায়েস্তা করার হুমকি দিয়েছেন! দলীয় কর্মীদের বলেছেন, ওদের (প্রতিপক্ষের কর্মীদের) ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিয়ে তারপর এসে খবর দিতে। কোথাকার থানা পুলিশ! পুলিশ কিচ্ছু বলতে সাহস পাবে না। থানা পুলিশ যাতে না হয় সে দায়িত্ব তার। ‘দাদা’র কথায় সাহস পেয়ে দলীয় দুর্বৃত্তরা হামলা চালিয়ে যাচ্ছে একের পর এক বিপক্ষ দলের লোকজন ও বাড়িঘরের উপর।
ভারতের সচেতন ও বিবেকবান মানুষ বলছে, অশালীন ও অনৈতিক মন্তব্যে তাপস পাল পিছনে ফেলে দিলেন অশ্লীল সিনেমার তৃতীয় শ্রেণির ভিলেনদের। গত ১৪ জুন তাপস পাল তার সমর্থকদের উদ্দেশে একটি সমাবেশে বলেন, ‘আমি অনেক মাস্তানি করেছি। ওদের বাড়ি বাড়ি ঢুকে ছেলেদের পাঠিয়ে রেপ করে দেব। গুষ্টি শেষ করে দেব, বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেব।’ এসব সুবচন পত্রিকায় আসার পর বিশ্বকাপের গরম ছাপিয়ে তাপসের এসব আপত্তিকর মন্তব্য হয়ে ওঠে গরম আলোচনার বিষয়। বিপদ বুঝে তড়িঘড়ি তাপসকে শোকজ করে তৃণমূল। কিন্তু ততক্ষণে তার শাস্তি এবং পার্লামেন্ট সদস্যপদ বাতিলের দাবিতে আন্দোলন শুরু হয়ে গেছে। নদিয়ায় একটি সমাবেশেও তাপস পাল শত্রুদের ‘মালের’ ভয় দেখান। রীতিমতো হাত-পা ছুঁঁড়তে ছুঁড়তে তিনি বলেন, আরে আমি মাস্তানি কম জানি না। আবারো বলছি, আমি পকেটে মাল নিয়ে ঘুরি, মাল। মাল বুঝেন? যখন ফুটিয়ে দিব তখন বুঝবেন।
বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে তাপসের এসব বক্তব্য সমপ্রচারিত হতেই বিভিন্ন মহলে সমালোচনার ঝড় বয়ে যায়। কেউ কেউ তাকে গ্রেফতার করে পুলিশের হাতে তুলে দেয়ার দাবি জানায়। আবার কেউ দাবি করে সংসদ সদস্য থেকে পদত্যাগ। সিপিএমের পলিটব্যুরো সদস্য এবং রাজ্যের বিরোধী দলনেতা সূর্যকান্ত মিশ্র বলেন, ‘তাপস পালের যা স্ট্যান্ডার্ড, তাতে ওর সম্পর্কে কথা বলতেই রুচিতে বাধে।’ প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি অধীর চৌধুরী বলেন, ‘সিনেমার একদা জনপ্রিয় নায়ক যা বলেছেন, তার নিন্দার কোনও ভাষা নেই। এরা রাজ্যটাকে কোথায় নিয়ে যেতে চাইছে কে জানে।’ বিজেপির রাজ্য সভাপতি রাহুল সিনহা আরো কঠোর ভাষায় সমালোচনা করেন।
শাসক দল মহাসঙ্কটে পড়ে ‘তাপস-কেলেঙ্কারির’ মধ্যে নিজেদের জড়াতে চায়নি। তড়িঘড়ি দলের জাতীয় মুখপাত্র ডেরেক ও’ ব্রায়েন লিখিত বিবৃতিতে বলেন, ‘এসব মন্তব্য অবিবেচনাসুলভ। দল এসব মন্তব্য সমর্থন করে না।’
দলীয় সূত্রের বরাত দিয়ে গণমাধ্যম জানায়, তৃণমূল শীর্ষনেত্রী মমতা ব্যানার্জি তাপসের মন্তব্য দিয়ে প্রকাশ্য বিবৃতি না দিলেও ঘরোয়া আলোচনায় এসব মন্তব্যের নিন্দা করেছেন। কিন্তু যার মন্তব্য নিয়ে এত কাণ্ড, সেই তাপস পালের দাবি, তিনি গত ১২ মে ভোটের দিন চোখের সামনে একটি বাচ্চাকে সিপিএমের কর্মীদের হাতে মার খেতে দেখেছেন, একজন অন্তঃসত্ত্বা নারীর পেটে লাথি মারতে দেখেছেন। তাই উত্তেজনার বশে কিছু কথা বলে ফেলেছিলেন। তিনি সাংবাদিকদের দোষ দেন। তিনি অভিযোগ করে বলেন, সাংবাদিকরা আমার বিরুদ্ধে কুত্সা প্রচারের জন্যই এ সব লিখছে। কিন্তু তাপস যখন বলেছেন, উত্তেজনার বশে তিনি ওসব কথা বলেছিলেন তখন ইন্টারনেটে একের পর এক ভিডিও আসছে যেগুলোতে তাপসের আরো ‘সুবচন’ ফাঁস হচ্ছে। প্রতিটি ভিডিওতে তাপসের বক্তব্য আপত্তিকর এবং উসকানিমূলক। দলীয় কর্মীদের উসকানি দিয়েছেন বিপক্ষ দলের কর্মীদের বাড়ি জ্বালিয়ে দিতে। তাহলে তিনি তাদের পুরস্কার দিবেন। থানা পুলিশ সামাল দিবেন। শত্রুদের দেখলে যেন হাড়গুলো গুঁড়িয়ে দেয়। আর নিজে মারার হুমকি তো অহরহ দিয়েছেন এসব ভিডিওতে।
কুরুচিকর মন্তব্যের জন্য দুঃখপ্রকাশ করেছেন তাপস পালের স্ত্রী নন্দিনী পাল। তবে তিনি দাবি করেন, বিরোধী কর্মী সমর্থকরাই তাপসকে উত্তেজিত করে ওসব বলতে বাধ্য করেছে। তাই মাথা গরম করে বেফাঁস বলে ফেলেছেন। কিন্তু স্ত্রীকে পাশে পেলেও অন্যরা সবাই তাপস পালের নিন্দা জানিয়ে শাস্তির দাবি জানিয়েছে। গণতান্ত্রিক মহিলা সমিতিসহ অগণিত নারী সংগঠন বলেছে, পশ্চিমবঙ্গবাসীর দুর্ভাগ্য যে তাপস পালের মতো অভিনেতার ছবি তারা ভক্তি ভরে দেখেছেন। অনেকে বলেছেন, যদি সুযোগ থাকতো তবে তাপস পালের দেখা ছবিগুলো তারা ‘উগরে’ ফেলে দিতেন। এখন হয়তো দর্শকরা আফসোস করবেন! চতুর্দিক থেকে নিন্দা ও সমালোচনার তোড়ে মমতা ব্যানার্জি তাপসকে পার্লামেন্টে যেতে নিষেধ করেছেন। কারণ বিপক্ষ রাজনৈতিক দলের এমপিরা যদি তাপসকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে তাকে ঢুকতে বাধা দেয় তবে তৃণমূলের জন্য তা বিব্রতকর হবে। দলীয় শীর্ষনেতারাও তাপসের ফোন ধরছেন না বলে খবর প্রকাশিত হয়েছেন।
ভারতের মিডিয়াগুলো জানিয়েছে, এ অবস্থায় তাপস পাল ফ্ল্যাটের দরজা বন্ধ করে ঘরে বসে থাকা সমীচীন মনে করছেন। কেউ বাড়িতে গেলে কাজের বুয়াকে দিয়ে বলে পাঠাচ্ছেন, গিয়ে বল স্যার বাসায় নেই। কেউ কলিং বেল চাপলে দরজা না খুলেই কাজের লোকেরা বলছে- কেউ বাসায় নেই। এ অবস্থায় তাপসের আশেপাশের ফ্ল্যাটের বাসিন্দারা রীতিমতো তারকা বনে গেছেন। তারা নিচে নামলে তাদেরকেই ঘিরে ধরছেন সাংবাদিকরা। তাপস সম্পর্কে চলছে নানা প্রশ্ন। অনেকে মিডিয়ায় দিচ্ছেন সাক্ষাত্কার।
অপরদিকে, ইন্টারনেটে সোস্যাল মিডিয়াতেও তাপস পালকে নিয়ে শুরু হয়েছে ব্যাঙ্গ বিদ্রূপের ঝড়। তাপসের নানা ব্যাঙ্গকার্টুন আর ব্যাঙ্গকবিতায় ছেয়ে গেছে ফেসবুক, টুইটার ইত্যাদি। তাপস পাল অভিনীত জনপ্রিয় ছবি ‘দাদার কীর্তি’র পোস্টার ফটোশপে এডিট করে করা হয়েছে ‘গাধার র্কীতি’! আর তার নিচে অভিনেতার নামের অংশে তাপস পালের পরিবর্তে বানানো হয়েছে ‘পাপোষ পাল’। তাপসের মাথার সাথে বিভিন্ন প্রাণীর ধড় জুড়ে দিয়ে সেসব ছবি শেয়ার করছে ক্ষুব্ধ ফেসবুক ব্যবহারকারীরা।
মোদ্দাকথা, নায়ক তাপস এখন খলনায়ক। কথায় বলে, সুনাম কিনতে বছরের পর বছর লাগে। কিন্তু দুর্নাম কিনতে কয়েক মুহূর্ত যথেষ্ট। তাপস নিজেই প্রমাণ করে দিলেন তা। নিজেকে ফ্ল্যাটের চার দেয়ালে লুকিয়ে রেখে মুখে লাগা চুনকালি পরিষ্কার করতে পারবেন কি না তা সময়ই বলে দিবে।
