‘আধুনিক দাসত্ব’ থাইল্যান্ডে

আপডেট : ০৬ জুলাই ২০১৪, ২১:৫৫
কাগজে-কলমে দাসপ্রথার বিলুপ্তি ঘটেছে অনেক আগেই; কিন্তু সত্যিই কি ঘটেছে? আধুনিক দাসত্ব বিরাজ করছে পৃথিবীর বহু দেশে। থাইল্যান্ড তার জ্বলজ্যান্ত প্রমাণ। আধুনিক দাসত্বের তীব্রতা বিশ্বের মধ্যে এ দেশটিতেই সবচে’ বেশি। ব্রিটেনের বিখ্যাত দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকার অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের মাধ্যমে এ সম্পর্কিত যেসব তথ্য জানা গেছে. তা এককথায় ভয়াবহ। মিয়ানমার ও কম্বোডিয়া থেকে আসা পনেরজন অভিবাসী শ্রমিক এ পত্রিকার এক রিপোর্টারের কাছে বর্ণনা করছিলেন তাদের জীবনের করুণ কাহিনী। মিয়ানমারের শুকুর আলি (রোহিঙ্গা) বলছিলেন, ‘থাইল্যান্ডের কোন ফ্যাক্টরি কিংবা বিল্ডিং সাইটে কাজ পাইয়ে দিতে দালালকে অর্থ দিয়েছিলাম আমি; কিন্তু এর বদলে সে আমাকে ২৫০ ডলারে বিক্রি করে দিয়েছিল নৌকার ক্যাপ্টেনের কাছে। সেখানে আমি শৃঙ্খলিত ছিলাম। এ অবস্থাতেই কাজ করে যেতে হত। মাঝে-মধ্যে দিনে একবেলাও খাবার জুটতো না। অনেককেই মারা যেতে দেখেছি। পালাতে না পারলে আমিও হয়তো মরে যেতাম। প্রাণীর মতো বিক্রি করে দেয়া হয়েছিল আমাদের। আচরণ করা হত প্রাণীর মতই। আমরা যে মানুষ, সেটিই তারা ভুলে গিয়েছিল।’ থাইল্যান্ডে সি-ফুড ব্যবসা জমজমাট। বাগদা চিংড়ি রপ্তানিতে এক নম্বর স্থানটি তারা ধরে রেখেছে দীর্ঘদিন ধরে। কিন্তু এই বাগদা চিংড়ি উত্পাদনের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে হাজার হাজার আধুনিক দাস। এদের অনেককেই দিনে ২০ ঘন্টা কাজ করতে হয় এবং সমুদ্রের তীর কী জিনিস তা তাদের চিনতে দেয়া হয় না। বিনিময়ে এক পয়সাও কপালে জুটে না। কম্বোডিয়ার সাবেক সন্নাসী ভুথি প্রসঙ্গক্রমে বলছিলেন, ‘প্রচণ্ড পরিশ্রম করা সত্ত্বেও নিত্যদিন মারধর করা হত। অত্যাচার সইতে না পেরে বিশজনকে মরে যেতে দেখেছি আমি। নৌকায় গরু-ছাগলের মত রাখা হত আমাদের। আমাদের ইচ্ছা-অনিচ্ছার কোন মূল্যই ছিল না তাদের কাছে। পালাতে গিয়ে ধরা পড়লে মৃত্যু অবধারিত ছিল। তারা কেবল একটি কথাই বলত, আমরা তোমাদের পয়সা দিয়ে কিনেছি, অতএব আমরা যা বলি তাই করতে হবে।’ থাইল্যান্ডের সীফুড ব্যবসার জায়ান্ট হচ্ছে বহুজাতিক কোম্পানি সিপি ফুডস। তাদের বার্ষিক টার্নওভার ৩৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ওয়ালমার্ট, কেয়ারফর, কস্টকো ও টেসকোর মত বিশ্বখ্যাত খুচরা বিক্রেতারা তাদের গ্রাহক। অভিযোগের সবচে’ বড় তীরটা সিপি ফুডস-এর দিকেই। কিন্তু এর যুক্তরাষ্ট্রস্থ ব্যবস্থাপনা পরিচালক বব মিলার বিষয়টিকে মোটেই আমলে নিতে চান না, ‘অনেকেই বলে আমাদের উত্পাদন প্রক্রিয়ার সঙ্গে দাসরা জড়িত। কিন্তু আমরা এর দৃশ্যমানতা খুঁজে পাই না। একটা চক্র আমাদের ব্যবসা ধসিয়ে দিতেই আমাদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে।’ কিন্তু বিভিন্ন বেসরকারি সংগঠন ও জাতিসংঘের রিপোর্ট অন্তত এরকম বলে না— থাইল্যান্ডের মত্স্য শিল্পের সঙ্গে জড়িত রয়েছে বহু দাস। এ্যান্টি স্ল্যাভারি ইন্টারন্যাশনাল-এর পরিচালক এ্যাইডান ম্যাককোয়াডের মন্তব্য, ‘আপনি থাইল্যান্ডের বাগদা চিংড়ি কিনছেন মানেই দাসশ্রম থেকে উত্পাদিত পণ্যকে উত্সাহিত করছেন। বিবেকবান মানুষেরা এ কাজ মোটেই করতে পারে না।’ দাসত্ব নিষিদ্ধ হলেও থাইল্যান্ডসহ পৃথিবীর নানা দেশে মোট ২১ মিলিয়ন নারী-পুরুষ দাস হয়ে রয়েছে— এ তথ্য আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার। এইসব মানুষেরা শারীরিক ও মানসিক চাপের মুখে কাজ করে যেতে বাধ্য হচ্ছে। ধারণা করা হয়, থাইল্যান্ডের ভূখন্ডে দাসের সংখ্যা আধা মিলিয়নের বেশি। এর মধ্যে বাগদা চিংড়ি উত্পাদনের সঙ্গেই জড়িত রয়েছে কমপক্ষে তিন লাখ। সিফুড শিল্পে শ্রমিকের ঘাটতি থাকায় আশেপাশের দেশগুলো থেকে বিভিন্ন কৌশলে দাস কিনে এনে সেই ঘাটতি পূরণ করা হচ্ছে। বিশ্বে দেশটির পরিচিতি দাসত্বের বড় উত্স, ট্রানজিট ও গন্তব্য হিসেবে। তদন্তমূলক রিপোর্টের স্বার্থে দ্য গার্ডিয়ানের রিপোর্টাররা জেলে, নৌকার ক্যাপ্টেন, নৌকার ম্যানেজার, কারখানার মালিক ও থাই কর্মকর্তাদের সঙ্গে খোলামেলা কথা বলেছেন। কেউই দাস প্রসঙ্গ এড়িয়ে যেতে পারেননি এবং বলেননি যে, থাইল্যান্ডে কোন দাসের উপস্থিতি নেই। তবে অনেকে বিষয়টিকে কৌশলে এড়িয়ে যেতে চেয়েছেন। বিশ্বের সর্ববৃহত্ খুচরা বিক্রেতা ওয়ালমার্টেও একজন কর্মকর্তা স্বীকার করেছেন, থাইল্যান্ডের বাগদা চিংড়ি বিক্রির সুবাদে তাদের ইমেজ নষ্ট হচ্ছে। কিন্তু বাণিজ্যিক স্বার্থে তারা সেখানকার পণ্যটি কেনা বাদ দিতে পারছেন না। তবে তারা মানবপাচার প্রতিরোধে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে আগ্রহী। তার মানতে আপত্তি নেই, থাইল্যান্ডে মত্স্য শিল্পে প্রচুর দাস নিযুক্ত রয়েছে। আশেপাশের দেশগুলোর দারিদ্র্যের সুযোগে তারা দাস কিনে আনছে, বিশেষ করে মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের। আর এর মাধ্যমেই দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সম্পদশালী দেশগুলোর একটি বনে গেছে থাইল্যান্ড।