ফ্রান্সে এটাই প্রথম। সাবেক কোন সরকার প্রধানকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা। গত মঙ্গলবার সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলা সারকোজিকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করে পুলিশ। একই সাথে তাঁর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ তদন্তেরও নির্দেশ দেয় প্যারিসের এক আদালত। সারকোজির বিরুদ্ধে অভিযোগ হলো, ২০০৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রচারণার অবৈধ তহবিল সংক্রান্ত একটি তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে ভেতরের খবর সংগ্রহের চেষ্টা করেছিলেন তিনি। এক বিচারকের সাথে সারকোজির কোন এক টেলিফোন সংলাপ রেকর্ড করে এমন অভিযোগের প্রমাণ মিলেছে বলে ভাষ্য আদালতের। ২০০৭ সালের ঐ নির্বাচনে প্রচারণা চালাতে সারকোজিকে অর্থ দিয়েছিলেন তত্কালীন লিবিয়ার নেতা মোয়াম্মার গাদ্দাফি। এই অভিযোগ তদন্ত শেষ না হতেই আদালতকে প্রভাবিত করার অভিযোগ আনা হলো সাবেক ফরাসি প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে। আবারো প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে দাঁড়াতে চান সারকোজি। এ অবস্থায় এমন অভিযোগ বা আটক করার আইনী প্রক্রিয়াকে তিনি দেখছেন প্রতিদ্বন্দ্বীকে রাজনীতির মাঠ থেকে সরিয়ে দেয়ার অপচেষ্টা হিসেবে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে দশ বছরের জন্য শ্রীঘরে (কারাগার) যেতে হতে পারে তাকে। ফরাসি আইন অবৈধ প্রভাব খাটানোর সর্বোচ্চ সাজা এটাই।
২০১৭ সালে নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। আর তাতে অংশ নিতে বদ্ধপরিকর সারকোজি। জয়ের ব্যাপারেও তিনি আশাবাদী। সারকোজি বলেছেন, এ সবের নাটের গুরু বর্তমান সমাজতান্ত্রিক সরকার। তিনি মন্তব্য করেছেন, বিচার ব্যবস্থার মধ্যেও ভূত ঢুকে গেছে। বামপন্থি ভূত। ফ্রান্সের টিএফওয়ান টিভি চ্যানেল এবং ইউরোপ ওয়ান রেডিওতে গত বুধবার সারকোজির একটি সাক্ষাত্কার প্রচার করা হয়। তাতে তিনি তাঁর বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করেন। সারকোজি বলেন, প্রতিদ্বন্দ্বী পক্ষকে রাজনীতির মাঠ থেকে বাইরে পাঠানোর অসত্ উদ্দেশ্যেই বিচার ব্যবস্থাকে কলুষিত করা হচ্ছে। তিনি দাবি করেন, ক্ষমতায় থাকাকালে তিনি বেআইনী কোন কাজ করেননি। তার দাবি, নির্বাচনের আগে সুখ্যাতি নষ্ট করতে এবং সম্ভাব্য প্রার্থীকে হেয় প্রতিপন্ন করতেই এই সব আজগুবি অভিযোগ আনা হচ্ছে। রেকর্ড করা হচ্ছে টেলিফোন সংলাপ।
সাক্ষাত্কারে সাবেক ফরাসি প্রেসিডেন্ট সারকোজি বলেন, ‘আমরা কোন জগতে বাস করছি, তা ফরাসিদের আমি অত্যন্ত গুরুত্বসহকারে বোঝাতে চাই। এখানে রাজনীতির পাশাপাশি স্বাধীন বিচার ব্যবস্থাও ব্যক্তি বা গোষ্ঠী স্বার্থে ব্যবহূত হচ্ছে। আমি সবাইকে এটাই বলতে চাই যে, আমি কারো সাথে প্রতারণা করিনি, প্রজাতন্ত্রের আইন বা নীতি বিরোধী কোন কাজ কখনও করিনি’। সারকোজি জানান, আনুষ্ঠানিক তদন্তের ঘোষণায় তিনি গভীরভাবে মর্মাহত। এমনকি তাকে যেভাবে আটক করা হয়েছে, তাতেও তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন। সারকোজি মনে করেন, বিচার ব্যবস্থাপনায় বামপন্থি ভূত ঢুকে পড়েছে। বিশেষ করে তিনি জানান, দায়ের করা মামলার দুই বিচারকের একজন ক্লেয়ার থেপট। যিনি বামপন্থি ম্যাজিস্টে্রট ট্রেড ইউনিয়নের সদস্য। সারকোজি যখন প্রেসিডেন্ট ছিলেন, তখনও সরকারের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে বৈরি মনোভাব প্রদর্শন করতেন ক্লেয়ার। সাক্ষাত্কারে সারকোজি সমাজতান্ত্রিক সরকারকেও এক চোট নিয়েছেন। কারণ তিনি মনে করেন, বামপন্থি এই সরকারই নাটের গুরু। তা না হলে প্রটোকলভুক্ত সাবেক প্রেসিডেন্টের ফোন রেকর্ড করা কিভাবে সম্ভব।
সারকোজিকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য গত মঙ্গলবার পনেরো ঘণ্টার জন্য পুলিশ হেফাজতে নেয়া হয়। জিজ্ঞাসাবাদের পর তাঁকে তোলা হয় প্যারিসের এক আদালতের কাঠগড়ায়। এরপর মধ্যরাতে তাঁকে ছেড়ে দেয়া হয়। সরকার পক্ষ থেকে শুধু বলা হয়েছে, কেউই আইনের উর্ধ্বে নয়। আদালতকে প্রভাবিত করার অভিযোগ প্রমাণিত হলে কারাদণ্ডের পাশাপাশি দেড় লাখ ইউরো জরিমানা হতে পারে তার। এখন তদন্ত করে দেখা হচ্ছে, ক্ষমতায় থাকাকালে প্রেসিডেন্ট সারকোজি রাষ্ট্রপক্ষের সিনিয়র আইনজীবী গিলবার্ট আজিবার্টের সাথে আসলে কী ধরনের বোঝাপড়া করেছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, মোনাকোতে তাকে সম্মানজনক কাজ দেয়ার লোভ দেখিয়ে অবৈধ প্রচারণা তহবিল তদন্তের ব্যাপারে বিস্তারিত তথ্য জানতে চেয়েছিলেন সারকোজি। তবে অ্যালবার্ট তাতে রাজি হননি। আনুষ্ঠানিক তদন্তে সারকোজির আইনজীবী থিয়েরি হারজগ এবং অ্যালবার্টকেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, ফোন রেকর্ডের তথ্য রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলিরাই সারকোজিকে দিয়েছিলেন।
সারকোজিকে জিজ্ঞাসাবাদে নেয়ার বিষয়টিকে সন্দেহের চোখে দেখছেন তার সমর্থকরাও। গত নির্বাচনে সমাজতান্ত্রিক দলের নেতা ফ্রাসোঁয়া ওঁলাদের কাছে পরাজয়ের পর অনেকটাই আড়ালে ছিলেন মধ্য ডানপন্থি ইউএমপি দলের নেতা সারকোজি। আগস্টের আগেই তার রাজনীতির মাঠে ফেরার কথা। এমনকি আগামী নভেম্বরের কংগ্রেসে দলের সভাপতি হতে সারকোজির সম্ভাবনাও বেশ উজ্জ্বল। কারণ প্রচারণার অবৈধ তহবিলের অভিযোগ ওঠায় ইউএমপি’র প্রেসিডেন্ট জিন ফ্রাসোঁয়া কোপ আগেই পদত্যাগ করেছেন। এ অবস্থায় মামলার তদন্ত বেশ বিপাকে ফেলেছে সারকোজিকে। সুখের কথা হলো বিভিন্ন জনমত জরিপ। এ সব জরিপে দেখা গেছে, প্রেসিডেন্ট ফ্রাসোঁয়া ওঁলাদের চেয়ে বেশি জনসমর্থন রয়েছে সারকোজির। কিন্তু রাজনীতির মাঠে কে থাকবে বা থাকবে না, সেটা অনেকটাই নির্ধারিত হয় আদালতে। কারণ, একই ধরনের অভিযোগে এর আগে সাবেক প্রেসিডেন্ট জ্যাক শিরাক বেশ ঝামেলায় পড়েছিলেন।
সারকোজির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের মধ্য দিয়ে আরেকটি বিষয় সামনে এসেছে। তা হলো, লিবিয়ার সাবেক নেতা মোয়াম্মার গাদ্দাফির সাথে ইউএমপি’র সম্পর্ক। ফ্রান্সের নির্বাচনী তহবিল গঠনে গাদ্দাফির যে একটা ভূমিকা ছিলো সেটা নিয়ে রয়েছে বেশ আলোচনা-সমালোচনা। অথচ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আহ্বানে সাড়া দিয়ে লিবিয়ায় গাদ্দাফির বিরুদ্ধে প্রথম বিমান হামলা চালায় ফ্রান্স। আর সে সময় ক্ষমতায় ছিলেন নিকোলাস সারকোজি। একই ব্যক্তির এমন দ্বিমুখী আচরণও মেলাতে পারছেন না অনেকে। আর মামলার বিচারে এসব বিষয়ই সামনে আনতে চাইছেন সারকোজি। তিনি প্রমাণ করতে চান, ক্ষমতায় থাকাকালে ব্যক্তি বা দলীয় স্বার্থে রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করেননি। বরং জনগণ এবং দেশের বৃহত্তর স্বার্থেই কাজ করেছেন তিনি।
